জলজ প্রাণী হিসাবে ডলফিন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং স্পর্শকাতর। ডলফিনকে বলা হয় ইকোলজিক্যাল ইন্ডিকেটর বা পরিবেশ-নির্দেশক। মত্স্য গবেষকরা দেখিয়াছেন, কোনো নদীতে ডলফিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইলে বুঝা যায়, নদীটির দূষণ কমিয়াছে এবং মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। অন্যদিকে যেই নদীতে দূষণ বেশি, সেইখানে ডলফিন থাকিতে চাহে না। অত্যন্ত বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন বাংলাদেশের চট্টগ্রামের হালদা নদীতে পাওয়া যায়। অত্যন্ত আশঙ্কার বিষয় হইল, সেইখানে গত পাঁচ বত্সরে ৩৮টি ডলফিন মারা গিয়াছে। বলা যায়, তাহারা আঘাত পাইয়া মারা গিয়াছে।
জরিপ অনুযায়ী হালদায় ডলফিন ছিল ১২৭টি। ৩৮টি মারা যাইবার ফলে তাহা শতকের নিচে নামিয়া আসিয়াছে। আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) তথ্য অনুযায়ী গাঙ্গেয় ডলফিন বিপন্ন একটি প্রাণী। ইহা আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, হালদার বাস্তুতন্ত্রের জন্য এই ডলফিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর দুর্বল ও মরা মাছগুলি হইতেছে ডলফিনের খাবার। তাই নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখিতে ডলফিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জানা গিয়াছে, ইতিমধ্যে হালদাকে বাঁচাইতে নদীসংলগ্ন ১৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানাইয়াছেন, হালদা নদী রক্ষায় যাহা যাহা করিবার দরকার, তাহার সকল কিছু তাহারা করিয়াছেন। হালদা নদীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনিয়াছেন। হালদা নদীসংলগ্ন ৯টি ইটভাটা বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করিয়াছেন। কিন্তু কী কারণে হালদায় ডলফিনের মৃত্যু হইতেছে, তাহা নাকি সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষ অনুধাবন করিতে পারিতেছে না!
তবে কি এই ডলফিনরা আত্মহত্যা করিতেছে? সেই ক্ষেত্রে তাহাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন কেন আসিবে? ২০১২ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুসারে এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত। উচ্চ আদালতও এই প্রাণীকে সংরক্ষণ করিতে বলিয়াছেন জরুরি ভিত্তিতে। জেলা প্রশাসককে প্রধান করিয়া কমিটিও গঠন করিয়া দিয়াছে আদালত। হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করিতে গঠিত হইয়াছে রিসার্চ ল্যাবরেটরি। ডলফিনের মৃত্যুর কারণ বাহির করিতে সাত বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়া করিয়াছে গবেষণাও। জরিপও হইয়াছে। তাহার পরও সাড়ে চার বত্সরে আঘাতজনিত কারণে কেন ৩৮টি ডলফিন মারা পড়িবে? এত যে চেষ্টা, এত যে গবেষণা এবং এত একনিষ্ঠতা—তাহা কেন বিফলে যাইতেছে? গত কয়েক দিনে যেই ডলফিনগুলি মারা গেল, তাহারা যেন বলিয়া দিতেছে আমরা প্রায় একই তিমিরে পড়িয়া আছি। তাহাদের শরীরের আঘাতের চিহ্ন যেন আমাদের উদ্যোগের কিংবা ডলফিন রক্ষার সকল আয়োজনের ভিতরে দগদগে ঘা হিসাবে প্রতিভাত হইতেছে।
গবেষকরা বলিয়াছেন, এই গাঙ্গেয় ডলফিনের লম্বা ঠোঁটে করাতের মতো দাঁত রহিয়াছে। সেই দাঁত নদীতে থাকা জালে আটকাইয়া যায়। আধঘণ্টার বেশি আটকাইয়া থাকিলে শ্বাসরোধ হইয়া ইহাদের মৃত্যু হয়। সারা বিশ্বেই লাল তালিকায় রহিয়াছে এই ডলফিন। সুতরাং একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে অশনিসংকেত বহিয়া আনে। গবেষকদের মতে, নদীতে মাত্রাতিরিক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌযান, মাছ ধরিবার জাল ও ড্রেজার থাকিলে বিপন্ন হয় ডলফিনের প্রাণ। কারণ, নদীর নিম্নাংশে বালুতট, বিভিন্ন উপনদী, খাল এবং অন্য নদীর সঙ্গে সংগমস্থলেই বেশি বিচরণ করে ডলফিন। হালদায় গত সাড়ে চার বত্সরে যেই সকল ডলফিন মারা গিয়াছে, ইহাদের ৯০ শতাংশেরই শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। জালে আটকা পড়া ডলফিন আধঘণ্টার মধ্যে মুক্ত করা না হইলে উহার মৃত্যু হয়। বিভিন্ন রিপোর্ট হইতে এই সত্য প্রতিভাত হইতেছে যে, হালদায় ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল ও খননযন্ত্র দ্বারা বালু তোলায় নিষেধাজ্ঞা থাকিলেও সেই নিষেধাজ্ঞা মানিতেছে না বালুখেকোরা। প্রজনন মৌসুমের (ফেব্রুয়ারি-জুলাই) ছয় মাস ছাড়া অন্য সময় চলাচল করিতেছে বালু ও পাথর বহনকারী বার্জ। ইহা ছাড়াও প্রায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জালসহ নৌ-পুলিশের হাতে ধরা পড়িতেছে মত্স্য শিকারিরা। অন্ধ থাকিলে তো প্রলয় বন্ধ হইবে না। ডলফিন যেহেতু আঘাত পাইয়া মারা যাইতেছে—সুতরাং হালদাকে বাঁচাইতে এই আঘাতের উত্স বন্ধ করিতে হইবে এবং তাহা যে কোনো মূল্যে।
