বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

করোনাকালে ঈদুল আজহা ঈদ-আয়োজন ও স্বাস্থ্যসচেতনতা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২২, ০২:২০

কোরবানির ঈদ আসন্ন। করোনা পরিস্থিতিতে এবারের ঈদের আয়োজনে যুক্ত হবে সতর্কতা। ঈদ হলো আনন্দের উপলক্ষ্য। বিশ্বব্যাপী করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে এবার কোরবানি ঈদের আমেজ একটু ভিন্ন। আনন্দের মাঝে দেখা দিয়েছে নানা শঙ্কা, জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। আমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের একটি পবিত্র ঈদুল আজহা। এই ঈদে পশু কোরবানি দেওয়া ধর্মীয় বিধান। কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে পশু জবাই ও খাদ্য গ্রহণের প্রতিটি স্তরে স্বাস্থ্য সতর্কতা মেনে চলা যাবে কি না তা নিয়ে রয়েছে নানা বিভ্রান্তি। ধর্মীয় রীতি ও আনন্দ ভাগাভাগি করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি বা স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্ভাবনা কমবে এবং করোনাকালেও ঈদকে আনন্দময় করে তোলা যাবে।

ঈদ উদযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে কম সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে জড়ো হন। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে যত্রতত্র হাট বসানো বন্ধ করতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা, হাটের ইজারাদার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সরকারকে যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, প্রয়োজনে মানতে বাধ্য করতে হবে। পশু কোরবানি এবং পশুর মাংস প্রস্তুত করার সময়ে যতটা পারা যায় সীমিত সংখ্যক লোক কাজে লাগাতে হবে। এই সময়ে কাজে নিয়োজিত থাকা সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। পশু কোরবানি, মাংস প্রস্ত্তত করার আগে ও পরে প্রত্যেকের হাত সাবান পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এই সময়ে শিশু, বৃদ্ধ এবং যারা অন্যান্য রোগে ভুগছেন তাদের এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা ভালো।

কোরবানির মাংস বিতরণে সতর্ক হতে হবে, তা নাহলে মানুষের স্বাস্থ্য-ঝুঁকি হুমকির মুখে পড়তে পারে। শহরে বা গ্রামে একত্রে জড়ো না হয়ে পরিচিত মানুষদের বাড়িতেই কোরবানির মাংস পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে। মাংস বিতরণের ক্ষেত্রে চেষ্টা করা উচিত অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গায়, দূরত্ব বজায় রেখে মাংস বিতরণ করা। মসজিদ, এতিমখানাসহ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে ধর্মীয় যেসব বিধি আছে সেগুলো যেমন মানতে হবে, তেমনি স্বাস্থ্য-সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

কোরবানির ঈদ আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো খাবার। অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মূল আয়োজনে থাকে বিভিন্ন রকমের মাংসের পদ, যেমন গরু, খাসি, মহিষ এমনকি উটের। ঈদ উত্সবে সবারই মনের প্রবল ইচ্ছা বেশি করে মাংস খাওয়া। তবে খাদ্য সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। জনগণের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—কোরবানির মাংস খাওয়ার মাধ্যমে করোনা ছড়ানোর সম্ভাবনা আছে কি না? উত্তর হচ্ছে, কোরবানির মাংস কিংবা যে কোনো মাংস যদি ভালোভাবে সিদ্ধ করে রান্না করা হয়, তবে করোনা কেন, তা থেকে কোনো রোগ-জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা নেই। সুতরাং ভালোভাবে রান্না করা কোরবানির মাংস গ্রহণ করলে কোনোরকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা নেই। তবে রান্না করার আগে রাঁধুনিরা অবশ্যই হাত সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নেবেন। রান্নায় ব্যবহৃত বাসনপত্র ডিটারজেন্ট দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। করোনাভাইরাসের ভয় ছাড়াও সব সময়ই কোরবানির ঈদে মানুষের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে থাকে নানা প্রশ্ন। বিশেষ যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগেন তাদের মনেও খাবার নিয়ে থাকে অনেক সংশয়। এক্ষেত্রে বলা যায়, দু-এক দিন বেশি খেতে যদিও খুব বাধা নেই, তবু খাওয়া উচিত রয়ে-সয়ে। সমস্যা হতে পারে যাদের পেটের পীড়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে বা যাদের এসব রোগের প্রাথমিক লক্ষণ আছে।

পরিমাণমতো খাবেন

মূল সমস্যাটা নিঃসন্দেহে খাবারের পরিমাণে। অনেকেই একসঙ্গে প্রচুর তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে হজম করতে পারেন না। তাছাড়া কোরবানির মাংস পরিমাণে একটু বেশিই খাওয়া হয়। ফলে পেট ফাঁপা, জ্বালাপোড়া, ব্যথা, বারবার পায়খানা হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে অনেকে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। যদিও কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে মানা নেই; কিন্তু পরিমাণ বজায় রাখা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে শুরু থেকেই পরিকল্পনা থাকা উচিত। যেহেতু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই সবাই মাংস খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন; তাই সকাল আর দুপুরের খাওয়াটা কম খেলেই ভালো। অন্য বাসায়ও যথাসম্ভব কম খাওয়া উচিত।

ঈদের দিন তৈলাক্ত খাবার, পোলাও, বিরিয়ানি, মুরগি, খাসি, গরুর মাংস, কাবাব, রেজালা ইত্যাদি খাওয়া হয়। এ ছাড়া আছে চটপটি, দইবড়া কিংবা বোরহানির মতো টক খাবারও। এসব খাদ্য সকাল আর দুপুরে কম খাওয়াই উত্তম। কারণ বিকেলে প্রচুর পরিমাণে মাংস খাওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।

সকালের খাবার

ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অল্প করে সেমাই বা পায়েস খান। অনেকেই শরবত, কোমল পানীয়, ড্রিংকস, ফ্রুট জুস ইত্যাদি খাওয়া পছন্দ করেন। তবে মনে রাখা উচিত, বাজারে দেশি-বিদেশি ফ্রুট জুস যা পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশির ভাগই আসল ফলের রস নয়। কৃত্রিম রং ও সুগন্ধি দিয়ে জুস নামের এসব পানীয় তৈরি করা হয় যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অতএব এসব না খেয়ে মৌসুমি ফল খাবেন, তাতে মজা ও উপকার দুই-ই পাবেন। লেবুর শরবত, বাসায় বানানো ফলের রস, কিশমিশ, বাদাম, ডাবের পানি, বোরহানি ইত্যাদি খাওয়া যায়। খাওয়ার আধঘণ্টা পর দেড় থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নামাজ পড়তে যান।

খাবার খাবেন বুঝেশুনে

এ সময় প্রচুর পরিমাণে পানি, শরবত, ফলের রস, ইসবগুলের ভুসি ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি খাবেন। পেটে গ্যাস হলে ডমপেরিডন, অ্যান্টাসিড, ওমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল-জাতীয় ওষুধ খেতে পারেন। যাদের আইবিএস আছে, তারা দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করুন। দাওয়াতে গেলে পরিমিত খাবেন। অতিভোজন পরিহার করা উচিত। রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বেন না। খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর বিছানায় যাবেন। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে পানি খাবেন না, এতে হজম রসগুলো পাতলা হয়ে যায়। ফলে হজমে অসুবিধা হয়। তাই খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পানি পান করুন।

চর্বি এড়িয়ে চলুন

আমরা রান্না সুস্বাদু হবে মনে করে মাংসে বেশ কিছু চর্বি আলাদাভাবে যোগ করি, এমন ধারণা একেবারেই ভুল। মাংসের সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে সবজি খাওয়া যেতে পারে। টাটকা সবজি পাকস্থলীকে সাবলীল রাখে। পরিমিতি বোধ যেখানে রসনা সংবরণ করতে পারে, সেখানে ভয়ের কিছু নেই। মাংসে তেল বা ঘিয়ের পরিমাণ কমিয়ে দিলে, ভুনা মাংসের বদলে শুকনো কাবাব করে খেলে, কোমল পানীয় ও মিষ্টি একেবারে কমিয়ে খেলে কোরবানির ঈদের সময়ও ভালোই থাকা যায়। সেই সঙ্গে হালকা ব্যায়াম বা বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি কমিয়ে নিতে পারলে আরো ভা‌লো।

বয়স্কদের থাকতে হবে সচেতন

মধ্যবয়সি এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের খাবার সম্পর্কে সচেতন থাকা আরো জরুরি। এমনকি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি ইত্যাদি না থাকা সত্ত্বেও এই বয়সের মানুষের ঈদের খাবারের ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার। অতি ভোজনে তাদের পেটভরা ভাব, অস্বস্তিকর অনুভূতি, বারবার ঢেকুর ওঠা এমনকি বুকে ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে। বেশি মাংস খেলে তা পরিপূর্ণভাবে হজম হতে সময় লাগে। ডায়াবেটিক রোগীকে অবশ্যই মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

মাংস সংরক্ষণ

কোরবানির পরে মাংস বিলিয়ে দেওয়ার পরেও দেখা যায় ঘরে অনেক মাংস জমা থাকে, তা ভালোভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। ফ্রিজে সংরক্ষণ সম্ভব হলে ভালো। তবে গ্রামগঞ্জে এমনকি শহরে অনেকের বাসায় ফ্রিজ না থাকলে সঠিকভাবে মাংস জ্বাল দিয়ে রাখতে হবে। এমনকি মাংস সেদ্ধ করে শুকিয়ে শুঁটকির মতো করে অনেক দিন খাওয়া যেতে পারে। খাবার আগে খেয়াল রাখতে হবে, যেন মাংসের গুণগত মান ঠিক থাকে।

ইত্তেফাক/ইআ