রোববার, ০৭ আগস্ট ২০২২, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দেশে ভিন্ন প্রজাতির ফড়িংয়ের খোঁজ, নেপথ্যে ঢাবি শিক্ষার্থী সমী

আপডেট : ৩০ জুন ২০২২, ০২:৪০

বাংলাদেশের ফড়িংরা মূলত ৪টি পরিবারের অন্তর্গত। এর মধ্যে Gomphidae পরিবারের ৫টি প্রজাতি (Ictinogomphus rapax, Macrogomphus montanus, Macrogomphus robustus, Megalogomphus smithii and Paragomphus lineatus) এদেশে রয়েছে। কিন্তু Platygomphus dolabratus নামক ফড়িংয়ের (যা Ghomphidae পরিবারেরই অন্তর্গত) উপস্থিতি বাংলাদেশে এখনও নিশ্চিত তথ্য-প্রমাণ ও ছবিসহ উপস্থাপন করা হয়নি। কেবল হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশসংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, নেপালে প্রজাতিটির উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া এর কোনো ইংরেজি নাম বা সাধারণ নামও কোথাও নেই।

২০২০ সালে করোনাকালীন লকডাউন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজ এলাকার জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা কার্য শুরু করেন। তারা করোনাকালে প্রকৃতিতে প্রাণীদের অবাধ বিচরণের তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের ২০ জুন জামালপুরে একটি ডোবার পাশ থেকে একটি ব্যতিক্রমী ঘরানার ফড়িং দেখতে পান সমী। শরীরের গঠন, বর্ণ দেখে তার বুঝতে বাকি থাকে না এটি অন্যরকম কিছু। এরপর ফড়িংটিকে তিনি সাবধানে সংগ্রহ করেন, এর শরীরের বিভিন্ন অংশের ছবি তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠান এবং পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিত হন এটি Platygomphus dolabratus গোত্রের ফড়িংয়ের প্রজাতি। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান, অধ্যাপক ড. এম নিয়ামুল নাসের, মো. মাহাবুব আলম, সানজিদা সুলতানা, এবং মো. ফজলে রাব্বির সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে গবেষণা কাজ এগিয়ে নিয়ে যান এই তরুণ।

এর দুইদিন পর প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী রিপন চন্দ্র রায় দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থেকে একটি ছবি পাঠান সমীর কাছে, যার সঙ্গে Platygomphus dolabratus নামক ফড়িংয়ের মিল পাওয়া যায়। ফড়িংটির ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে সমী তখন ভারতীয় উপমহাদেশের কয়েকজন বিখ্যাত ফড়িং গবেষকের শরণাপন্ন হন।

মজার ব্যাপার হলো, এই প্রজাতির ফড়িং সম্পর্কে তথ্য ছিল একেবারেই অপ্রতুল। এর বর্ণনা সম্পর্কে কোথাও সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষকরাও বাইরের বিভিন্ন দেশের বই সংগ্রহ করে সমীকে পাঠাতে থাকেন। লকডাউনের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাণীর বইয়ের সংগ্রহশালায় যান সমী, সঙ্গে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের আরেক গবেষক দীপ্ত বিশ্বাস। এ সময় ড্রাগনফ্লাই সাউথ এশিয়া নামক একটি সংস্থা তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করেন এবং উনিশ শতকের কিছু বইয়ের তথ্য প্রদান করে।

দীর্ঘ কাঠ-খড় পোড়ানোর পর অবশেষে ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত 'The fauna of British India' নামক বইয়ে পাওয়া যায় এই ফড়িংয়ের তথ্য। এই ফড়িং এতটাই দুর্লভ যে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার (আইইউসিএন, জিবিআইএফ) তথ্যমতেও বাংলাদেশে এই ফড়িংয়ের কোনো রেকর্ডের তথ্য ছিল না। আর বিশ্বব্যাপী এর বিস্তৃতির তথ্যও সামান্য।

New Fly 2

পর্যবেক্ষণকৃত ২টি ফড়িংই ছিলো পুরুষ। হলদে শরীরে কালো ডোরাকাটা দাগ। সবুজ চোখ, হলদেটে মুখ। হলদে পায়ে কালো ছাপ বিদ্যমান। ৫, ৬ ও ৭ নম্বর এবডোমেনাল খণ্ডে হলদে-কালো ডোরাকাটা দাগ যা এই প্রজাতিটিকে একই গণের Platygomphus feae নামক প্রজাতি থেকে পৃথক করেছ।

আশিকুর রহমান সমী বলেন, বাংলাদেশের ফড়িং এর তালিকায় নিশ্চিতভাবে Platygomphus dolabratus নামক ফড়িংকে যুক্ত করতে পেরে আসলেই আনন্দিত। অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল এরকম কিছু একটা করার। এই প্রাপ্তি প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র প্রাণীর সংরক্ষণের প্রতি দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে ফড়িং নিয়ে গবেষণা খুবই জরুরী। আমাদের অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছে ফড়িংরা।

সমী বর্তমানে লেখাপড়া করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের ওয়াইল্ড লাইফ বায়োলজিতে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে ফড়িং নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর উপর এখন পর্যন্ত ১৭টি গবেষণাপত্র প্রকাশের কৃতিত্ব রয়েছে তার।

ইত্তেফাক/এসটিএম