বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২২, ০৯:১০

আরবি ভাষায় ‘রুহ্’ বলে একটি শব্দ আছে, বাংলায় যার মানে করা হয়েছে ‘আত্মা’। ফের ‘রুহ্’ মানে ‘প্রাণ’। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘আত্মা’ বলে কিছু হয় না; বিজ্ঞান শুধু ‘প্রাণ’কে মানে। ‘আত্মা-পরমাত্মা’—এসব ধার্মিক তত্ত্ব মানে না। বা ঐভাবে ভাবতে চায় না। আমার বলবার কথাটি এই যে, আরবির ‘রুহ্’ বলতে ‘প্রাণ’ ও ‘আত্মা’ এই দুই লব্জোকে মেনে নিলে ক্ষতি নেই—ভাবের জগৎ তাতে বর্ধিত হয়, সংকুচিত হয় না। যদি লিখি, ‘তোমার সঙ্গে আমার প্রাণের সম্পর্ক, আত্মার মিল’—কথাটা খারাপ শোনায় না। বা যদি বলি, ‘তোমার সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক, প্রাণের ঐক্য; পরানের সঙ্গে পরানের খেলা।’ কথা তাতে জমে হয় খির। নয় কি?

প্রাণও আত্মারই মতো রহস্যময় বা mystic। প্রাণকে ‘মিস্টিক’ বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। জীবনানন্দের প্রাণভাবনাও মিস্টিক; প্রাণের ব্যাপারে জীবনানন্দও একান্ত রহস্যবাদী। জন্মান্তরবাদে রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ— এই তিন প্রধান কবিই বিশ্বাসী ছিলেন। আমারও তো বারবার এই বিশ্বসংসারে জন্মাতে ইচ্ছে করে। পাখির বেশেই আসি কিংবা মরুঅশ্ব ‘কুহেলান’ রূপেই আসি! তবে জীবনানন্দ মর্মান্িতক ভাষ্যে এ কথাও বলেছেন, ‘এ পৃথিবী একবারই পায় তারে পায়নাকো আর।’

কবিদের স্বভাবই কিছু বিচিত্র। শালিকের ছদ্মবেশে এই বাংলায় যদি আবার আসি পরের কোনো পাখিজন্মে, তাহলে আমায় কেউ চিনতে পারবে তো; আমার প্রাণের স্পন্দন কি নক্ষত্রের পাখনায় সাড়া জাগাবে কীর্তিনাশা পদ্মার আকাশের কুঞ্চিতে অন্ধকারে? এই পৃথিবী কি আকুল হবে এ কথা ভেবে, একটি শালিকও একবারই এই পৃথিবীতে আসে। পৃথিবীর এই আকুলতা কেন একটি তুচ্ছ প্রাণের জন্য? জীবনানন্দ সব ভাবনাকে উলটে দিয়ে শুধু ঘোষণা করলেন, এক জন্মে একটা প্রাণ রচিত হয়ে ঝরে যায়, সে কথা ভেবে পৃথিবী আকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু কেন এই আকুলতা! বস্ত্তত প্রাণই এ কথা বলিয়ে নেয় কবিকে দিয়ে; তখন মনে হয় প্রাণ পুরাতন, কিন্তু তা ফুটে ওঠে যে রূপ-পরিগ্রহ, তা একবারই ঘটে আর এ ঘটনায় পৃথিবীর ‘চান্স’ মাত্র একবার। একবারই সে একজনকে পায়।

প্রসঙ্গ যখন ‘প্রাণ’ তখন কথাটাকে এত চমত্কার, এত গভীর, এত রহস্য-লাগা বিস্ময়ে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করলেন যে, মনে হয় রবীন্দ্রনাথ প্রাণেরই প্রাণনে একজন আশ্চর্য মরমি। প্রাণন মানে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা। তাই নিয়েই তো বাগ্বিস্তার করেছেন এই কবি; লিখেছেন— ‘যেটুকু সাহিত্যের মর্ম, তাহা সংজ্ঞার মধ্যে ধরা দেয় না। তাহা প্রাণপদার্থের মতো— কী কী না থাকলে তা টেকে না, তা জানি, কিন্তু সে যে কী, তাহা জানি না। জীবন হইতেই জীবন সংক্রামিত হয়, অগ্নি হইতেই অগ্নি জ্বালাইতে হয়—তেমনি লেখকের অন্তরাত্মা হইতে কলসের মুখে যখন প্রাণ ক্ষরিয়া পড়ে তখনই জীবন্ত সাহিত্যের জন্ম হয়। সাহিত্য সম্বন্ধে ‘জীবন’ ‘প্রাণ’ প্রভৃতি কথাগুলো হয়তো mystic। কিন্তু পরিষ্কার কথা বলিবার কোনো উপায় নাই।’

লক্ষ করবার বিষয়, ‘অন্তরাত্মা’ অর্থাৎ আত্মা থেকেই প্রাণ এখানে ক্ষরিত হচ্ছে; তাহলে সুফি তত্ত্বের আসল কথাটাই তো বিধৃত হলো রবীন্দ্রনাথের কলমে—কথাগুলোকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিচার কি সম্ভব? পারস্য-চেতনা বাদ দিয়ে কি রবীন্দ্রচেতনা বলয় সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারে?

