ম্যাকডোনাল্ড মাসাম্বুকা ভেবেছিলেন সত্যিই বুঝি তার জন্য কনে দেখা হয়েছে। ভাইয়ের কথায় আস্থা রেখে খুশিমনেই বেরিয়েছিলেন হবু স্ত্রী-কে দেখতে। এভাবে বোকা বানিয়ে মালাওইর এক যাজক, এক পুলিশকর্মীসহ ১২ জন মিলে হত্যা করে তাকে।
ম্যাকডোনাল্ড মাসাম্বুকার ‘অপরাধ'- তার শরীরের ত্বক জন্মের পর থেকেই মেলানিন তৈরিতে অক্ষম।এ কারণে গায়ের ত্বক, চুল সবই সাদা। এমন চেহারার সব মানুষ, অর্থাৎ, অ্যালবিনোদের অপয়া ভাবেন আফ্রিকা অঞ্চলের অনেক মানুষ। এমন অযৌক্তিক ধারণা থেকে তাদের ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন, নির্যাতন চালানো হয়। অনেক সময় হত্যাও করা হয় তাদের। ২২ বছর বয়সি ম্যাকডোনাল্ড মাসাম্বুকাকে হত্যা করা হয় ২০১৮ সালের ৯ মার্চ।
মালাওইর দক্ষিণাঞ্চলের মাচিঙ্গা জেলার ব্লান্টায়ার শহরের বাসা থেকে তার ভাই-ই ডেকে নিয়ে যায় তাকে। ভাই বলেছে, একজন সুপাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে, তাই ভালোবাসার কাঙাল ম্যাকডোনাল্ড খুব সেজেগুজেই বেরিয়েছিলেন।
পরের ঘটনা কোনোদিন হয়ত জানাই হতো না। নয় দিন পর তার মৃতদেহ পাওয়ার পরও কেউ বুঝতে পারেনি নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন জন্মের পর থেকেই চেহারার কারণে সমাজে কোণঠাসা হয়ে থাকা ম্যাকডোনাল্ড মাসাম্বুকা। কিন্তু এক পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় আরো দশজনের সহায়তায় তাকে হত্যা করেই থামেননি ক্যাথলিক চার্চের যাজক। বাড়তি কিছু উপার্জনের লোভে ম্যাকডোনাল্ডের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন তিনি। তার প্রস্তুতির সময়ই ধরা পড়ে যান স্থানীয়ভাবে খুব সম্মানিত সেই যাজক।
তারপরও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সহজ হয়নি। ঘটনার তদন্ত ও আদালতে দীর্ঘ শুনানির পর গত সপ্তাহে মামলার রায় হয়েছে। রায়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১২ জনেরই বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ৩০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে ক্যাথলিক গির্জার যাজক টোমাস মুহোশার। এছাড়া পুলিশ কর্মকর্তা চিকোন্ডি চিলেকাসহ বাকিদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
ম্যাকডোনাল্ড হত্যাকাণ্ড তুমুল সাড়া জাগালেও সাব সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের দেশগুলোতে অ্যালবিনোদের হত্যার ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ল্যান্সেট-এর সাস্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে প্রতি পাঁচ হাজারের মধ্যে অন্তত একজন শিশু ত্বকের এমন সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়।
ত্বকের এমন সমস্যা আছে যাদের, তাদের অ্যালবিনো বলা হয়। অ্যালবিনো শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ অ্যালবাস থেকে। অ্যালবাস অর্থ সাদা।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাকডোনাল্ড হত্যাকাণ্ডের পরের চার বছরে শুধু মালাওইতেই কমপক্ষে ২০ জন অ্যালবিনোকে হত্যা করা হয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন বলছে, অ্যালবিনোদের অপয়া ভাবেন এমন মানুষ সারা বিশ্বেই রয়েছে, তাই গত ১০ বছরে সারা বিশ্বে শুধু ত্বকের এই সমস্যার কারণে অন্তত ৬০০ জন মানুষ আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
অ্যালবিনোদের ওপর হামলা সবচেয়ে বেশি হয় মালাওই, জাম্বিয়া, জিম্বাবোয়ে, সাউথ আফ্রিকা ও তাঞ্জানিয়ায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষার হার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল সমাজ থেকে অ্যালবিনো-বিরোধী কুসংস্কার দূর করা সম্ভব। পাশাপাশি সমাজের নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে আসার মাধ্যমেও সমাজে অ্যালবিনোদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কথা বলছেন তারা।
এমন উদ্যোগ অবশ্য ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বড় দৃষ্টান্ত জার্মানিতে তাঞ্জানিয়ার রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ পোসি। জন্মগতভাবে অ্যালবিনো হলেও সব প্রতিকূলতা জয় করে দেশে দেশে তাঞ্জানিয়ার দূত হয়ে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন তিনি।
