বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জুয়ার টাকার জন্য মা-ছেলেকে হত্যা করেন প্রতিবেশী সাদিকুর

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২২, ০১:২৭

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ব্রাহ্মণদী ইউনিয়নের উজান গোবিন্দি এলাকার মা রাজিয়া সুলতানা কাকলি এবং তার শিশু সন্তান তালহা (৮) হত্যা মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাদিকুর সাদি (২৪) নামে এক যুবককে গত ৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআইর প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআইয়ের মহাপরিচালক বনজ কুমার মজুমদার।

পিবিআই প্রধান জানান, জোড়া খুনের ঘটনায় নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন গ্রেফতারকৃত সাদিকুর সাদি। তিনি বেশ কিছু টাকা ধার করে আইপিএল ক্রিকেটে জুয়া খেলে নষ্ট করেন। পরে পাওনাদারদের চাপে তার মাথা নষ্ট হয়ে যায়। তখন তিনি পাগলের মতো আরো টাকা খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, তার পাশের বাড়ির কাকলি ভাবির কাছে বেশ কিছু টাকা এবং ঘরে অনেক সোনাদানা আছে। তিনি জানতেন, কাকলি ভাবির একটা শিশুসন্তান ছাড়া ঐ ঘরে কেউ থাকে না। কাকলির স্বামী বছর দুয়েক আগেই মারা যান। আসামি সাদিকুর কাকলির কাছ থেকে টাকা ধার করার চিন্তা করেন।

পিবিআই মহাপরিচালক জানান, ঘটনার দিন গত ৭ জুলাই সন্ধ্যায় কাকলির বাড়ির আশপাশে হাঁটাহাঁটি করতে থাকেন সাদিকুর। রাতে যখন আশপাশের সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তিনি কাকলির বাড়ির গেটে গিয়ে ভাবি ভাবি বলে তিন-চার বার ডেকে গেট খুলতে বলেন। কিছু সময় পর কাকলি দরজার কলাপসিবল কেচি গেট খুললে তিনি জানান, তার মা ইলেকট্রিক ব্লেন্ডার মেশিনটি ধার নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। তখন আসামি ভিকটিমের ঘরে ঢোকেন। আসামি রুমে ঢুকে দেখেন, ছেলে তালহা (৮) ভাত খেয়ে ঘুমের ভাবে আছে। আসামি তখন ভিকটিম কাকলিকে পাশের রুমে আসার জন্য বলেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কাকলি পাশের  রুমে আসার পর আসামি ভিকটিমের হাতে-পায়ে ধরে ১০ হাজার টাকা চান। ভিকটিম বলেন, তার কাছে কোনো টাকা নেই। তখন আসামি অনেক জোরাজুরি করার পর কাকলি তাকে আলমারি খুলে বলেন, দেখো আলমারিতে শুধু ১০০ টাকা আছে। আর কোনো টাকা নেই। আলমারিটা খুললে আসামি কিছু সোনার জিনিসপত্র দেখতে পান। তখন সোনা নেওয়ার জন্য তার লোভ লেগে যায়। ভিকটিম কাকলি তখন চাবিটা আলমারির ওপরে রাখলে আসামি দেখে ফেলেন। পরে কাকলিকে চেয়ারে বসিয়ে বিছানার ওপর থেকে তার ব্যবহৃত ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেন সাদিকুর। কাকলি নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেলে বিছানার পাশেই রাখা ইস্তিরি দিয়ে ভিকটিমের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এতে ভিকটিম পুরাপুরি অজ্ঞান হয়ে যান। তখন সাদিকুর দ্রুত ভিকটিমের রান্নাঘর থেকে বঁটি এনে কাকলিকে জবাই করে ফেলেন।

তারপর তিনি দ্রুত আলমারি খুলে স্বর্ণালংকার (দুটি স্বর্ণের আংটি, দুটি স্বর্ণের চেইন, এক জোড়া কানের দুল) নিয়ে নেন। আসামি ঘরের ওয়ারড্রবসহ সব জায়গায় খুঁজে নেওয়ার মতো আর কিছু পাননি। তারপর তিনি পাশের রুমের খাটে ঘুমন্ত তালহাকে (ভিকটিম কাকলির ছেলে) ওই বঁটি দিয়েই জবাই করেন। তখন তালহা একটি চিৎকার দিয়েছিল। তারপর সাদিকুর দ্রুত বের হয়ে যান। এ সময় ভিকটিমের ঘরের পেছনে একজনকে ফোন চাপতে দেখে। আসামি তখন ঐ ব্যক্তির সঙ্গে কোনো কথা না বলে দ্রুত চলে যায়।

আসামির দেওয়া তথ্যমতে ভিকটিমের ঘর থেকে খোয়া যাওয়া একটি স্বর্ণের আংটি, একটি স্বর্ণের চেইন, এক জোড়া কানের দুল উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে আসামির শোবার ঘরের বিছানার তোশকের নিচ থেকে জব্দ করা হয়। পরে আসামির দেওয়া তথ্যমতে একটি স্বর্ণের আংটি এবং একটি স্বর্ণের চেইন আড়াইহাজার থানাধীন ডরগাঁও এলাকার ক্ষুদ্র স্বর্ণের দোকানদার গোপালের কাছে থেকে জব্দ করা হয়। আসামি সাদিকুর এগুলো তার মায়ের স্বর্ণ উল্লেখ করে ১৭ হাজার টাকায় বন্ধক রেখেছিল গোপালের কাছে। এছাড়া আলামত হিসেবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি লোহার হাতলযুক্ত বঁটি, একটি ইস্তিরি মেশিন ও একটি রক্তমাখা ওড়না জব্দ করা হয়।

আসামি সাদিকুর সাদি রবিবার নারায়ণগঞ্জ আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাওসার আলমের আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া ঘটনার দিন ভিকটিমের ঘরের পেছনে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী অজিদ কাজীও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

ইত্তেফাক/ইআ