বাংলা সাহিত্য কেবলই ইউরোপের দানে পুষ্ট— এই একদেশদর্শিতা কেন? রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কাব্যে ইউরোপ কোথায়? কেউ কেউ বলতে পারেন, অতীন্দ্রিয়বাদ তো একা পারস্যের সামগ্রী নয়। উত্তরে আমরা বলব, রবীন্দ্র-নজরুলের অতীন্দ্রিয়বাদ আগাগোড়া পারসিক বা ইরানি সামগ্রী— তা গ্রিকবাহিত নয়। নজরুলের তাসাউফ বা অতীন্দ্রিয়-চেতনা কোরআননিঃসৃত চেতনা। তাফাউফ আরবি বাংলা মরমিয়াবাদ বা অতীন্দ্রিয়বাদ।

অতীন্দ্রিয়বাদ বাংলা সাহিত্যকে অনেক দিয়েছে। তার পূর্ণ মূল্যায়ন হওয়া দরকার। কথায় কথায় এ কথা বলতেই হলো। মূল প্রসঙ্গের মার্জিনে যেসব গৌণ প্রসঙ্গ পড়ে থাকে সাহিত্যে তারও দাম আছে। আদতে প্রাণ ও আত্মা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের যে তত্ত্বটি এখানে খোদাই করে রেখেছেন, তা অবশ্যই মিস্টিক; তথাপি তা ইউরোপীয় ধর্মমুক্ত ভাবতত্ত্বের প্রতিকূল নয়।

আমার তো মনে হয়, মহাকাশে পৃথিবীর মতো প্রাণবন্ত গ্রহ আরো অনেক রয়েছে; খোদার পরিধি অনন্ত। মানবপ্রাণ অন্তহীন; জীবনও অশেষ। তবু বাংলার মিস্টিক কবি এই ক্ষুদ্র মানবজীবনকে ঘিরে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলবেন, পথের শেষ কোথায়? ভাবুকরা বলেন, জীবন একটা ‘জার্নি’, জীবন এক ‘সফর’, একটি মঞ্জিল থেকে আর একটি মঞ্জিল অতিক্রম করে যেতে হবে— এ যাত্রার শেষ মৃতু্যতে; না সেখানেও নয় শেষ; তা চলেছে এক জন্ম থেকে আর এক জন্মের দিকে— প্রাণের এই অভিযাত্রার শেষ নেই। শেষ হতে পারে পরমাত্মার সঙ্গে প্রেমময় মিলনে। তারপর?

এখানেই আমাদের এ যাত্রা ক্ষান্ত হওয়া উচিত। খোদা থেমে পড়বেন, তা তো হতে পারে না। নবীন প্রাণের জন্য ফের তিনি নবতর গ্রহপুঞ্জ সৃজন করবেন না, তা-ও কি হয়!

আমাদের মনে পড়ে কাদমি হাদিসের সেই অমর বয়ান ‘Had I not to create you I would not have created the universes ’

আল্লাহর হাতে মানবসৃজিত না হলে, সেই খোদার হাতে আসমান সৃজিত হতো না, সেখানে অনন্ত নক্ষত্রবীথি স্পন্দিত হতো না। খোদার সৃজন উত্কর্ষের শেষ কল্পসীমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষ। সেই মানুষের অন্তরের কথা কি হতে পারে অন্য মানুষের প্রতি অনন্ত বিদ্বেষ—অন্য সম্প্রদায় বলে অনন্ত ঘৃণা! কই সেই মাটির মানুষ, যে মানুষ সর্বংসহা ধরিত্রীর মাটি দিয়ে রূপবান; কবি জীবনানন্দের বিখ্যাত লাইনটা মনে পড়ছে—‘মাটির নিঃশেষ সত্য দিয়ে গড়া হয়েছিল মানুষের শরীরের ধুলো!’

শেষ পর্যন্ত ধুলোই তো হব। দেখা যাক প্রাণ আর ধুলো নিয়ে কী কথা বলেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। কবিতাটির নাম ‘যাত্রী’—তার প্রথম দুটি স্তবক নেওয়া যাক। সৃষ্টির একেবারে গোড়ার কথাটা এরকম

— ‘মনে হয় প্রাণ এক দূর স্বচ্ছ সাগরের কূলে

জন্ম নিয়েছিল কবে;

পিছে মৃতু্যহীন জন্মহীন চিহ্নহীন

কুয়াশার যে-ইঙ্গিত ছিল

— সেই সব ধীরে ধীরে ভুলে গিয়ে অন্য এক মানে

পেয়েছিল এখানে ভূমিষ্ঠ হয়ে—আলো জল আকাশের টানে;

কেন যেন কাকে ভালোবেসে।’

তাহলে কথাটা কী দাঁড়াল? প্রাণ ক্ষরিত হলো প্রেমে—আলো-জল-আকাশের মধ্যে প্রাণ কী খঁুজে পেল? ভালোবাসা, বস্তুত অন্য প্রাণের প্রতি। তারপর কী?

‘মৃত আর জীবনের কালো আর শাদা

হূদয়ে জড়িয়ে নিয়ে যাত্রী মানুষ

এসেছে এ পৃথিবীর দেশে;...।’

তারপর?

‘কঙ্কাল অঙ্গার কালি—চারিদিকে রক্তের ভিতরে

অন্তহীন করুণ ইচ্ছার চিহ্ন দেখে

পথ চিনে এ ধুলোয় নিজের জন্মের চিহ্ন চেনাতে এলাম;

কাকে তবু?

পৃথিবীকে? আকাশকে? আকাশের সূর্য জ্বলে তাকে?

ধুলোর কণিকা অণুপরমাণু দ্বারা বৃষ্টি জলকণিকাকে?

নগর বন্দর রাষ্ট্রজ্ঞান অজ্ঞানের পৃথিবীকে?’

সুতরাং মাটির মানুষের সৃজনের মাধ্যমে খোদা কী বার্তা দিয়েছেন বিশ্বচরাচরকে? বিদ্বেষ, না প্রেম? ঘৃণা, না ভালোবাসা? সৃষ্টির মনের কথা ঘৃণা—এ হতেই পারে না।

 

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন