শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রওশনের ডাকে এলেন না জাপার এমপি-নেতারা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ০২:৫২

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে দীর্ঘ প্রায় আট মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চিফ প্যাট্রন রওশন এরশাদ দলের নেতাদের নিয়ে ‘মতবিনিময় সভা’ ডাকলেও কেউ সাড়া দেননি। গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলে জাপার ব্যানারে আয়োজিত এই মতিবিনিময়ে রওশন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুসহ প্রেসিডিয়ামের সব সদস্য, দলীয় সংসদ সদস্য ও দলের সাবেক সংসদ সদস্যদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে দলের প্রেসিডিয়ামের দুই জন সদস্য ছাড়া আর কেউ রওশনের সভায় যাননি, দলের এমপিরাও কেউ যাননি। বরং রওশন যখন মতবিনিময় সভা করছিলেন, তখন জি এম কাদেরসহ দলটির নেতা-এমপিদের বেশির ভাগই বনানী কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন।

এ বিষয়ে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, ‘ম্যাডাম জি এম কাদেরকে ফোন করে বলেছিলেন তিনি যেন এমপিদের সঙ্গে নিয়ে ওয়েস্টিনে যান। সেই অনুযায়ী জি এম কাদের সাহেব এমপিদের সবাইকে সকাল ১১টায় বনানী কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান। আমরা সবাই বনানী কার্যালয়ে আসার পর জানতে পারি উনি (রওশন) একই সময়ে দল থেকে বহিষ্কৃতদেরও ডেকেছেন। এ কারণে আমরা কেউ আর ওয়েস্টিনে যাইনি।’

চুন্নু বলেন, ‘পরে আমি বনানী অফিসে বসে ম্যাডামকে ফোন করে বলেছি- এমপিদেরকে ডেকে একই সময়ে বহিষ্কৃতদেরও ডাকা ঠিক হয়নি। ঠিক আছে, আপনি সময় দিলে জি এম কাদের সাহেবের নেতৃত্বে আমরা এমপিরা সবাই আগামীকাল (আজ রবিবার) আসব।’

জাপা মহাসচিব বলেন, ‘কথা ছিল এমপিরা সবাই রওশন এরশাদের সঙ্গে দেখা করবেন। কিন্তু রওশন এরশাদ তো ‘মতবিনিময় সভা’ ডাকতে পারেন না। এটা করতে পারেন পার্টির চেয়ারম্যান। তাছাড়া আমাদের পার্টির সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, প্রেসিডিয়ামের সদস্যরা যে কেউ চাইলে সুবিধামতো সময়ে রওশন এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন, সেক্ষেত্রে সবাইকে একত্রে গিয়ে সভা করার কিছু নেই। কেননা, সভা ডাকতে পারেন কেবল পার্টির চেয়ারম্যান।’

রওশনের মতবিনিময় সভায় জাপার প্রেসিডিয়ামের দুই সদস্য হাবিবুর রহমান হবি ও কারি হাবিবুল্লাহ বেলালী উপস্থিত ছিলেন। সংসদ সদস্যদের মধ্যে শুধু রওশনপুত্র রাহ্গীর আল মাহী (সাদ) এরশাদ ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ। এছাড়া জাপার সর্বশেষ কাউন্সিলে জি এম কাদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর যেসব নেতা দলের পদ-পদবি থেকে বাদ পড়েছেন কিংবা বহিষ্কার হয়েছেন, তাদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন এই সভায়।

ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত একাধিক জন ইত্তেফাককে জানান, আমন্ত্রণ জানানোর পরেও দলের এমপি-নেতারা কেউ না আসায় রওশন অবাক ও ব্যথিত হয়েছেন। অনানুষ্ঠানিকভাবে রওশন উপস্থিত নেতাদের বলেছেন, ‘যাদেরকে আমি এমপি বানালাম, তারাও কেউ এলো না!’

মতবিনিময় সভায় রওশন বলেছেন, ‘যারা আজকের এই সভায় এসেছেন তারাই পার্টির প্রকৃত নেতা। আজ এরশাদ সাহেব নেই। উনি থাকলে পার্টি অন্যরকম হতো। উনি নেই, তাই পার্টি আজ এলোমেলো হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, যাদেরকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং যারা পার্টি ছেড়ে চলে গেছেন, তাদেরকে ফিরিয়ে ঐক্যবদ্ধ জাপা গড়তে হবে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেনের মতো ভালো ভালো নেতা আজ আমাদের সঙ্গে নেই। প্রয়াত মিজানুর রহমান চৌধুরী ও কাজী জাফর আহমদের মতো নেতারাও পার্টি ছেড়ে গিয়েছিলেন। নতুন প্রজন্মকে দলে আনতে হবে।

উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশে রওশন বলেন, কে কী করল বা কে কী বলল, সেদিকে না তাকিয়ে নিজ এলাকায় দলকে শক্তিশালী করুন, দেখবেন আপনাকে কেউ পায়ে ঠেলে দিতে পারবে না। আমি জানি আপনাদের মনে অনেক ব্যথা। কিন্তু সব ব্যথা জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। পার্টিকে শক্তিশালী করা না গেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকা যাবে না। আমরা কি বিএনপির সমকক্ষ হতে পেরেছি, নিশ্চয়ই না। বিএনপি আছে, জামায়াত আছে—এটা মনে রাখতে হবে। দলকে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমকক্ষ করতে না পারলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যাবে না, আমরা অনেক পিছিয়ে যাব। তিনি বলেন, পার্টিকে শক্তিশালী করতে যা করা দরকার তা-ই করব। এরশাদ সাহেব তিলে-তিলে দলটা গড়েছেন। সবাইকে নিয়েই কাজ করতে হবে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে জাপার চিফ প্যাট্রন বলেন, দীর্ঘ প্রায় আট মাস আমি থাইল্যান্ডে চিকিত্সাধীন ছিলাম। পার্টির কেউ আমার খোঁজ নেয়নি। আমি কিন্তু সবার খোঁজ নিয়েছি। অথচ যাদেরকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তারাই আমার নিয়মিত খোঁজ রেখেছেন। মসজিদ, মাজারসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে দোয়া প্রার্থনা করেছেন তারা।

রওশন বলেন, বিমানবন্দরে আমি আসার দিন (২৭ জুন) এত মানুষ আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তা দেখে আমার চোখে পানি এসেছে। প্রয়াত এরশাদকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘উনি ওপারে ভালো আছেন। মৃত্যুর আগের রাতে উনি আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহর রসুল (সা.) আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। সকালে শুনি উনি ইন্তেকাল করেছেন। উনি জান্নাতবাসী হবেন। কারণ, তিনি ইসলামের খাদেম ছিলেন। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেছিলেন, পবিত্র শুক্রবার ছুটি ঘোষণা করেন। মসজিদ-মন্দিরসহ সব উপাসনালয়ের পানি-বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করেছিলেন।’

সভায় জাপার সাবেক এমপি নূরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘পার্টির কর্মীরা আজ অসহায়, কেউ তাদের খোঁজ নেয় না। আপনাকে (রওশন) দলের দায়িত্ব নিতে হবে। রওশনের উদ্দেশে দলের প্রবীণ নেতা অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, আপনার নামের পাশে এরশাদ আছে। জাপা আজ সংকটাপন্ন। যেই লোক কোনো দিন জেল খাটেনি, রাজপথে এরশাদ-মুক্তি আন্দোলন করেনি, তার কাছে এরশাদের পার্টি নিরাপদ নয়। সাবেক এমপি জিয়াউল হক মৃধা বলেন, জাপায় শুধুই বিশৃঙ্খলা-বিভক্তি। কেন্দ্রে শুধু পদ আমদানি হয়, মুরগির মতো দলীয় পদ বিক্রি হচ্ছে।

রওশনের এই সভায় জাপার সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট’-এর চেয়ারম্যান কাজী মামুনুর রশিদ বলেন, আমাদের আজ খুব দুঃসময় চলছে। আপনি (রওশন) যখন অসুস্থ তখন আপনার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মাহফিল করলে আমাকে বাধা দেওয়া হয়। আপনি যখন সংকটাপন্ন অবস্থায় থাইল্যান্ডে যান, পরদিন তারা দল বেঁধে কক্সবাজারে গিয়ে আনন্দ করেছে। সাদ এরশাদকে পার্টির চেয়ারম্যান করতে রওশনের প্রতি দাবি জানান কাজী মামুন। সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাপার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন রাজু; সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এ সাত্তার, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী ও ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর; দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম নুরু, মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক ও আশরাফ সিদ্দিকী; শ্রমিক নেতা শাহ আলম তালুকদার; মহিলা নেত্রী হাসনা হেনা, শারমিন পারভীন লিজা, রুনা শেখ ও হাফছা আক্তার প্রমুখ।

ওয়েস্টিনে মতবিনিময় সভার বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসিহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘ম্যাডাম নিজেই প্রোগ্রামটি করেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে দলের সবাইকে নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন। বিষয়টি একেবারেই মানবিক, এখানে কোনো রাজনীতি ছিল না।’ ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট’-এর চেয়ারম্যান কাজী মামুনুর রশিদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘রওশন এরশাদ ঐক্যবদ্ধ জাপা গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।’ প্রসঙ্গত, মেডিক্যাল চেকআপের জন্য রওশন এরশাদ আগামী মঙ্গলবার সকালে আবার ব্যাংকক যাচ্ছেন।

ইত্তেফাক/ইআ