শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ভাঙনের শব্দে ঘুম ভাঙে তিস্তা পাড়ের মানুষের

আপডেট : ২৯ জুন ২০২২, ১৬:৩৬

ছালেহা বেগম (৬০)। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের হরিচরণশর্মা গ্রামের তিস্তা নদীর তীরের বাসিন্দা।তার ভাঙনের প্রতিটি রাত কাটে নির্ঘুম অবস্থায়। ছালেহা বেগম বললেন, সংসারের এটা-সেটা কাজ করে গভীর রাতে বিছানায় যাই। ক্লান্ত শরীরে দ্রুত ঘুম আসে। হঠাৎ নদী ভাঙনের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। আতঙ্কিত হয়ে পড়ি এই বুঝি ঘরবাড়ি ভেসে যায়!

তিস্তা নদী পাড়ের ছালেহা বেগমের মতো রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের হরিচরণশর্মা, চরগনাই, হয়বত খাঁ, আজম খাঁ, চর বিশ্বনাথ গ্রামের তিস্তা নদী তীরবর্তীর সবাই একই আতঙ্কে ভুগছেন।

বুধবার (২৯ জুন) সকালে তিস্তা নদীর ভাঙনকবলিত ওই গ্রামগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ভাঙনের আতঙ্কে কেউ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ গাছ কাটছেন। বাইরের কোনো লোককে দেখলেই তারা ঘিরে ধরেন। তাদের সামনে ভাঙন ঠেকানোর দাবি জানান।

উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের চর গনাই গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম (৫০) বলেন, এ বছর তিস্তার ভাঙনে এই এলাকার কয়েকটি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেইসঙ্গে নদীগর্ভে আবাদি জমি, গাছপালা বিলীন হয়ে গেছে। তারা এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। একই এলাকার হোসেন আলী নামের এক ব্যক্তি সব কিছু হারিয়ে নদীর কাছেই একচালা ঘর তুলে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন।

তিনি বলেন, বাপু সারা রাত ঘুমাতে পারি না। তিস্তা নদী সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। কখন যে এই বাড়িটাও নেয়, ভাঙনের ভয়ে দিন পাড়ি দিচ্ছি। রাতে ভাঙনের শব্দে ঘুমাতে পারি না। অথচ ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। একই অবস্থা হরিচরণশর্মা গ্রামের অনেক কৃষকের।

তারা বলেন, গত বছর ভাঙনে “হামার ঘরের ভিটা ভাঙি গেইছে বাহে”। সেই থাকি হামরা মানসের জাগাত আচি। হামরা ইলিপ চাই না, তিস্তা নদী ভাঙার হাত থাকি হামার ঘরোক বাঁচান। তাদের দাবি ভাঙনরোধে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিবছর তিস্তা নদী গিলে খাচ্ছে একরের পর একর জমি।

এবিষয়ে তিস্তা বাচাঁও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের কাউনিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজার রহমান বলেন, নদী ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. তাহমিনা তারিন ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

ভাঙন আতঙ্কে নদী পাড়ের মানুষ

টেপামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম বলেন, এবছর তিস্তা নদীর ভাঙনের ফলে তার ইউনিয়নের হরিচরণশর্মা, চর গনাই, বিশ্বনাথসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ২২টি বাড়িসহ প্রায় ২৫ একর জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। সরকারি কোনো সহায়তা না পাওয়ায় এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে নদী ভাঙন রোধে বাঁশের খুঁটি দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছি।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা তারিন ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। টেপামধুপুর ইউনিয়নের হরিচরণশর্মা, চর গনাই, বিশ্বনাথসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ২২টি বাড়িসহ প্রায় ২৫ একর জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। আজ থেকে ভাঙন ঠেকাতে তিস্তা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫০টি জিও ব্যাগ ফেলে ঠেকানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ভাঙনকবলিত মানুষের মাঝে ২০ মেট্রিক টন চাউল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/মাহি