শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বন্যায় পানি কীভাবে বিশুদ্ধ করবেন 

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২২, ১১:৫৮

দেশে বন্যা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সিলেটে খুব ধীরে পানি নামছে। বর্ষাকাল চলমান থাকায় নূতন করে আবার নতুন নূতন এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে। বন্যায় একটা বড় সমস্যা হলো, চারদিকে অথৈ পানি থাকা সত্ত্বেও বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির বড়ই অভাব থাকে। টিউবওয়েলগুলো পানিতে নিমজ্জিত থাকে। পানির অন্যান্য উত্সগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। দূষিত পানি পান করে মানুষ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই এই সময় দূষিত পানিকে বিশুদ্ধ করার উপায় জানাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বন্যার দূষিত পানিকে বিশুদ্ধ করার বেশ কিছু উপায় আছে। যেমন— ১. পানি ফুটানো : সরাসরি বন্যার পানি ফুটানোর সময় বুদবুদ ওঠার ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে পানি বিশুদ্ধ হয়ে যায়। এর চেয়ে বেশি ফুটানো ঠিক নয়। কেননা এতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাই এ ব্যাপারে একটু সচেতন থাকতে হবে।

২. ট্যাবলেট: পানি ফোটানো বা ফিল্টার করার ব্যবস্থা না থাকলে পানি বিশুদ্ধিকরণ ট্যাবলেট দিয়ে পানি পরিশোধন করা যেতে পারে। প্রতি তিন লিটার পানিতে একটি ট্যাবলেট গুলিয়ে রেখে দিলে এক ঘণ্টা পর বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায়।

৩. পটাশ বা ফিটকিরি: এক কলসি পানিতে সামান্য পরিমাণ ফিটকিরি মিশিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা রেখে দিলে পানির ভেতরে থাকা ময়লা তলানিতে জমে। এ ক্ষেত্রে পাত্রের ওপর থেকে শোধিত পানি সংগ্রহ করে তলানির পানি ফেলে দিতে হবে।

৪. আয়োডিন: এক লিটার পানিতে দুই শতাংশ আয়োডিনের দ্রবণ মিশিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখলেও পানি বিশুদ্ধ হয়। তবে কাজটি করতে হবে দক্ষ কারো সহায়তায়। কেননা পানি ও আয়োডিনের মাত্রা ঠিক না থাকলে সেই পানি শরীরের ক্ষতি করতে পারে।

৫. হ্যালোজেন: বিশেষত তিন লিটার পানিতে একটি হ্যালোজেন ট্যাবলেট গুলিয়ে রেখে দিলে এক ঘণ্টা পর পানি বিশুদ্ধ হয়ে যাবে।

৬. বৃষ্টির পানি সংগ্রহ: বৃষ্টি শুরু হওয়ার ১০ মিনিট পর থেকে পরিষ্কার পাত্রে পানি সংগ্রহ করে রাখলে পানি পানের উপযোগী হয়। এ ক্ষেত্রে আকাশ থেকে সরাসরি পড়া বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করতে হবে। বাড়ির ছাদ বেয়ে পড়া বা গাছের পাতা ছুঁয়ে পড়া বৃষ্টির পানির সঙ্গে নানারকম জীবাণু মিশে থাকে।

৭. সূর্যের আলোর ব্যবহার: দূষিত পানি কয়েক ঘণ্টা তীব্র সূর্যের আলো ও তাপে রেখে দিয়ে বিশুদ্ধ করা যায়। সূর্যের ভায়োলেট রশ্মি পানির ব্যাকটেরিয়া, জীবাণু, পরজীবীর ডিএনএ দুর্বল করে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যের তাপে বিশুদ্ধ করা পানি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেখে দেওয়া উচিত নয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পানি ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় ৫ থেকে ২৫ মিনিট ফোটানো হলে তাতে জীবাণু, লার্ভাসহ সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর সেই পানি ঠান্ডা করে ছাঁকুনি দিয়ে ছেঁকে পরিষ্কার পাত্রে ঢেকে সংরক্ষণ করতে হবে। পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা সংগত। যেসব পাত্র বা গ্লাসে পানি খাওয়া হচ্ছে সেটিও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে। আবার সেদ্ধ করা পানি বেশিদিন রেখে দিলে তাতে আবারও জীবাণু আক্রমণের আশঙ্কা থেকেই যায়। সাধারণত ফোটানো পানি দুই দিনের বেশি খাওয়া যাবে না। ফেটানো পানিতে কিছুটা গন্ধ থাকলেও সেটা পরিষ্কার স্থানে খোলা রাখলে বা পরিচ্ছন্ন কোনো কাঠি দিয়ে নাড়াচাড়া করলে গন্ধটি বাতাসে মিশে যায়।

আমরা পানি বিশুদ্ধ করার উপায় সম্পর্কে জানলাম। এখন ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কর্তব্য হলো, পানি বিশুদ্ধকরণের বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান বন্যাকবলিত এলাকায় যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া। সম্ভব হলে বিনা মূল্যে বিতরণ করা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে পারেন।

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।

ইত্তেফাক/এমআর