শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

উদাসীনতায় ভয়ংকর রূপ নিতে পারে করোনা, আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ০৩:৩০

দেশে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাওয়ার মূল কারণ হবে উদাসিনতা। সংক্রমণের চতুর্থ ঢেউ চলার পরিপ্রেক্ষিতে অফিস-আদালত, ধর্মীয় প্রার্থনার স্থান, গণপরিবহন দোকান, শপিংমল, বাজার, ক্রেতা-বিক্রেতা, হোটেল রেস্টুরেন্টে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরাসহ ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। তবে মাস্ক পরতে উদাসিনতা দেখা গেছে সাধারণ জনগণের মধ্যে। অধিকাংশই মাস্ক পরছে না, স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। কারো-কারো সঙ্গে মাস্ক থাকলেও না পরে সেটি পকেটে, হাতে বা গলায় ঝুলিয়ে রাখছেন। আবার অনেকের জ্বর, সর্দি-কাশিসহ করোনার উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষা না করে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে অন্যদের ব্যাপক হারে সংক্রমিত করা হচ্ছে। করোনার পরীক্ষা এখন অনেক সহজ করা হয়েছে, কিন্তু তারপরও মানুষের উদাসিনতা দেখা যাচ্ছে। 

স্বাস্থ্যবিধি মানা ও পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে জনগণের এমন উদাসীনতা চলতে থাকলে করোনা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ইতিমধ্যে সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দেখা দিয়েছে। সামনে ঈদুল আযহা। তাই করোনা থেকে নিরাপদ থাকতে চাইলে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার একটি নির্দেশনা দিয়েছে, তবে তার বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি। নো মাস্ক, নো সার্ভিস নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন হতে হবে। নইলে তৃতীয় ঢেউয়ের চেয়ে চতুর্থ ঢেউয়ে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দেবে। চিকিৎসা পেতে আইসিইউয়ের জন্য আবারো হাহাকার শুরু হবে।

দেশে গত এক দিনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত আরো পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত ১৬ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। সামনে ঈদুল আযহা উপলক্ষে গরুর হাট। সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে। তাই সব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, করোনার এক ডোজ টিকা নিয়ে অনেকে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেননি। এ তালিকাও সরকারের কাছে আছে। তাদের দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার জন্য যা যা করার দরকার প্রশাসনকে তাই করতে হবে। আর যারা বুস্টার ডোজ নিয়েছেন তাদের পূর্ণাঙ্গ ডোজ নেওয়া হয়েছে, এক্ষেত্রে তাদের ঝঁুকি অনেক কম। তবে যারা এখনো বুস্টার ডোজ নেননি, তাদের দ্রুত বুস্টার ডোজ নিতে হবে। অন্যদিকে যারা কোন টিকা নেননি, তাদের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সবার মাস্ক পরতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। নইলে সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়বে। আগের মতো আইসিইউয়ে সিট সংকট দেখা দেবে। একই সঙ্গে সময়মতো করোনা ভাইরাসের টিকা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, সিলেটে বন্যা দুর্গত এলাকায়ও করোনা দেখা দিয়েছে। অবশ্য সেখানে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। সামনে ঈদ। এসব কারণে সামনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। সবাইকে মাস্ক পরতেই হবে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, করোনার উপসর্গ থাকলেও অনেকে পরীক্ষা করছেন না। এটা খুবই বিপদজনক। সামনে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম মূল কারণ হবে এটি। কারণ উপসর্গ দেখা দিলে সংক্রমিত হতে, এক্ষেত্রে সে অন্যকে সংক্রমিত করছে। পরীক্ষা না করালে ঘরে বসে থাকুক। উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষা করে নিরাপদে থাকতে হবে। দেশে দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন ৭১ ভাগ মানুষ। এক ডোজ টিকা নিয়েছেন ৭৭ ভাগ মানুষ। বুস্টার ডোজ নিয়েছেন ৩ কোটির বেশি মানুষ। এক ডোজ টিকা নেওয়ার পর যারা সময় অতিক্রম হওয়ার পরও দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেননি, তাদের দ্রুত দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিতে হবে। দ্বিতীয় ডোজ না নিলে টিকার কার্যকারিতা থাকবে না। আর যারা এখনো বুস্টার ডোজ নেননি, তাদেরও দ্রুত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

গত ১৬ জুন থেকে প্রতি দিনই পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার টানা ১৪ দিন ৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় এরই মধ্যে বাংলাদেশের করোনার চতুর্থ ঢেউ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি ঘোষণা করলেও ভ্রুক্ষেপ নেই সাধারণের। মাস্ক পরছে খুব কমসংখ্যক মানুষই। জনস্বাস্হ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নির্দেশনা দিলেই এই পরিস্হিতির পরিবর্তন আসবে না। এই নীতি বাস্তবায়নে প্রশাসনকে মাঠে থাকতে হবে। তবে গতকাল রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আইনি ব্যবস্হা গ্রহণের কোনো নমুনা চোখে পড়েনি। নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাউকে মাঠেই পাওয়া যায়নি। ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। প্রথম ঢেউ নিয়ন্ত্রণে আসে ২০২১ সালের ফেব্র‚য়ারিতে। একই বছরের মার্চে ডেল্টা ধরনের করোনায় আসে দ্বিতীয় ঢেউ। এ পর্যায়ে উদ্বেগজনক পরিস্হিতি তৈরি হয় গত জুলাইয়ে। এক পর্যায়ে শনাক্তের হার ৩৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে আসার পর দেশে তৃতীয় ঢেউ নিয়ে আসে করোনার আরেক ধরন ওমিক্রন। তৃতীয় ঢেউয়ের সময় ২৮ জানুয়ারি করোনা শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ দাঁড়ায়, যা দেশে করোনা সংক্রমণ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। তবে তৃতীয় ঢেউয়ে আক্রান্ত বেশি হলেও মৃতু্য ছিল তুলনামূলক কম। এই ঢেউ দ্রুত নিয়ন্ত্রণেও আসে। গত ১১ মার্চ তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর মাস্ক পরা ছাড়া করোনাসংক্রান্ত সব বিধিনিষেধ তুলে দেয়া হয়। তবে জনগণের মধ্যে মাস্ক পরা নিয়ে অনীহার বিষয়টি আবার দেখা যায়। অথচ মাস্ক পরলে নিজে ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ রাখা যায়।

দেশে টানা চার দিন পর দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দুই হাজারের নিচে এসেছে। স্বাস্হ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১২ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করে ১ হাজার ৮৯৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর আগের টানা চার দিন দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি ছিল। সোমবার দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়ায়। সেদিন ২ হাজার ১০১ জন শনাক্তের কথা জানায় স্বাস্হ্য অধিদপ্তর। মঙ্গলবার ২ হাজার ৮৭ জন, বুধবার ২ হাজার ২৪১ জন এবং বৃহস্পতিবার ২ হাজার ১৮৩ জন রোগী শনাক্ত হয়। নতুন রোগীদের নিয়ে দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮২ জন। তাদের মধ্যে ২৯ হাজার ১৫৪ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনা ভাইরাস। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্হ হয়ে উঠেছেন ২৪৮ জন কোভিড রোগী। তাদের নিয়ে ১৯ লাখ ৭ হাজার ৭৫৭ জন সেরে উঠলেন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচ জনের মধ্যে পুরুষ তিন জন এবং নারী দুই জন। এরমধ্যে বয়স বিবেচনায় ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে মারা গেছেন এক জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে তিন জন এবং ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে একজন। মৃত সবাই ঢাকার বাসিন্দা।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন