চামড়াশিল্পে চাঙ্গা ভাব সৃষ্টির জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন 

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২২, ০৬:৩০

ট্যানারিশিল্পে চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম কোরবানির ঈদ। এ চামড়া অন্য সময় সংগৃহীত পশুর চামড়া থেকে উন্নতমানের। প্রতি বছর চামড়ার বার্ষিক চাহিদার সিংহভাগ জোগান আসে কোরবানির পশু থেকে। ফলে এ শিল্পের জন্য উন্নতমানের চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীরাও এ সময় ব্যস্ত থাকেন। কোরবানির সময় যে চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তা দিয়েই সারা বছর ট্যানারিশিল্পের কারখানাগুলো চলে। দীর্ঘদিনেও বাংলাদেশে চামড়াশিল্প এগিয়েছে অনেকটা ঢিমেতালে। 

আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শিল্পটি কিছুটা গুরুত্ব পেতে থাকে। বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাত থেকে সরকার প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। স্হানীয় ট্যানারি কারখানাগুলোতে চার ধরনের চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে ক্রাশ্ড ও ফিনিশড লেদারই বেশি রপ্তানি হয়। কাঁচা চামড়া নয়, প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে সাধারণত লাভ বেশি হয়ে থাকে। ট্যানারি মালিক, আড়তদার ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হচ্ছে। দামের দিক থেকে কাঁচা চামড়া ও ফিনিশ্ড লেদার বা লেদার গুডসের ব্যবধান অনেক। কাঁচা চামড়া রপ্তানি করে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় ঠিক একই পরিমাণ কাঁচা চামড়া থেকে উত্পাদিত ফিনিশ্ড লেদার বা লেদার গুডস রপ্তানি করে আয় হয় কয়েক গুণ। বছরে ৩০ মিলিয়ন স্কয়ার ফিট চামড়া উত্পাদন হয়। কিন্তু চাহিদা দ্বিগুনের বেশি।

অনেক দিন থেকেই নাজুক পরিস্হিতি পার করছে দেশের চামড়াশিল্প। পানির চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে কোরবানিকৃত পশুর কাঁচা চামড়া। কয়েক বছর ধরে নামমাত্র মূল্যে কাঁচা চামড়া কিনছেন ব্যবসায়ীরা। তার পরও এ খাতের বেশির ভাগ উদ্যোক্তাই খেলাপি ঋণের চক্রে আটকা পড়েছেন। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে এখনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এবং বর্জ্য ব্যবস্হাপনা চালু হয়নি। উল্লেখ্য, পোশাক খাত সরকারের কাছ থেকে সব ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা, রপ্তানিতে নগদ সহায়তা সুবিধা, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে। যেটা অন্য কোনো খাত পায় না। নানা সংকটের কারণে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না দেশের চামড়াশিল্প।

পরিস্হিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া কেনা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন ট্যানারি মালিকরা। তারা বলছেন, চামড়া কেনার মতো টাকা তাদের হাতে নেই; আবার ব্যাংকঋণও মিলছে না। হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোকে সরকার ‘রেড জোন’ ঘোষণা করায় মালিকরা সেই জমি না পারছেন বিক্রি করতে, না পারছেন বন্ধক রেখে ব্যাংকঋণ নিতে। আবার সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরীতে এখনো প্রস্ত্তত হয়নি কঠিন বর্জ্য শোধনাগার। পরিবেশবান্ধব ট্যানারি শিল্প না হওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্রও দিচ্ছে না। এমন পরিস্হিতিতে কঠিন সময় পার করছেন ট্যানারি মালিকরা। সাভারে চালু থাকা ১২৩টি ট্যানারির বেশির ভাগই চীনে চামড়া রপ্তানি করে। মহামারির প্রভাবে চীনে রপ্তানি বন্ধ থাকায় অনেক চামড়া পড়ে আছে। চীনের ক্রেতারা ট্যানারিতে চামড়া পরিদর্শনেও আসেননি।

কোনো সন্দেহ নেই যে পোশাক খাত বাংলাদেশে একটি সফল খাত। সরকার পোশাক খাতকে যে যে সুবিধা দিয়েছে, একই সুবিধা চামড়া খাতকে দিলে তারাও সফল হবে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, সমান সুবিধা পেলে চামড়া খাত থেকে বছরে ১ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হবে। চামড়া খাত নিয়ে একটা রোডম্যাপ করা জরুরি। একই সঙ্গে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দেশে চামড়াশিল্পের যথেষ্ট কাঁচামাল থাকলেও এই খাত এখনো বিকশিত হতে পারেনি। 

সিইটিপি ও বর্জ্য ব্যবস্হাপনা এখনো চালু হয়নি। কাঁচামাল থাকলেই হবে না, এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। সেখানে প্রচুর রাসায়নিক ব্যবহার হয়। শ্রমিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে। এসব কাজ করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই চামড়া খাতের রপ্তানি বাড়বে। চামড়াশিল্পে চীনের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এ দেশে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে চামড়া শিল্পে বিভিন্ন উত্পাদনমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে বাংলাদেশ। এ খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্হানের চমত্কার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এর মাধ্যমে। 

পরিবেশবান্ধব আধুনিক চামড়া শিল্প গড়ে আমাদের অর্থনীতিতে আরো চাঙ্গাভাব সৃষ্টি করা যায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুণগত মানের চামড়া, সস্তা মজুরির শ্রমিক ও কাঁচামালের সহজপ্রাপ্যতাসহ অন্যান্য তুলনামূলক সুবিধা ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারা জোরদার করতে চামড়া শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, প্রশিক্ষণ সুবিধার প্রসার ও বিদেশি ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স ইসু্যতে ট্যানারি শিল্পে গুণগত পরিবর্তন আনার জোরালো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এএইচপি