গবেষণায় ভোগ নয়, ত্যাগ থাকতে হয় 

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২২, ০১:৪৯

সব গবেষণার পেছনে মানুষের ত্যাগ থাকে। কখনো মানুষ সেই ত্যাগের মূল্য পায়, কখনো পায় না। তার পরও মানুষ নিজেকে গবেষণার ভেতরে ডুবিয়ে রাখে। এই ডুবে থাকাটা তখনই আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে, যখন একটা নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা গবেষকের মনের ভেতরে টুকরো টুকরো আলো ছড়াতে থাকে। সেই আলো যখন দীপ্যমান সূর্য হয়ে ওঠে, তখন গবেষকের ভেতরে অলৌকিক আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। সেটাকে টাকার অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, সেটাকে ক্ষমতার মতো ভঙ্গুর বিষয়ের সঙ্গে মেলানো যায় না। 

যদিও এখনকার বাণিজ্যিক পৃথিবীর মানুষ গবেষণাকে টাকা বানানোর মেশিন হিসেবে দেখতে ক্রমশ লোভী হয়ে উঠছে। ঠিক যেভাবে মানুষ জানত গবেষণা একটা ত্যাগ, ঠিক সেভাবে এখন জানানো হচ্ছে গবেষণা একটা ভোগ। খুব কঠিন একটা সময়, যেটা পিনপতন নীরবতার মধ্যে মানুষের চিন্তার পরীক্ষা নিতে নিতে জটিল সমীকরণ তৈরি করছে। গবেষণা বাণিজ্যিক হয়ে গেলে গবেষকদের নিজের চিন্তাটা হারিয়ে যায়, চিন্তার স্বাধীনতা বাণিজ্যিক দুনিয়ার সম্রাজ্যবাদী শক্তির দখলে চলে যায়। গবেষকেরা তখন নিজের মতো করে গবেষণা করতে পারেন না, বরং একটা পরাধীন শরীরের বোঝা মাথায় নিয়ে তার নিজের গবেষণা ভাবনা থেকে ক্রমাগত পিছু হটতে থাকেন। খুব কষ্টের হয় সেই সময়টা, যেটা গবেষক মর্মে মর্মে বোঝেন, তার গবেষণার অদৃশ্য অনুভূতিপ্রবণ শক্তিগুলো বোঝেন, তার অসহায় চুক্তির দাসখতটাও বোঝেন। তবে যখন গবেষকেরা লোভের জালে জড়িয়ে যান, তখন সেখান থেকে পালানোর আর কোনো পথ খুঁজে পান না। 

গবেষক ও গবেষণা এভাবেই বন্দিত্বের শিকল পড়ছে হয়তো প্রতিদিন। সৃজনশীলতা যখন ক্ষমতা ও অর্থের আবর্তে পতিত হয়, তখন গবেষকদের ভাবনাগুলো পথচ্যুত হয়। নতুন সৃষ্টির বিষয়টি মানুষের মৌলিক চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই মৌলিক চিন্তা তখনই তৈরি হবে, যখন গবেষক তার নিজের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হবেন। যেটি গবেষকের সহজাত চিন্তা থেকে উৎসারিত হওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। গবেষণার লক্ষ্য থাকবে, তবে সেই লক্ষ্য গবেষকের নিজের মৌলিক ধারণার অন্তর্গত হতে হবে। যখন সেখানে বাণিজ্যিক পৃথিবীর হস্তক্ষেপ ঘটবে, তখন গবেষক যেভাবে তার গবেষণার লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন, তা পরিবর্তিত হতে শুরু করবে। কারণ তখন গবেষকের চিন্তার ওপর আরেকটি আরোপিত চিন্তা প্রভাব বিস্তার করবে। তখন যা সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল তা হবে না, বরং সৃষ্টি তার গতিপথ হারিয়ে বাণিজ্যিক শক্তির চাহিদায় রূপান্তরিত হবে। এভাবে ক্রমাগত গবেষক তার নিজের মৌলিক চিন্তাধারা থেকে সরতে সরতে একসময় ফলিত চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়বেন। এর ফলে পৃথিবী নতুন নতুন গবেষণার ধারণা থেকে বঞ্চিত হবে। 

গবেষণার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আগের গবেষকেরা মৌলিক গবেষণায় যতটা অবদান রাখতে পেরেছেন, আধুনিক যুগে এসে তার পরিমাণ কমেছে। কিন্তু তার পরও মৌলিক গবেষণা এখনো পর্যন্ত যতটুকু সক্রিয় আছে, সেটাকে ঠিক ততটুকু সেই স্তরে ধরে রাখতে হলে গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণের নেতিবাচক শক্তির ওপর রেশ টেনে ধরতে হবে। গবেষকের নিজের গবেষণা চিন্তাকে সুরক্ষিত রেখেই গবেষণার প্রকৃত সত্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। এখানে প্রশ্ন আসতেই পারে, তবে কি গবেষণায় বাণিজ্যিক ভাবনা থাকবে না। এর উত্তর হচ্ছে, বাণিজ্যিক ভাবনা থাকা আর বাণিজ্যিক শক্তির হাতে বন্দি হওয়া দুটো ভিন্ন বিষয়। গবেষক যদি নিজে মনে করেন তার গবেষণার মৌলিকত্বের বাণিজ্যিক রূপান্তর প্রয়োজন, তখন গবেষকের চিন্তার স্বাধীনতাকে খর্ব না করে তার বাণিজ্যিক রূপান্তর হতেই পারে। তবে এটি এমনভাবে করতে হবে, যাতে গবেষক ও তার গবেষণা অন্যের পণ্যে পরিণত না হয়ে বরং সেটির নিয়ন্ত্রক যেন গবেষক নিজে হয়ে উঠতে পারেন। এ কথা সব সময় মনে রাখা প্রয়োজন, যে কোনো গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানবকল্যাণ। গবেষণার সুফল যাতে মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেসব গবেষণা সরাসরি মানুষের জীবনের অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত, সেগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণের পরিবর্তে সেবামূলক মানবিক ধারণা দ্বারা প্রভাবিত করা দরকার। 

গবেষণা যখন মানবসেবার উপাদান হয়ে উঠবে, তখন তা গবেষণার প্রকৃত ধর্ম নিশ্চিত করবে। গবেষণার ফলাফল বাণিজ্যক ধারণা থেকে বের করে এনে মানবিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত করতে সার্বজনীন নীতিমালা দরকার, যেটি বিশ্বজনীন ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। আবার বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি যখন মৌলিক গবেষণার অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার নিয়ন্ত্রণ যেন গবেষকের হাত থেকে বাণিজ্যিক শক্তির হাতে চলে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আবার এক দেশের মৌলিক সৃষ্টির ক্রেডিবিলিটি যাতে আরেক দেশের নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়, সেটিরও সুরক্ষা প্রয়োজন। তবে যে কোনো সৃষ্টির ইতিবাচক ফলাফল সব দেশের জন্যই উন্মুক্ত রাখার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেখানে যাতে কোনো ধরনের বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার প্রবণতা না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণার সুবিধা কেবল উন্নত দেশগুলো তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে এটিও গ্রহণযোগ্য নয়, বরং খাদ্যের মতো গবেষণায়ও বিশ্বজনীন সুষম বণ্টনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। 

আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যখন পৃথিবীর সব দেশের মধ্যে সম-অধিকারগত ভারসাম্যের বিষয়টিকে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। সেখানে মেধা বিকাশের মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এমন একটি বিষয়, যেটিকে কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত দ্বারা বিবেচনা করা ঠিক নয়। মেধার সঙ্গে গবেষণার সম্পৃক্ততা এতটাই বেশি থাকে যে পৃথিবীর প্রয়োজনেই মেধার লালন ও পরিচর্যা করা দরকার। এ কারণে গবেষণার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই সমপরিমাণ হতে হবে। গবেষণার এই সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার বিষয়টি এজন্যই বলছি, যাতে করে গবেষণাকে বিশ্বরাজনীতির বাইরে রেখে সার্বজনীন মানবিক ধারণার মাধ্যমে বিবেচনা করা হয়। গবেষক ও তার গবেষণা সব সময় নিয়ম মেনে চলে না, নিয়ম ভেঙে ফেলাতেই গবেষণার সফলতা। গবেষণার মৌলিক ধারণা কখন, কোথায়, কার মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে, এটি অনুমান করা কঠিন। গবেষণার উন্নত কাঠামো কেবল নিজেদের জন্য তৈরি করে উন্নত দেশগুলো মৌলিক গবেষণায় বেশি অবদান রাখছে, কারণ তাদের অর্থনৈতিক শক্তি তাদের ভেতরে এই সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। অথচ একই সময়ে অনেক হিডেন গবেষকের মৌলিক গবেষণায় অবদান রাখার মতো সক্ষমতা তার যে দেশগুলোতে বাস করছে সেগুলোর অর্থনৈতিক অসক্ষমতা তাদের মৌলিক গবেষণা থেকে বিরত রাখছে। ফলে পৃথিবী অনেক মৌলিক গবেষণা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

যে কোনো গবেষণা পৃথিবীর সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, এই বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখেই গবেষণার সুযোগ-সুবিধাগত সম-অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সব দেশকেই সহনশীল, মানবিক ও উদার হতে হবে। অমর্ত্য সেন ও রিচার্ড এইচ থেলারের মানবিক অর্থনীতির ধারণা গবেষণায় মানবিক ধারণা সৃষ্টির মতো মৌলিকত্বের জন্ম দেবে। যেটি মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, চিন্তা থেকে উদ্ভূত সৃষ্টির সুরক্ষা ও মানবতার কল্যাণে সৃষ্টির ব্যবহারের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে জ্ঞানভিত্তিক পৃথিবীর ধারণা দ্বারা মানুষের জীবনকে বদলে দেওয়ার রসদ পাবে।
হ লেখক :শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন