বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষক হত্যা-লাঞ্ছনা: মানবিক-পারিবারিক শিক্ষার অভাবকে দুষলেন তারা

আপডেট : ৩০ জুন ২০২২, ২২:৩১

সম্প্রতি দেশে শিক্ষকদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দেশে উদ্বেগ বেড়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাবে এসব ঘটনা বাড়ছে। সর্বশেষ সাভারের হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যা এবং নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালায় পরানোর ঘটনার পর শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে।

এছাড়া, চলতি বছরে মুন্সীগঞ্জের স্কুলশিক্ষক হৃদয় মণ্ডল, তেজগাঁও কলেজ শিক্ষক ড. লতা সমাদ্দার, নওগাঁর সহকারী প্রধান শিক্ষক আমোদিনী পালকে লাঞ্ছিতের ঘটনায় শিক্ষাবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 

শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার। ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে সাভারে শিক্ষক হত্যা ও নড়াইলে শিক্ষককের গলায় জুতার মালা পরানোর বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও শিক্ষাবিদ আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি শিক্ষকদের ওপর যে হামলা চলছে, এটা জাতির জন্য নিন্দনীয়। কারণ একটি জাতির ভিত রচিত হয় শিক্ষার মাধ্যমে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মানবিক করে তুলতে পারছি না। তারা যেন জিপিএ-৫ পায় সেটা নিয়ে অভিভাবকরা সবসময় উৎকণ্ঠিত থাকে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের শিক্ষকরাও। সুতরাং তাদের জিপিএ-৫ পাওয়ার ওপর নির্ভর করে তাদের সাফল্য। এ কারণে মানবিকভাবে গড়ে তোলার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছি আমরা।’

শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আশরাফুল আহসান জিতু।

পারিবারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘পারিবারিক শিক্ষার ওপর বড় শিক্ষা আর হতে পারে না। পরিবার হলো সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে পরিবার যদি মনে করে জিপিএ-৫ পেলেই সাফল্য। তাহলে যেটা হওয়ার সেটা হচ্ছে। এতে মানসিক যে উদারতা সেটা একেবারে শূন্যের কোটায় চলে যাচ্ছে।’

নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর বিষয় উল্লেখ করে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘যখন দেখা গেলো পুলিশের উপস্থিতিতে অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানো হচ্ছে, তখন ধিক্কার দিতে হয়, এটা কী করে সম্ভব! পুলিশের সামনে ও জেলা প্রশাসকের সামনে জুতার মালা পরানো হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, ঘটনাক্রমগুলো এমনভাবে ঘটছে যে-শিক্ষকদের মধ্যে যারা সংখ্যালঘু, তারাই বেশি আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এটি বড় ধরনের চক্রান্তের ইঙ্গিত দেয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সমাবেশ।

যেকোনো ধর্মের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে ঢাবির সাবেক এই ভিসি বলেন, ‘শিক্ষাকে ধর্মীয়ভাবে ভাগ করা হচ্ছে, কেউ মনে করছে সে মুসলমান ধর্মের, কেউ মনে করছে, সে হিন্দু ধর্মের। এতে একে অন্যকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করছে। সব ধর্মের মধ্যে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত শিক্ষা চালু করা দরকার। সেটা হবে মানবধর্ম। এতে কোনো ধর্মের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা স্মরণ করে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘যদি সুশিক্ষিত না হই, তাহলে আমরা আধুনিক জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারি না। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে তিনি যে কাজগুলোতে হাত দিয়েছিলেন, তারমধ্যে শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ‘ক্রমেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার যে সম্পর্ক সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য দায়ী শুধু শিক্ষার্থী নয়, পরিবার ও শিক্ষকরা দায়ী। অভিভাবকদের উচিত, ছেলে-মেয়েরা কাদের সঙ্গে সঙ্গ দিচ্ছে, সেটা খেয়াল রাখা। খারাপ সঙ্গ থেকে ছেলে-মেয়েদের দূরে রাখা। তাদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানবিক শিক্ষা দেওয়া। একটা বিষয় বলতে হয়, আইন করেই কেন শিক্ষার্থীদের মানবিক করতে হবে! তাদের ভেতর থেকে ভালো হতে হবে। কোভিড পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা একটু বেশি মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোরোগ চিকিৎসা সেবা চালু করেছি। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেছি।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ।

আশিক উল্লাহ নামের একজন রাবি শিক্ষার্থী গতকাল ক্লাস চলাকালীন তার শিক্ষককে ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ করে লাঞ্ছিত করে, সে সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, ‘আশিক উল্লাহ নামের একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে। আশিক উল্লাহ একজন মানসিক রোগী। তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’  

শিক্ষকদের ওপর হামলার বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, ‘সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এজন্যই দায়ী। শিক্ষকদের ওপর হামলা নিন্দনীয়। যারা শিক্ষকদের ওপর হামলা করেছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’ তিনি বলেন, ‘আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতির ব্যানারে শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানানো হয়েছে। এর সঙ্গে যারাই জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।’

গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতিতে একটা অশ্রদ্ধাবোধ কাজ করছে। সাম্প্রদায়িক মনোভাব জোরালো হয়ে উঠছে। মানুষ ভিন্নমত, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারছে না। পারিবারিক শিক্ষায় নৈতিকতা অনুপস্থিত। নোংরা রাজনীতির আস্ফালন সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়ানো, এগুলো শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত দেখছে, তারা শিখছে আবার প্রয়োগ করছে। শিক্ষার্থীদের মানবিক করতে হলে একটি সহিষ্ণু সমাজ ব্যবস্থা ও রাজনীতির পরিবেশ দরকার। তাহলে ছেলে-মেয়েরা আদর্শিক হবে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. সেলিনা আখতার বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের একটি সোনালি অতীত ছিল। ১৯৪৮ সালের পর তারা দেশ গঠনেও অনন্য অবদান রেখেছেন। অনেক সময় দেখেছি শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাহলে কেন তাদের অবক্ষয় হলো। এজন্য কিছু কারণ দায়ী। পুরো সমাজ ধসে গেছে, অনেক দুষ্টু শিক্ষক নিজের স্বার্থ উদ্ধারে অনৈতিক কাজে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছেন, সমাজপতিরা তাদের হাতে অশুভ শক্তি দিয়ে অপ-রাজনীতিতে তাদের ব্যবহার করছেন, পারিবারিক শিক্ষার অভাব রয়েছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িকতাও অন্যতম কারণ।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন।

ড. সেলিনা আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ও পারিবারিকভাবে শিক্ষার্থীদের অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মানবিক শিক্ষা দিতে হবে। আর উৎপল সরকার হত্যায় জড়িত শিক্ষার্থী জিতুর মতো যারা শিক্ষকদের হত্যা করে, লাঞ্ছিত করে, সেসব শিক্ষার্থীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। অন্যায়ের যখন শাস্তি হবে, তখন ধীরে ধীরে অন্যায়গুলো কমে যাবে।’

গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. শেখ শফিউল ইসলাম বলেন, ‘আমি একজন অভিভাবক হিসেবে বলবো, শিক্ষার্থীরা সহিংস হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার অভাব। বাবা-মা বা অভিভাবকদের অনেকেই ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খবরটাই নেন, কিন্তু তার সব খবর রাখেন না। তারা জানেন না তাদের সন্তানরা পড়ালেখার বাইরে কাদের সঙ্গে মিশছেন, তাদের বন্ধু, বান্ধবী বা সঙ্গীরা কেমন। শিক্ষকদেরও উচিত, বইয়ের পড়ার বাইরে তাদের মানবিক হতে শেখানো, মূল্যবোধ শেখানো।’

ড. শফিউল আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বর্তমানে পড়ালেখার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশি সময় দিচ্ছে। এজন্য শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষক, সহপাঠীদের থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। তাদের সশরীরে বন্ধুর চেয়ে ভার্চুয়াল বন্ধু বেশি তৈরি হচ্ছে। এটাও অন্যতম কারণ। অভিভাবক হিসেবে ছেলেমেয়ে যেমন যত্ন নিতে হবে, তেমনি তাদের সার্বিক খবর রাখতে হবে। বাবা-মা না হয়ে তাদের বন্ধু হয়ে উঠতে হবে, যাতে তারা সবসময় বাবা-মাকে কাছে পায়।’

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক, করপোরেট ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক উদয় হাকিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বর্তমানে সহিংস হয়ে উঠছে। এর পেছনের কারণ প্রধানত দুটি। একটি সামাজিক অবক্ষয়, অন্যটি ধর্মের অপপ্রয়োগ। আমরা সবাই ধার্মিক হতে চাচ্ছি কিন্তু ধর্ম জিনিসটা কী, সেটা বুঝতে পারছি না।’

উদয় হাকিম আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজ থেকে কালচারাল অ্যক্টিভিটিস উঠে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক আচার, অনুষ্ঠান বাড়াতে হবে। কালচারাল অ্যাক্টিভিটিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে মুখ্য কারণ হচ্ছে, কালচারাল সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনীতি ঢুকে গেছে। অপরাজনীতি মুক্ত রাখবে এসব সংগঠনগুলো। সাংস্কৃতিক আচার, অনুষ্ঠান নেই বিধায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মৌলবাদী চিন্তা-ভাবনা কাজ করছে, তারা ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে।’

সাভারে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও উশৃঙ্খল আচরণের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এর প্রধান কারণ হলো নৈতিকতার অবক্ষয়। এক্ষেত্রে পরিবার এবং অভিভাবকরা দায় এড়াতে পারেন না। পরিবার থেকে তাদের যথাযথ নৈতিকতা শিক্ষা না দেওয়া এবং শাসন না করার কারণে বড় এক অংশ এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে৷ অভিভাবকদের শাসনের পাশাপাশি স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের উচিত হবে এ ধরনের অপরাধকারীদের বয়স বিবেচনা না করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা।’

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার তারিন বলেন, ‘আমি মনে করি সঠিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের অভাবে এখনকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের আচরণ দেখা যায়। মানুষের আচরণে বেড়ে ওঠাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক পারিবারিক শিক্ষা এবং সুশিক্ষার অভাবে এমনটা হয়। শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এমন আচরণ ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।’

ইত্তেফাক/এনই/এএএম