শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রপ্তানি আদেশ কমছে তৈরি পোশাকের

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২২, ০০:০২

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের রপ্তানি দ্বিতীয় দফায় হোঁচট খেতে চলেছে। করোনা অতিমারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে প্রথম দফা হোঁচট খেয়েছিল দেশের রপ্তানি। সেটির রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রপ্তানির বাজারে লেগেছে রাশিয়া-ইউক্রেনের ধাক্কা। 

রপ্তানিকারকরা বলছেন, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের ক্রয় আদেশ ২০ শতাংশ কমে গেছে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ক্রয় আদেশ হিসাব করে তারা এ তথ্য দিয়েছেন। মূলত আমদানিকারক দেশসমূহের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাশিয়ায় রপ্তানি বন্ধ হবার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। সরাসরি রপ্তানির চাইতে রাশিয়ায় তৃতীয় দেশ থেকে বেশি পোশাক রপ্তানি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ যে পরিমাণ রপ্তানি করে তার ৭৭ শতাংশই হচ্ছে তৈরি পোশাক। আর এর অধিকাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে। সেখানকার দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিতে ক্রেতারা কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।

  • উদ্যোক্তাদের নানামুখী জটিলতা

বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বলছেন, ক্রয় আদেশ কমে যাওয়ার কারণে নানামুখী জটিলতায় পড়বেন উদ্যোক্তারা। করোনা অতিমারি কমে যাওয়ার পর অনেকেই পূর্বের অর্ডার ফেরত পাচ্ছিলেন। এজন্য অনেকে কারখানার সক্ষমতাও বাড়য়েছিলেন। কিন্তু পুরোদমে উৎপাদন শুরু হওয়ার পরে ধাক্কা লাগে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ। এর মধ্যে অনেক ক্রেতা অর্ডার বাতিল করেছেন আবার অনেকে অর্ডার বাতিল না করলেও তা ধরে রেখেছেন। এ কারণে কারখানার পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। পোশাক খাতের একজন বড় উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, অর্ডার বাতিল বা পিছিয়ে পড়ার কারণে উদ্যোক্তারা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। কারণ একটি কারখানার যে পরিচালন ব্যয় আছে তা কমছে না। কারখানার সরকারের সেবা যেমন—বিদ্যুৎ, গ্যাসের বিলও কমবে না। এর মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ। এসব অভ্যন্তরীণ বিষয়ের বাইরেও কিছু বিষয় আছে। ঐ উদ্যোক্তা জানান, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তার অধিকাংশই আমদানিনির্ভর। ক্রেতারা ক্রয় আদেশ দেওয়ার পর সে অনুযায়ী কাঁচামালের ঋণপত্র খোলা হয়। কিন্তু এখন অর্ডার বাতিল বা পিছিয়ে পড়ার কারণে সে কাঁচামালগুলো সরবরাহ নেওয়া যাচ্ছে না। এতে কাঁচামাল সরবরাহকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের কারখানা মালিকদের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে।

  • দেশীয় অন্য শিল্পগুলোও সমস্যায়

তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে দেশীয় অনেক শিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—দেশীয় বস্ত্রশিল্পগুলো। এসব শিল্পে উৎপাদিত সুতা এবং কাপড় ব্যবহার হয় পোশাক শিল্পে। রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়বে দেশীয় বস্ত্রকলগুলোতে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, ইতিমধ্যে দেশীয় বস্ত্রকলগুলোর ওপর রপ্তানি আদেশের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আগে রপ্তানিকারকদের কাছে তিন মাসের অর্ডার মজুত থাকত। এখন তা এক মাসের মধ্যে এসে ঠেকেছে। অনেক কারখানা মালিক প্রোফরমা ইনভয়েস (পিআই) দিলেও এলসি দিচ্ছেনা না। অনেকে এলসি দেওয়ার পরও প্রাইস নিয়ে দর কষাকষি করছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে তা নির্ভর করছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর। আমরা আশা করছি জুলাই, আগস্ট পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত থাকলেও সেপ্টেম্বরে তা ঠিক হয়ে যেতে পারে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিণতি আরো খারাপের দিকে যাবে। এছাড়া অন্যান্য পশ্চাতসংযোগ শিল্পেও (ব্যকওয়ার্ড লিংকেজ) এর প্রভাব পড়বে। বিভিন্ন ধরনের এক্সেসরিজ এবং কার্টন শিল্পের উৎপাদনও কমে যাবে। পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়ও প্রভাব থাকবে রপ্তানির।

