ইত্তেফাক অনলাইনে প্রতিবেদন প্রকাশের পর

রাজউক ভবনে মাদকবিরোধী ‘লিফলেট’

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২২, ২০:১৫

ঢাকার দিলকুশায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবনে মাদকবিরোধী লিফলেট ও অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজউক ভবনে মাদক নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনে ‘মাদকের আখড়া রাজউক ভবন: কে বা কারা সেবন করে জানে না কেউ!’ সংবাদ প্রকাশের পর এ আদেশ জারি করে প্রতিষ্ঠানটি।

রাজউকের এনেক্স (দ্বিতীয়) ভবনে ফেনসিডিলের অসংখ্য খালি বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। ওই ভবনের সানস্যাডে ফেনসিডিলের খালি বোতল পড়ে রয়েছে এমন সংবাদ গত ১৪ জুন ইত্তেফাক অনলাইনে প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে নড়েচড়ে বসে প্রতিষ্ঠানটি।

সরজমিনে দেখা যায়, রাজউকের মূল প্রবেশ পথে মাদকবিরোধী অফিস আদেশ পত্র টানানো হয়েছে। রাজউক এনেক্স (দ্বিতীয়) ভবনের দ্বিতীয় তলার সানস্যাড কিছুটা পরিষ্কার দেখা গেছে। এছাড়া ভবনের প্রথম তলায় লিফটের প্রবেশ মুখে এবং দ্বিতীয় তলা থেকে সপ্তম তলার প্রতিটি বাথরুমের দরজায় মাদকবিরোধী লিফলেট লাগানো হয়েছে। লিফলেটগুলোতে লেখা রয়েছে-‘মাদককে না বলুন, মাদক সেবন থেকে বিরত থাকুন’, ‘মাদক সেবনকারীকে ধরিয়ে দিন’, ‘মাদকের সবটাই অপকার, কোন উপকারী দিক নাই’, ‘জীবন একটাই তাকে ভালোবাসুন, মাদক থেকে দুরে থাকুন’।

রাজউক এনেক্স (দ্বিতীয়) ভবনের লিফটে মাদকবিরোধী লিফলেট। ছবি: ইত্তেফাক

রাজউকে সেবা নিতে আসা জীবন আলী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘এনেক্স ভবনের (দ্বিতীয় ভবন) প্রতি তলার প্রতিটি বাথরুমের সামনে মাদকবিরোধী কিছু লিফলেট লাগানো রয়েছে। আগের থেকে পরিবেশ কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছে। এখন কিছু ফ্লোরে আমাদের জন্য বসার আসন রাখা হয়েছে।’

রাজউকে সেবা নিতে আসা আরেকজন রিপন হোসেন ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘ আগে এনেক্স ভবনের (দ্বিতীয় ভবন) অনেক জায়গায় ফেনসিডিলের খালি বোতল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতো, তবে এখন সেগুলো নেই। তবে দ্বিতীয় তলার সানস্যাডে এখনো অনেক ময়লা ও ফেনসিডিলের ২-৩টি খালি বোতল পড়ে রয়েছে। তবে এই ভবন মূল ভবনের তুলনায় অনেক অপরিচ্ছন্ন।’

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবন। ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে, গত ১৫ জুন রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) স্বাক্ষরিত এক ‘অফিস আদেশ’ জারি করা হয়েছে।

ওই আদেশপত্রে বলা হয়, রাজউক-এর কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস ছুটির নির্ধারিত সময় বিকাল ৫টার পর কর্মস্থলে অবস্থান করতে পারবেন না এবং অফিসের নিজস্ব গাড়ি ব্যতীত কোন গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না। তবে জরুরি প্রয়োজনে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে অবস্থান করতে হলে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

