বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লোডশেডিংয়ের শিডিউল বিপর্যয়, সমাধান কোন পথে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২২, ১৫:৫৭
এলাকাভিত্তিক ১ ঘণ্টার লোডশেডিং চালু হয়েছে ১৯ জুলাই। আজ পঞ্চম দিন। সরকারের বেঁধে দেওয়া রুটিনে (সময়সূচি) রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনিয়মিতভাবে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় রুটিনের বাইরেও লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা। ৪ দিনে ঢাকার অনেক জায়গায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা, আর ঢাকার বাইরে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
 
রাজধানীসহ আশপাশের বিভিন্ন জায়গার বাসিন্দাদের অভিযোগ, শিডিউলে লেখা আছে সকাল ১১টায় এক এলাকায় লোডশেডিং হবে, দেখা গেছে সেখানে লোডশেডিং হয়েছে দুপুর ২টায়। আবার বিকেল ৫টায় যেখানে লোডশেডিং হওয়ার কথা, সেখানে হয়েছে রাত ৯টায়। আবার দিনে রাতে ২-৩ বারও অনেক এলাকায় লোডশেডিং হয়েছে। এমন বিপর্যয়ের কারণে অনেক উৎপাদনশীল শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। 
 
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, এলাকাভিত্তিক দৈনিক একসঙ্গে ১ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হওয়ার কথা, সেখানে একবার না হয়ে ২-৩ বারও ১৫-২০ মিনিট করে হচ্ছে। আবার একবার গেলে দেড় ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ আসার নাম নেই। কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় মোট আধাঘণ্টারও লোডশেডিং হয় না।
এদিকে লোডশেডিংয়ের শিডিউল বিপর্যয়কে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) বিদ্যুতের উৎপাদন স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন। আবার বলেছেন, কোনো বিশেষ জোন বা এলাকাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মূলত এমন হচ্ছে। ডিপিডিসি বলেছে, প্রতিদিন আলাদা আলাদা শিডিউল হয়, জনসাধারণ বিষয়টা জানে না। তাই লোডশেডিংয়ের শিডিউল পরিবর্তনকে শিডিউল বিপর্যয় বলছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প কৌশল অবলম্বনের। সবাইকে যেমন সাশ্রয়ী হতে হবে, তেমনি দেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন বজায় রখতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।
 
রাজধানীর ঝিগাতলার বাসিন্দা রিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আজ রাত ৮টায় শিডিউল অনুয়ায়ী লোডশেডিং হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় লোডশেডিং হয়েছে। এমন প্রায় দিনই শিডিউল ছাড়া লোডশেডিং হয়।’
মোম জ্বালিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা
 
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ফার্মেসি দোকানের ম্যানেজার মো. সালাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় লোডশেডিং হওয়ার কথা বিকাল ৫টা থেকে ৬টা, কিন্তু হয়েছে সকাল ১১টা থেকে প্রায় ১২টা। এর বাইরেও আরও ২ বার হয়েছে।’
 
কাওরান বাজারের একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক মো. রফিক বলেন, ‘আমাদের এলাকায় লোডশেডিং হয়ে ১০-২০ মিনিটের বেশি থাকে না, তবে দিনে যখন-তখন ৩-৪বার লোডশেডিং হয়। আগের মতোই।’ 
 
মেরুল বাড্ডার বাসিন্দা রফিক বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকাল ৫-৬টায় লোডশেডিং হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে রাত ৮টা থেকে ৯টা। লোডশেডিং দিন-রাতে কম হয়, তবে সময়মতো হয় না।
 
বনানীতে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন আরাফাত। তিনি বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দৈনিক ৩-৪ বার এখানে লোডশেডিং হয়। কোনো সময় মানে না।’
 
দেশীয় ইলেক্ট্রনিক পণ্য প্রতিষ্ঠান ভিসতার উদ্যোক্তা পরিচালক উদয় হাকিম বলেন, ‘বর্তমানে যে বিদ্যুৎ সংকট, সেটি বৈশ্বিক সমস্যার প্রভাব বাংলাদেশে। আশা করি, এই সমস্যা বেশি দিন স্থায়ী হবে না। বর্তমান সরকার জনবান্ধব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই সমস্যা সমাধানে কাজ করবে। বিশেষ করে সবাইকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। কর্তৃপক্ষ যেভাবে সরকারি-বেসরকারি শিল্পকারখানা, অফিসকে যে নির্দেশনা দিয়েছে, সেভাবে সাশ্রয়ী ব্যবহার করতে হবে।’
 
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও বৈদ্যুতিন প্রকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. রুমা বলেন, ‘কোন এলাকায় কখন-কিভাবে বিদ্যুৎ সাপ্লাই দেওয়া হচ্ছে, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের যেহেতু লিমিটেড বিদ্যুৎ উৎপাদন, লোডশেডিং শিডিউল করে দেওয়া হচ্ছে, সেক্ষেত্রে নিয়মটা মানতে হবে। সমানভাবে সব জায়গায় দিতে হবে। এক জায়গায় বিপর্যয় হলে, সব জায়গায় সেই প্রভাবটা পড়ে।’
 
