চলতি বছরের গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এরপর থেকে বুধবার (৬ জুলাই) পর্যন্ত টানা ১৩৩ দিনের মতো চলছে এই সংঘাত। এতে দুই পক্ষের বহু হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যদিও রাশিয়া ইউক্রেনে তাদের এই আগ্রাসনকে বিশেষ অভিযান হিসেবে উল্লেখ করে আসছে।
আগ্রাসনের শুরুতে রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখলের প্রাণপণ চেষ্টা চালায়। একইসঙ্গে পুতিন চেয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে উৎখাত করে সেখানে ‘পুতুল সরকার’ বসানো। তবে পুতিনের এই দুই প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। দেশটির সেনাবাহিনী বাধ্য হয়েই কিয়েভ থেকে পিছু হটে।
ওই সময় দেশটি ঘোষণা দেয়, তারা পূর্ব ইউক্রেন ও পুরো দক্ষিণ ইউক্রেন নিয়ন্ত্রণ করে নেবে। এরপরই ডনবাস অঞ্চলে দেশ দুইটির সংঘাত জোরালো হয়।ইউক্রেনের পূর্বের ডনবাস অঞ্চল লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক-এই দুইটি প্রদেশের সমন্বয়ে। ২০১৪ সাল থেকে রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীরা ডনবাসের প্রায় অর্ধেকটা নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে রাশিয়া পুরো ডনবাস অঞ্চলটি দখলের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।
লুহানস্ক প্রদেশের সর্বশেষ যে শহরটি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রনে ছিল, রাশিয়া রবিবার (৩ জুলাই) সেই লিসিচানস্কের দখল নিয়ে ঘোষণা দেয় প্রদেশটি এখন 'মুক্ত'। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক এখন ধারণা করছেন, রাশিয়ার এখন মূল টার্গেট ডনবাসের অন্য প্রদেশ দোনেৎস্ক থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের যেকোনোভাবে বিতাড়িত করা।
এরই অংশ হিসেবে দোনেৎস্কের প্রধান দুই শহর: স্লোভিয়ানস্ক ও বাখমুটের ওপর রবিবার থেকেই রাশিয়ান সেনারা তীব্র আক্রমণ শুরু করেছে। দোনেৎস্কের অর্ধেক এলাকা ইতোমধ্যেই রাশিয়ার দখলে।
রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে, ডনবাস অঞ্চল দখল করা, তাদের ভাষায় অঞ্চলটিকে ‘মুক্ত করা’। এদিকে প্রেসিডেন্ট পুতিন লিসিচানস্ক দখলের মধ্যে দিয়ে পুরো লুহানস্ক রুশ নিয়ন্ত্রণে আসার পর তার কম্যান্ডারদের সর্বোচ্চ ‘রাশিয়ার বীর’ খেতাব দিয়েছেন।
তবে পুরো ডনবাস দখলের পর পুতিনের লক্ষ্য কী হবে, তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে। পুতিন বলেছেন, যে ইউনিটগুলো লুহানস্কে যুদ্ধ করেছে এবং সাফল্য ও বিজয় পেয়েছে, তাদের নিশ্চয়ই বিশ্রাম করা উচিত; যেন তাদের যুদ্ধক্ষমতা বাড়ে।
অনেক বিশ্লেষক বলছেন বা পুতিন আভাস দিচ্ছেন, রাশিয়া হয়তো ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারে।
এক্ষেত্রে হয়তো রাশিয়া মনে করতে পারে, একটি একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলে ইউক্রেনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়বে এবং ফ্রান্স ও জার্মানির মতো কিছু দেশ তখন শান্তির জন্য চাপ প্রয়োগ করবে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে তবে সমস্যা হচ্ছে দেশটির নিয়মিত অস্ত্রের সরবরাহ না থাকলে ফ্রন্টলাইনগুলোতে যুদ্ধে একটা অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ইউক্রেন ও পশ্চিমাদের ধারণা, পুতিন সহজে ডনবাস দখল করতে পারলে তিনি সহসাই ইউক্রেনে অভিযান বন্ধ করছেন না। বিশ্লেষকরা জানান, পুতিনের লক্ষ্য হতে পারে তিনি ইউক্রেনের আরও অঞ্চল দখল নেওয়ার লক্ষ্যে থাকবেন।
এরইমধ্যে রুশ এক জেনারেল বলেছেন, রাশিয়া মিকোলাইভ ও ওডেসা হয়ে রোমানিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। যেন মলদোভার রুশ অধ্যুষিত ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার একটি স্থল করিডোর তৈরি হতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, আজভ সাগরের পর কৃষ্ণসাগর থেকেও ইউক্রেনকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা আঁটছে রাশিয়া।
আল-জাজিরা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিলান-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইতালিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজের গবেষক এলেনোরা আমব্রেসেটি বলেন, পূরো (কৃষ্ণসাগর) উপকূল দখল করে ইউক্রেনের অর্থনীতিকে চরম চাপে ফেলার পথ নিতে পারে রাশিয়া, যাতে সাগর পথে ইউক্রেনের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।
তবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের দুই দেশের পক্ষ থেকেই দাবি করা হচ্ছে, তারা যুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।
এদিকে বিবিসির জো ইনউড বলছেন, ডনবাসে ইউক্রেন বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়লেও কিন্তু অন্য দিকে তারা কিছু সাফল্যও পেয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্নেক আইল্যান্ড থেকে রুশ সেনারা সরে গেছে। যদিও রাশিয়া বলেছে, তারা 'শুভেচ্ছাসূচক' হিসেবে সেই স্থান ত্যাগ করেছে।
তাই আপাতদৃষ্টিতে পুতিন ইউক্রেনে আগ্রাসনের গতি আসলে ঠিক কোথায় গিয়ে লাগাম টানছেন তা বলা অনেকটাই মুশকিল। তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, সিএনএন।

ইউক্রেনীয় বাহিনী কি মনোবল হারিয়ে ফেলছে
দনবাসে আক্রমণ জোরদারে পুতিনের নির্দেশ
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে হামলা আরও তীব্র করেছে রাশিয়া