চট্টগ্রামে লাইসেন্স ছাড়াই চলছে হাজারো বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এতে প্রচুর রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি তদারকি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর উদ্যোগ নেই। জনবল সংকটের অজুহাত দেখিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দেখা যায় পরবর্তী সময় কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা ঘটলে লাইসেন্সের বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। বেরিয়ে আসে নানা অনিয়মের কাহিনী।
বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লাইসেন্স গ্রহণের পর কয়েক বছর পর পর আবার সেটি নবায়নও করতে হয়। কিন্তু এই লাইসেন্স গ্রহণ ও সেটি নবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক অনীহা দেখা যাচ্ছে। ফলে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও সেবা গ্রহণের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। এতে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লাইসেন্স, নিবন্ধন ও নবায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারলে এ খাতে রাজস্ব আয় আরো দ্বিগুণ করা সম্ভব হতো।
সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সিডিএ, ওয়াসা, ওষুধ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, বিআরটিএসহ সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য ও সেবা গ্রহণে সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স গ্রহণ ও নিবন্ধন ও ছাড়পত্র গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এই নীতিমালা উপেক্ষিত হচ্ছে। সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উত্সই হচ্ছে লাইসেন্স ও নিবন্ধন খাতে ফি গ্রহণ। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এই খাতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। যার ফলে সরকার বছরে প্রচুর রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ওষুধের ফার্মেসি করতে ওষুধ প্রশাসনের লাইসেন্স নিতে হয়। লাইসেন্স আবার যথাসময়ে নবায়নও করতে হয়। এই কাজের জন্য জেলায় ওষুধ প্রশাসনের কার্যালয় রয়েছে। রয়েছে পর্যাপ্ত জনবল। প্রাপ্ত তথ্যমতে চট্টগ্রামে ওষুধ প্রশাসনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ফার্মেসি রয়েছে ১২ হাজার। অথচ বাস্তবে নগরী ও জেলায় এর তিনগুণ বেশি ফার্মেসি রয়েছে। এসব ফার্মেসি ওষুধ প্রশাসনের লাইসেন্স গ্রহণ না করে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
জেলায় ও নগরীতে বিভিন্ন দোকানে এলপি গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি অনেক মুদির দোকানেও বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার। আবার বিভিন্ন দোকানে খোলা ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল বিক্রি করা হয়। এ ধরনের অসংখ্য দোকান লাইসেন্সের বাইরে রয়েছে। জানতে চাইলে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিচালক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান খোলা জ্বালানি তেল বিক্রি করে তাদের লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লাইসেন্সের বাইরেও অনেক দোকান রয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে অনাপত্তিপত্র আনার পর আমরা লাইসেন্স প্রদান করি। একটি লাইসেন্সের জন্য প্রতি ১ হাজার লিটারে বার্ষিক লাইসেন্স ফি ৫০ টাকা হারে আদায় করা হয়।
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক স্থাপনার জন্য ফায়ার সার্ভিস থেকে লাইসেন্স বা ছাড়পত্র নিতে হয়ে। কিন্তু এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। আবার আবাসিক ও বাণিজ্যিক হোটেল রেস্টুরেন্ট করতে জেলা প্রশাসন থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। এর বাইরে সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন হোটেল ও রেস্টুরেন্ট মালিকদের ডেকে আগামী ২০ জুনের মধ্যে লাইসেন্স ও নিবন্ধন গ্রহণের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিজ উদ্যোগে গভীর নলকূপ বসালে ওয়াসা থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু এই নিয়মও চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম ওয়াসায় ব্যক্তিমালিকানাধীন লাইসেন্সধারী নলকূপের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। কিন্তু বাস্তবে নলকূপের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেশি। শিল্পকারখানায়ও গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার চলছে। এসব নলকূপ লাইসেন্সের আওতায় আনা গেলে ওয়াসার রাজস্ব আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেত। কিন্তু এ ব্যাপারে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। নগরীতে হোটেল রেস্টুরেন্টের জন্য সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে লাইসেন্স নিতে হয়।