  • কমবে চাকরির সুযোগ

বাংলাদেশের পোশাক খাতে যেসব কর্মী কাজ করেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের অনেকে চাকরি হারাতে পারেন। পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পর অর্ডার ফেরত আসা শুরু করলে নতুন করে শ্রমিকদের চাকরি হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক শ্রমিকের চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ অর্ডার না থাকলে চাকরির সুযোগ থাকবে না। উদ্যোক্তা বলছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বর্তমানে ৩৩ লাখের মতো শ্রমিক চাকরি করে। যার মধ্যে অধিকাংশই নারী। শুধু শ্রমিকই নয়, রপ্তানিতে মন্দাভাব অব্যাহত থাকলে অন্যান্য সাধারণ চাকরিজীবীরাও তাদের চাকরি হারাবেন। এক জন উদ্যোক্তা জানান, এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলো। যেসব কারখানা সাব-কন্ট্রাক্ট এ চলত তারা এখন বড় কারখানা থেকে অর্ডার পাচ্ছে না। এতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।

  • রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব

বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশে পোশাক রপ্তানি হয় তার অধিকাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে। তবে রাশিয়ার ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম আছে। রপ্তানিকারকরা জানান, রাশিয়ায় সরাসরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। সেখানে ইউরোপের তৃতীয় দেশ থেকে পোশাক রপ্তানি হয়। কিন্তু দেশটির ওপর বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর অনেক ব্র্যান্ড রাশিয়াতে তাদের স্টোর বন্ধ করে দিয়েছে। পোল্যান্ডের একজন বায়ারের কাছে পোশাক রপ্তানি করেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তা এ বি এম সামছুদ্দিন। ইত্তেফাককে তিনে বলেন, রাশিয়াতে ঐ বায়ারের ৫৬৫টি শপ ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এসব শপ চীনা উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এখন তারা চীন থেকে পোশাক নিয়ে তাদের দোকান চালাচ্ছেন। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক এই সহসভাপতি বলেন, মন্দার ধাক্কা এখন উন্নত দেশগুলোতে চলছে। এটি শেষ দিকে এসে আমাদের মতো দেশগুলোকে আঘাত করবে। উন্নত দেশগুলোর ক্রেতাদের কেনার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অনেকে পোশাকের মতো পণ্য কিনতে রেশনিং করছেন। অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের অনেক কারখানা এখন সক্ষমতার অর্ধেক চালাচ্ছে বলেও তিনি জানান।

  • পণ্যের মূল্য বড় ফ্যাক্টর

চলমান পরিস্থিতিতে কিছু সুযোগসন্ধানী ক্রেতাও আছেন। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেক ক্রেতা পোশাকের দাম কমাতে চাইছেন। এমনিতে করোনার সময় নানা কারণে তারা পোশাকের দাম কমিয়ে এনেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা এই দাম আরো কমিয়ে আনতে চান। সহসা যে এই সমস্যা কাটবে না তা বিশ্বব্যাংকও বলছে। সংস্থার প্রেসিডেন্ট ডেভিড মালপাস বলেছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে মূল্য ঠিক হওয়ার কোনো আশা নেই। কারণ অনেক দেশের মূল্যস্ফীতি এখন ঊর্ধ্বমুখী। আইএমএফের অর্থনীতিবিদরাও একই মন্তব্য করেছেন। দেশের এক জন উদ্যোক্তা বলেন, ক্রেতারা এখন মূল্য কমানোর জন্য নানা অজুহাত খুঁজছেন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় সস্তায় পোশাক রপ্তানি একবারেই অসম্ভব।

ইত্তেফাক/ইআ