মুভি রিভিউ

সারেং বউ: সংগ্রামী নারীর গল্প

আপডেট : ৩০ জুন ২০২২, ১০:২২

শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৮ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘সারেং বৌ’। এই এপিকধর্মী কাহিনিচিত্রটি পরিচালনা করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের ইংরেজি ট্যাগলাইন রাখা হয়েছিল ‘The Servivors’। এখানে একজন নারীর সংগ্রাম দেখানো হয়েছে, দেখানো হয়েছে সমাজের ঘৃণ্য মানসিকতা এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক মায়ের সংগ্রাম।

তরুণ কদম সারেং (ফারুক) জাহাজে কাজ করে অনেক দিন পর ফিরে আসে নিজ বাড়িতে, তারপর ভালবেসে বিয়ে করে নবিতুনকে (কবরী)। বিয়ের কিছুদিন পরে আবার চলে যায় জাহাজের কাজে, কদম চলে যাওয়ার পর মাঝে মাঝেই নবিতুনের কাছে চিঠি ও টাকা পাঠায়। কিন্তু গ্রামের প্রভাবশালী মোড়ল (আরিফুল হক) ডাক পিয়নকে হাত করে সেইসব চিঠি ও টাকা নিয়ে নেয়, যাতে করে নবিতুনের সংসারে অভাব চলে আসে। আর এই অভাবের সুযোগে নবিতুনকে তার লালসার শিকার বানাতে চায়, কিন্তু নবিতুন নিজে গায়ে খেটে ঢেঁকিতে ধান ভেনে কোনোমতে সংসার চালায়। এদিকে কদমকে মন্টু চাচা (গোলাম মোস্তফা) পকেটে অবৈধ মাল পুরে দিলে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, সাজার মেয়াদ শেষ হলে সে ফিরে আসে নিজ গ্রামে। ততদিনে চক্রান্তকারী মোড়ল কদমের চাচাত ভাইয়ের সাথে নবিতুনের বিয়ে ঠিক করে, কিন্তু কদম ফিরে আসায় সব থেমে যায়; খুশিতে বুক ভরে ওঠে নবিতুনের।

এভাবে নানা ঘটনায় অতিবাহিত হলো কিছুদিন, হঠাৎ একদিন তীব্র বাতাস, উপকূলীয় অঞ্চলের সব মানুষ ধরেই নিল—এ যেন জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস। শুরু হলো উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ভিন্ন এক জীবন সংগ্রাম, বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কিন্তু জলোচ্ছ্বাসের পর সবকিছু যেন থমথমে, চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। মানুষ, পশুপাখি কেউই রক্ষা পায়নি। বেঁচে থাকা কদম সারেংয়ের শরীরের বেশিরভাগ কাদামাটি ও বালির ভিতরে আটকে গেছে, আর পানি পানি করে কাতরাচ্ছে। এদিকে নবীতুন একই অবস্থা থেকে ওঠে খুঁজছে আপনজনদের। হঠাত্ শুনতে পেল কেউ পানি খেতে চাইছে, কাছে গিয়ে দেখল তার স্বামী! পানি মুখে দিতেই মুখ থেকে বের করে দিচ্ছে কদম, কারণ খুঁজতে নবিতুন নিজে একটু পানি মুখে দিয়ে দেখল এ যে খুবই নোনা। তারপর ‘সারেং বৌ’ ছবির সেই কালজয়ী দৃশ্য! কে-বা ভুলতে পারে সেই দৃশ্য। চরে মিঠাপানি না পেয়ে স্তনদুগ্ধ দিয়ে স্বামী সারেং কদমের প্রাণ বাঁচায় নবিতুন। চেতনা ফিরে পেয়ে হাহাকার করে কদম বলে, ‘আমারে পর কইরা দিলি বউ?’ কারণ প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, তাদের মধ্যে আর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থাকেনি। কিন্তু সব প্রতিকূলতাকে জয় করা সাহসী নবিতুন বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে, ‘জান বাঁচানো ফরজ।’ নবিতুন ভেঙে দেয় প্রচলিত ঘুণে ধরা সংস্কারের বেড়াজাল।

সংগ্রামী নারী নবিতুনের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন কবরী। ছবিটির সংগীত পরিচালক আলম খান। ছবিটিতে মুকুল চৌধুরীর কথা ও আলম খানের সুরে করা মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে কালজয়ী গান ‘ওরে নীল দরিয়া...’ চলচ্চিত্রের চিরসবুজ গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

মুভি নাম: সারেং বৌ
পরিচালক: আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রযোজক: এ বি এম প্রোডাকসন
রচয়িতা: শহীদুল্লাহ কায়সার (উপন্যাস)
অভিনয়: ফারুক, কবরী, আরিফুল হক, জহিরুল হক, বিলকিস, বুলবুল ইসলাম, ডলি চৌধুরী
মুক্তি: ১৬ জুন, ১৯৭৮
দেশ: বাংলাদেশ
ভাষা :বাংলা
রেটিং: ৮.২/১০

ইত্তেফাক/এসজেড