বঙ্গবন্ধুর শৈশব ঘিরে আমাদের শিক্ষা সফর 

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ১২:৩১

বই পড়ে অর্জিত জ্ঞানের পূর্ণতার জন্যই শিক্ষা সফর গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের মাধ্যমে যে মহৎ উপলব্ধি আমরা পাই, তাকে পূর্ণ ও সার্থক করতে হলে প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা। এজন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘প্রত্যক্ষ বস্তুর সহিত সংস্রব ব্যতীত ওনই বলো, চরিত্রই বলো, নির্জীব ও নিস্ফল হতে থাকে’। বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের শিক্ষা স্থায়ী ও অধিক ফলপ্রসূ হয়। আর সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের স্থানটি যদি হয় ‘টুঙ্গিপাড়া’ তাহলে তো কথাই নেই!

যেখানে জন্ম হয়েছে বাংলা সভ্যতার আধুনিক স্থপতি ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তিনি বাংলা ও বাঙালির প্রাণপুরুষ। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সাহসীকতার জন্য পৃথিবীর বুকে জন্ম নিয়েছে 'বাংলাদেশ' নামক একটি দেশ।

শুক্রবার (১ জুলাই) সকাল ৭টায় টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে বাসে যাত্রা শুরু করে সরকারি বাঙলা কলেজ রসায়ন পরিবার। লক্ষ্য ছিল স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে টুঙ্গিপাড়া যাওয়া। তাই পদ্মা সেতু আমাদের শিক্ষা সফরকে করেছে আরও উপভোগ্য ও আনন্দময়।

শিক্ষা সফরে আমরা যা যা দেখেছি

উলপুর জমিদার বাড়ি: গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে ৮ কি.মি. দূরে উলপুর গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। আমাদের গাড়ি দুপুর ১২টায় জমিদার বাড়ি পৌছায়। গাড়ি থেকে নেমে ২ মিনিট হাঁটলেই চোখে পড়বে জমিদার বাড়ির স্থাপনা ও নির্মাণশৈলী। যা যে-কাউকে মুগ্ধ করবে। বাড়ির প্রতিটি কোণা বহন করে প্রাচীনকালের জমিদারদের আভিজাত্য ও জমিদারির ছাপ। ইট, সুরকি ও রড দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বাড়িটি। 

তথ্য মতে, প্রায় ২০০ একর জায়গা নিয়ে আনুমানিক ১৯০০ শতকের দিকে জমিদার প্রীতীশচন্দ্র রায় চৌধুরী এই জমিদার বাড়িটি তৈরি করেন। তিনি ছিলেন একজন রাজকর্মচারী। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের পূর্বে এখানে তৎকালীন বিশেষত হিন্দু জমিদারেরা বসবাস করতো। এখানে তৎকালীন সময়ের আরও স্থাপনা ছিল। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ থেকে সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। এ ছাড়া, সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।

টুঙ্গিপাড়া: দুপুরের খাবার শেষ করে আমরা বিকেলে চলে যাই বঙ্গবন্ধুর পিতৃভূমি টুঙ্গিপাড়ায়। গ্রামটি পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে হলেও গ্রামের নামেই উপজেলা সদরের নাম হয়েছে টুঙ্গিপাড়া। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তার শৈশব কেটেছে এখানেই। এখানেই তিনি  অন্যায়ের প্রতিবাদী হওয়া শিখেছেন, মানুষের প্রতি দরদী। হওয়া শিখেছেন।

বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে আমরা

পাঠাগার ও জাদুঘর: বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে প্রবেশের মূল ফটকে রয়েছে পাঠাগার ও জাদুঘর। তবে প্রবেশ পথে সৈয়দ ফখরুদ্দিন মাহমুদের ৩৩ লাইনের বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা চোখে পড়বে। যার প্রথম দু'লাইন- 'যথার্থ বাঙালি, যদি তুমি হও ক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও, এই সমাধিস্থলে…'।

ভেতরে রয়েছে পাঠাগার ও জাদুঘর। পাঠাগারে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা বইসহ প্রায় ৬ হাজার বই রয়েছে। রয়েছে গবেষণাকেন্দ্র, প্রদর্শনী কেন্দ্র, উন্মুক্ত মঞ্চ, পাবলিক প্লাজা, প্রশাসনিক ভবন, ক্যাফেটেরিয়া, বকুলতলা চত্বর ও স্যুভেনির কর্নার। জাদুঘরে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নানা পর্যায়ের ছবিসহ রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা শিল্পকর্ম। প্রদর্শনীতে রয়েছে দেশ ও বিদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র। এ ছাড়াও, বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী সামরিক হেলিকপ্টারও সংরক্ষণ করা হয়েছে।  

বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ: ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালের ১৭ মার্চ সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এই সমাধিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০১ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকন্যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সমাধিসৌধের উদ্বোধন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাইগার নদের পাড়ে প্রায় ৩৯ একর জমির ওপর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ নির্মাণ করে। 

বঙ্গবন্ধুর সমাধির পাশেই রয়েছে তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান এবং মা সায়েরা খাতুনের সমাধি। তাদের সমাধি ঘীরে মূল টম্ব নির্মাণ করা হয়েছে। সমাধিসৌধের উপরে সাদা পাথরের তৈরি গোলাকার একটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের দেয়াল জাফরি কাটা, আর এই জাফরি কাটা অংশ দিয়েই সমাধিস্থলে সূর্যের আলো প্রবেশ করে কাচের কারুকাজের মধ্য দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

বঙ্গবন্ধুর আদি পৈতৃক বাড়ি: বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি পৈতৃক বাড়িটি নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমার জন্ম হয় এই টুঙ্গিপাড়া শেখ বংশে। শেখ বোরহান উদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ এই বংশের গোড়াপত্তন করেছেন বহুদিন পূর্বে। শেখ বংশের যে একদিন সুদিন ছিল তার প্রমাণস্বরূপ মোঘল আমলের ছোট ছোট ইটের দ্বারা তৈরি চকমিলান দালানগুলো আজও আমাদের বাড়ির শ্রীবৃদ্ধি করে আছে। বাড়ির চার ভিটায় চারটা দালান। বাড়ির ভেতরে প্রবেশের একটা মাত্র দরজা, যা আমরাও ছোট সময় দেখেছি বিরাট একটা কাঠের কপাট দিয়ে বন্ধ করা যেত। 

একটা দালানে আমার এক দাদা থাকতেন। এক দালানে আমার এক মামা আজও কোনো মতে দিন কাটাচ্ছে। আর একটা দালান ভেঙে পড়েছে। যেখানে বিষাক্ত সর্পকুল দয়া করে আশ্রয় নিয়েছে। এই সকল দালান চুনকাম করার ক্ষমতা আজ তাদের অনেকেরই নাই। এই বংশের অনেকেই এখন এ বাড়ির চারপাশে টিনের ঘরে বাস করেন। আমি এই টিনের ঘরের এক ঘরেই জন্মগ্রহণ করি। আমাদের বাড়ির দালানগুলির বয়স দুইশত বৎসরেরও বেশি হবে।’ (সূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

বঙ্গবন্ধু গ্যালারি

হিজলতলা: বঙ্গবন্ধু বাড়ির পাশ ঘেঁষে খালের পাশেই হিজলতলা। এখানের বাঁধানো ঘাটে বঙ্গবন্ধু গোসল করতেন, খালে সাঁতার কাটতেন, হিজলতলায় অবসর সময় কাটাতেন। হিজল গাছটি আজও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছে। ঘাট পাড়ে লেখা ‘এই তো- সেই হিজলতলা। যেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বাল্যকালে গোসল করতেন’। এ ছাড়াও রয়েছে ১৮৫৪ সালে নির্মিত শেখ বাড়ি জামে মসজিদ, বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলার খেলার মাঠ, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বালিশা আমগাছ, বড় ও ছোট তালাব।

বঙ্গবন্ধুর পিতৃভূমি, তার স্মৃতিবিজড়িত স্থান আমাদের বারবার কৌতূহল সৃষ্টি করেছে যে, বঙ্গবন্ধু ছোটবেলায় কেমন ছিলেন! 
কিছু সময়ের জন্য বঙ্গবন্ধুর পিতৃবাড়ির সংস্পর্শ আমাদের আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে। কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর শৈশবের কাদামাটি মাখা গ্রাম, গ্রামীণ সৌন্দর্য আমাদের শিক্ষা সফর স্মরণীয় করে রাখবে। পরিশেষে, সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে আমরা যাত্রা করলাম। 

লেখক: শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, সরকারি বাঙলা কলেজ।

ইত্তেফাক/মাহি