আদেশপত্রে আরও বলা হয়, রাজউকে কর্মরত সহকারী পরিচালক ও সমমর্যাদা সম্পন্ন কর্মকর্তাদের অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ভবনে শৃঙ্খলাবিরোধী কোন কর্মকাণ্ডে (মাদক বহন ও সেবন এবং অনৈতিক কাজ) যাতে জড়িত না থাকেন, সে বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

এনেক্স (দ্বিতীয়) ভবনের দ্বিতীয় তলার সানস্যাড এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার করা হয়নি। ছবি: ইত্তেফাক

তাদের অধীনস্থ কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে অবহিত করবেন বলে ওই আদেশপত্রে বলা হয়।

রাজউক ভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত একাধিক আনসার সদস্য ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘‘ইত্তেফাক অনলাইনে ‘রাজউক ভবনে মাদক আখড়া’ সংবাদ প্রকাশের পর রাজউক কর্তৃপক্ষ একটি মাদকবিরোধী অফিস আদেশ জারি করে সবাইকে সর্তক করেছে। আমরা (আনসার সদস্য) ভবনের চারপাশে নিয়মিত টহল দেই এবং অফিস ছুটির নির্ধারিত সময় বিকাল ৫টার পর রাজউক প্রধান ভবনের মূল প্রবেশপথ ব্যতীত সব প্রবেশপথ (এনেক্স ভবনসহ) বন্ধ করা হচ্ছে। সকাল ১০টার আগে ও বিকেল ৫টার পর দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও অবস্থান করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

রাজউকের মূল গেইটে  অফিস আদেশ। ছবি: ইত্তেফাক

রাজউক ভবনে মাদকবিরোধী লিফলেট ও মাদক বিষয়ে কারা জড়িত তা জানা গেছে কী না-জানতে চাইলে রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে কোন বক্তব্য দিতে করতে রাজউক চেয়ারম্যান না করেছেন। গণমাধ্যমে কথা বলার জন্য রাজউকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ ও প্রোটোকল) মো. সাইফুল ইসলামের কাছে যান তিনি বিস্তারিত জানাবেন।’

ভবনের প্রতিটি তলার বাথরুমের সামনে মাদকবিরোধী লিফলেট। ছবি: ইত্তেফাক

পরবর্তীতে রাজউকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ ও প্রোটোকল) মো. সাইফুল ইসলাম কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) স্যার আমার কাছে কেন পাঠালেন?’

রাজউক ভবনে মাদক বিষয়ে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানিনা না, এটা রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) স্যার বলতে পারবেন। তবে আমাদের বোর্ড মিটিংয়ে রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা সবাইকে মাদক বিষয়ে কড়া সর্তকবাণী দিয়েছেন। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছেন। মাদক বহন, সেবন ও অনৈতিক কাজে যাতে কেউ জড়িত না হয়, এ বিষয়ে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।’

রাজউক ভবনে মাদক নিরাময় করতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে-এমন এক প্রশ্নের জবাবে রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘রাজউক ভবনে মাদকের ছড়াছড়ি, এটা ইত্তেফাক অনলাইনে সংবাদ প্রকাশের পর জেনেছি।’

রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা। ছবি: ইত্তেফাক

সংবাদ প্রকাশের জন্য ইত্তেফাক অনলাইনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করলে হয়তো আমার জানা হতো না। কারণ আমি সদ্য নিয়োগ পেয়েছি, তাই আমার অনেক কিছু এখনো জানা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজউক ভবনে শৃঙ্খলাবিরোধী কোন কর্মকাণ্ড, মাদক বহন, সেবন ও অনৈতিক কাজে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এনেক্স (দ্বিতীয়) ভবনের বিভিন্ন স্থান আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ফেনসিডিলের খালি বোতল অপসারণ করেছি। প্রতিটি ভবনের বাথরুমসহ বিভিন্ন স্থানে মাদকবিরোধী লিফলেট লাগানো হয়েছে এবং অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। আশা করি ভবন মাদকমুক্ত হবে।’

ইত্তেফাক/এএএম