শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নিরপরাধ ব্যক্তির কারাভোগ: ‘কারাবন্দির তথ্যভাণ্ডার’ স্থাপনসহ ৬ সুপারিশ

নয় নিরপরাধ ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ মানবাধিকার কমিশনের

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২২, ১৫:১২

প্রকৃত অপরাধীর পরিবর্তে নিরপরাধ ব্যক্তির কারাভোগ রোধে আসামি গ্রেফতারের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মসনদ যাচাই, কারাবন্দির তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলাসহ ছয় দফা সুপারিশ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মানবাধিকার কমিশন পৃথকভাবে এই সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে কারাভোগকারী নয় নিরপরাধ ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে নয় লাখ টাকা দেওয়ার আদেশ দিয়েছে কমিশন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার (২২ জুলাই) কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিচারিক সভায় এই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এতে আরও বলা হয়েছে, কোন অপরাধী বা ব্যক্তির নামের আগে কোন ধরনের অমর্যাদাকর পদবি (যেমন কান কাটা, তোতলা, চাক্কু ইত্যাদি) যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার না করে। যেসব পুলিশ কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে নির্দোষ ব্যক্তির জেল খাটার ঘটনা ঘটেছে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমাদানের সুপারিশ করেছে কমিশন।

প্রকৃত অপরাধীর নামের সঙ্গে মিল থাকায় নয় নির্দোষ ব্যক্তির কারাভোগ সংক্রান্ত অভিযোগ বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করেন সিসিবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম। একইসঙ্গে এ বিষয়ে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনও যুক্ত করে দেওয়া হয়। সেখানে ৮/৯ জন নির্দোষ ব্যক্তির কারাভোগের বিষয়টি স্থান পায়। এরপর কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে ক্ষতিপূরণসহ দায়িত্বে অবহেলা করেছে এমন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন চায়। এরপর মন্ত্রণালয় কারাভোগের ঘটনাগুলো তদন্তে কমিটি গঠন করে। কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ওই প্রতিবেদন কমিশনে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোন সাধারণ ব্যক্তি/মানুষ পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হলে সাধারণত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা পুলিশ অথবা কারা কর্তৃপক্ষের নিকট যৌক্তিক তথা সঠিক তথ্যও অনেক সময় তুলে ধরতে ভয় পায়। এ কারণে কারা কর্তৃপক্ষের নিকটও নবাগত বন্দিরা অনেক সময় কোন প্রকার অভিযোগ উত্থাপন করেন না। সর্বোপরি এ ধরনের ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা আদৌ আসামি কিনা সে বিষয়েও অনেক ক্ষেত্রে তারা জানতে পারেন না। সাধারণত আসামি পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আসার পর আত্মীয়-স্বজন অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে তারা মামলা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে থাকেন। কোন কোন সময় ওয়ারেন্ট তামিলকারী কর্তৃপক্ষের সতর্কতার অভাবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও অমানবিক ঘটনা ঘটে থাকে।

ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তা পর্যালোচনা করে নির্দোষ ব্যক্তির কারাভোগ রোধে সুপারিশ করে কমিশন। এতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা অপরাধীকে গ্রেফতার করার পূর্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্যই যেন জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম পরিচয় মিলিয়ে নেয়। এছাড়া জেল খাটা নির্দোষ ব্যক্তিদের মধ্যে নামের ভুলে মিজানুর রহমান ওরফে তোতলা মিজানের গ্রেফতার ও পরবর্তীকালে মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। এছাড়া বাকি আট জনের (কারো কারাবাস ৩ মাস, কারো দুই সপ্তাহ) প্রত্যেককে ৫০ হাজার করে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। কমিশনের ওই সুপারিশসূমহ ইত্তেফাককে জানান ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম ও অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। ব্যারিস্টার হালিম বলেন, কমিশনের এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে নিরপরাধ ব্যক্তির কারাভোগ রোধ করা যাবে। কারণ গ্রেফতারের পূর্বেই যদি প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত করা সম্ভব হয় তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশসূমহ:

অভিযুক্তকে গ্রেফতারের পূর্বে পুলিশ কর্তৃক অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে গ্রেফতার করা। অন্তর্বর্তীকালীন হাজতের/সাজার পরোয়ানা তামিলের ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট তামিলকারী কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আসামি গ্রেফতারের সময় প্রয়োজনে তার জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্মসনদ যাচাই করে নেওয়া যেতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন হাজতের/সাজার পরোয়ানায় নাম, পিতার নাম, ঠিকানার সাথে বয়স, মায়ের নাম, পেশা ইত্যাদি সংযুক্ত করা যেতে পারে। কারাবন্দির তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে। যেখানে বন্দির অন্যান্য তথ্যের সাথে হাতের ছাপ, চোখের মনির ছাপসহ অন্যান্য বায়োমেট্টেক সনাক্তকারী চিহ্ন সংরক্ষণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বন্দিকে কারাগারে প্রেরণের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন হাজতের/সাজার পরোয়ানা সঙ্গে নাম-ঠিকানাসহ সকল তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিলিয়ে নিতে হবে।

ইত্তেফাক/এমআর