শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তিতা খাওয়াই, বাঁশও পাঠাই

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ০৪:০২

বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পণ্যের সংখ্যা কত? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকে হয়তো কয়েকটি পণ্যের নাম বলবেন। একসময় সর্বাগ্রে আসত পাট এবং পাটজাত পণ্যের নাম। হাল আমলে এসে সবার ওপরে যোগ হয়েছে তৈরি পোশাক। কিন্তু আমরা কয়জন জানি কত ধরনের পণ্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়? এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে তার ৭৬ শতাংশই তৈরি পোশাক। বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যের নাম বলতে বলা হয়। ছাত্ররা তার উত্তরে লেখেন, তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মৎস্য ইত্যাদি। কিন্তু তারা কয়জন জানে বাংলাদেশ থেকে মাছের আঁশ রপ্তানি হয়। কিংবা আমরা বিদেশে বাঁশ রপ্তানি করি, বিদেশিদের আমরা তিতা করলা খাওয়াই। কিংবা আমাদের উচ্ছিষ্ট চুল পরচুলা হয়ে বিদেশিদের মাথায় শোভা পায়?

  • শুরুর গল্প :পশুর হাড়

অনেকে ছোটবেলায় দেখেছেন কিছু মানুষ গ্রামের বনে জঙ্গলে পশুর হাড় কুড়াতে ব্যস্ত থাকতেন। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আজহার পর এ দৃশ্য ছিল চিরাচরিত। গ্রামের বাচ্চারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত হাড় কুড়ানোর দলের দিকে। এ যেন তাদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়। যে হাড়টি ফেলে দেওয়া হয়েছে তার আবার কাজ কি? উচ্ছিষ্ট হাড় কুড়িয়ে সেটা কোথায় পাঠানো হচ্ছে? ছোটবেলায় এ বিস্ময়ের ভেদ না করতে পারলেও বড় হয়ে জানা গেল—পশুর হাড় বিদেশে রপ্তানি করা হয়। কুড়ানির দল সেগুলো জড়ো করে শহরে পাঠাচ্ছে। এরপর তা প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কিছু কোম্পানিও গড়ে উঠে। জানা যায়, এসব পশুর হাড়ের একচেটিয়া রপ্তানিকারক ছিল বেক্সিমকো লিমিটেড। পরে আরো দু-একটি কোম্পানি হাড় রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত হয়। সাধারণত সার তৈরির কাজে এসব পশুর হাড় ব্যবহার করা হয়। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে শুরু হওয়া হাড় রপ্তানির পরিসর এখন আরো বড় হয়েছে।

  • তিতা খাওয়ানোর গল্প

বিশ্বায়নের যুগে প্রচুর বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি শাকসবজির চাহিদা প্রচুর। কি নেই সবজির তালিকায়? তিতা করলা থেকে শুরু করে কচুর লতি কিছুই বাদ নেই এই তালিকায়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যায় না এমন কোন সবজি নেই। বেশকিছু রপ্তানিকারক জোরেশোরে চালু রেখেছেন এ কর্মকাণ্ড। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা লন্ডনগামী এমন কোন বিমান নেই যেটির কার্গোতে বাংলাদেশি সবজি যাচ্ছে না। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগে এসব শাকসবজির জন্য আলাদা শেড তৈরি করা আছে। সুন্দর সুন্দর কার্টনে ভরে এসব সবজি চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য এবং দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। আলু, পটোল, ঝিঙা, কাঁকরোল, কচুমুখী, কচু, শসা, টম্যাটো, শজনে, পেঁপে সব আছে এ তালিকায়। এসব শাকসবজি রপ্তানিতে উত্সাহিত করার জন্য সরকার নগদ আর্থিক সহায়তাও দিচ্ছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে সবজি রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে। এসব সবজি বিদেশের বিভিন্ন সুপার শপে স্থান পাচ্ছে।

  • হরেক রকম মাছ, শুঁটকি

বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় না এমন কোন মাছ নেই। এখন মাছের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কুঁচিয়া। সামুদ্রিক মাছ থেকে শুরু করে পুকুর এবং ঘেরে চাষ করা মাছ রপ্তানিকারকরা নানা প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করছেন। চিংড়ি থেকে শুরু করে মলা, ঢেলা, কাচকি, রুই, কাতল, চিতল, বোয়াল, মৃগেল সবই যাচ্ছে দেশের বাইরে। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে কোরাল, রূপচাঁদা, লইট্টাসহ নানা প্রজাতির মাছ আমাদের রপ্তানি ঝুড়িতে রয়েছে। একসময় বিভিন্ন মাছ ড্রেসিং করার পর বরফে জমিয়ে প্যাকেটজাত করে রপ্তানি করা হতো। এখন এর সঙ্গে নানা ধরনের মূল্য সংযোজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এখন ‘রেডি ফর ইট’ মোড়ক দিয়ে মাছ রপ্তানি করছেন। বিদেশে বসে একজন ক্রেতা শুধু ওভেনে গরম করে এ মাছ খেতে পারেন। চিংড়ি মাছের ক্ষেত্রে এটি অনেক আগে থেকে চলে আসলেও অন্যান্য মাছের ক্ষেত্রে এটি সাম্প্রতিক যুক্ত হয়েছে। রপ্তানিকারকরা জানিয়েছে, বাংলাদেশের মিঠা পানির মাছ অনেক সুস্বাদু। বিশেষ করে এখানকার চিংড়ি মাছ পৃথিবীর সেরা। মাছ রপ্তানির সুবিধার্থে বাংলাদেশে এখন দুই শতাধিক মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা কাজ করছে। এর পাশাপাশি এখন নানা ধরনের শুঁটকিও বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।

  • বাঁশও পাঠাই আমরা

বিদেশিদের আমরা যেমন তিতা করলা খাওয়াই আবার বাঁশও পাঠাই তাদের। বাংলাদেশের নানা প্রজাতির বাঁশ শুধু আমরা যে ব্যবহার করছি তা নয়। এসব বাঁশ আমরা নানাভাবে বিদেশেও পাঠাচ্ছি। একজন রপ্তানিকারক জানান, আমরা আস্ত বাঁশ রপ্তানি করি না। বাঁশ দিয়ে বানানো বিভিন্ন আইটেম আমরা রপ্তানি করছি। তিনি জানান, ইউরোপের দেশগুলোতে অনেকেই এ পণ্য বাংলাদেশ থেকে নিচ্ছেন। এসব পণ্য তারা ড্রয়িং রুম সাজানোর কাজে ব্যবহার করছেন। আরেকজন রপ্তানিকারক জানান, মাস তিনেক আগে তিনি জার্মানিতে এক কন্টেইনার বাঁশের গোড়া রপ্তানি করেছেন। এসব বাঁশের গোড়ায় শিকড় ছিল। ঘর সাজানোর কাজে এগুলো ব্যবহার করা হবে বলে তিনি জানান। এছাড়া বাঁশ দিয়ে বানানো বিভিন্ন সামগ্রী আমাদের রপ্তানির তালিকায় রয়েছে। রপ্তানিতে চাহিদা থাকায় দেশের আনাচে কানাচে অনেক কুটির শিল্প গড়ে উঠেছে।

  • রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা কত?

বাংলাদেশে রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা কত—এ নিয়ে নানা ধরনের তথ্য আছে। তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর এক হিসেবে দেখা গেছে, এর সংখ্যা ৪ হাজারের ওপরে। বাংলাদেশ ব্যাংক মোটাদাগে বেশ কিছু ক্যাটাগরি করেছে রপ্তানি পণ্যের। এসবের মধ্যে আছে হিমায়িত এবং জীবন্ত মাছ, কৃষিজাত পণ্য, তামাক, ফুল এবং ফল, মসলা, শুকনো খাবার, পেট্রোলিয়াম উপজাত পণ্য, রাসায়নিক পণ্য, প্লাস্টিক দ্রব্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্য, নিটওয়্যার, ওভেন গার্মেন্টস, হোম টেক্সটাইল, ফুটওয়্যার, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, জাহাজ, নৌকা এবং অন্যান্য ভাসমান স্থাপনা।

  • কিছুই ফেলনা নয়

আমাদের চারপাশে আমরা যেসব অযাচিত দ্রব্য দেখি সেগুলোর কোনটাই ফেলনা নয়। যেমন আপনি কাওরান বাজার থেকে বড় একটি মাছ কিনলেন। সেখানে মাছ কাটার লোক থাকে। তিনি প্রথম মাছের আঁশ ছাড়িয়ে নেন। আপনার মনে হতে পারে এগুলো ফেলনা জিনিস। কিন্তু না। রাতের বেলা একদল লোক এসে এসব আঁশ দাম দিয়ে কিনে নিয়ে যান। এসব আঁশ বিদেশে রপ্তানি হয়। জানা গেছে, বিভিন্ন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এসব আঁশ ব্যবহার করা হয়। এখন নারিকেলের চোবড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এটি দিয়ে নানা শৌখিন আইটেম তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছেন অনেকে। রপ্তানির ক্ষেত্রে হোগলা পাতার কদরও এখন বেশ। সাম্প্রতিক কালে শোনা গিয়েছে যে বাংলাদেশে এখন হাতির পায়খানা দিয়ে কাগজ তৈরি হচ্ছে। তা আবার বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। জনশক্তিও বাংলাদেশের রপ্তানির মধ্যে পড়ে।

ইত্তেফাক/ইআ