বিভাগের এই প্রধান অধ্যাপক আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে যেমন সাশ্রয়ী হতে হবে, তেমনি বিকল্প পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। যেমন-সোলারের ব্যবহার বাড়াতে হবে, কারণ সোলারে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের উৎপাদন নেই। সবসময় এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ পেতে পারি। পানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। গাড়ির চাকায় ঘর্ষণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। বিশেষ করে এখন সংকটকালীন সময়ে বিদ্যুতের সাশ্রয় ও বিকল্প ব্যবহার বাড়াতে হবে।’ 
 
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘উৎপাদনের ওপর ব্যয় নির্ভর করে। দেশের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। তবে, এখন বিদ্যুতের যে সংকট দেখা দিয়েছে, সেটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ ব্যবহার ও উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।’
বাজারে মোম জ্বালিয়ে বেচাবিক্রি
 
চুয়েট অধ্যাপক আরও বলেন, ‘প্রাধান্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ সাপ্লাই দিতে হবে। রেসিডেন্স ও অফিস-আদালতকে সোলার বিদ্যুতে আওতায় আনা যায় কিনা ভাবতে হবে। শিল্পকারখানায় নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে। এত মূল গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে।’
 
বিদ্যুতে বিকল্প উৎপাদন খাত উদ্ভাবনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, ‘অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন উদ্ভাবন হয়, কিন্তু সেগুলো বিপণন হয় না। এক্ষেত্রে সরকার ও ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। গবেষণায় জোর দিতে হবে। অনেকের নিজস্ব বড় সোলার প্ল্যান্ট রয়েছে, সরকার চাইলে এসব ব্যক্তিদের সোলার থেকে বিদ্যুৎ কিনে নিয়ে জাতীয় গ্রিডে যোগ করতে পারেন।’
 
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ও বুয়েট শিক্ষক অধ্যাপক এম তামিম বলেন, ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে চাচ্ছে, সে পরিমাণ পারছে না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে, বিশেষ করে লোকজনকে সাশ্রয়ী হতে হবে, রাতে লোড হচ্ছে বেশি, কমিয়ে আনতে হবে, পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির লোডশেডিং শিডিউলে যেসমস্ত লোকবল রয়েছে, তাদের নতুন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে, কারণ এর আগে তারা এমন পরিস্থিতিতে পরেনি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা রয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
 
সাবেক এই জ্বালানি উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘সরকার যেহেতু ডিজিটাল দেশের কথা বলছে, দেশ যেহেতু ডিজিটাল হচ্ছে, সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদা অনুয়ায়ী হতে হবে। এর বিকল্প নেই। বিদ্যুতের যে উৎপাদন ও ব্যবহার, তাতে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা বলা হলেও ২-৩ ঘণ্টারও বেশি হতে পারে।’
 
ডেসকোর অ্যাসিস্ট্যান্ট কম্প্লেইন অফিসার নাঈমুল ইসলাম বলেন, ‘চাহিদার ওপর ভিত্তি করে লোডশেডিংয়ের শিডিউল বিপর্যয় হয়ে থাকে। যেদিন চাহিদা বেশি থাকে, সেদিন একটু বিপর্যয় হয়, আবার চাহিদা কম হলে ঠিক থাকে। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর পুরোটাই নির্ভর করে। উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ দেওয়া হয়।’
 
ডেসকো কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলে কোনো কোনো এলাকায় ২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ নাও থাকতে পারে। আবার কোনো এলাকায় ইমার্জেন্সির জন্য সার্বোক্ষণিক বিদ্যুৎ দিতে হয়। এতে অন্য এলাকায় শিডিউল অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া যায় না। শিডিউল বিপর্যয় হয় এতে।’
 
ডিপিডিসির একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে এবং টেকনিক্যাল সমস্যার কারণেও লোডশেডিংয়ের শিডিউল বিপর্যয় হতে পারে। আর ডিপিডিসি যে শিডিউল দিয়েছে, সেটি চূড়ান্ত নয়, বলা হয়েছে সম্ভাব্য সময়। আরেকটি কথা বলা হয়েছে, ডিপিডিসি সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের শিডিউল দিয়েছে। এরপর লোডশেডিং হলে সেটি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে না।’
 
এদিকে, ডিপিডিসি অ্যাক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, অপারেশন্স আবদুর রউফ খান বলেন, ‘ডিপিডিসির আওয়াতায় ঢাকা উত্তর সিটির আংশিক, দক্ষিণ সিটি ও নারায়ণগঞ্জের পুরোটা পড়েছে। আমাদের এই আওতায় লোডশেডিংয়ের শিডিউল বিপর্যয় হয়নি। আমরা প্রতিদিন রাতে পরের দিনের লোডশেডিংয়ের শিডিউল দিয়ে থাকি। সেটি হয়তো শহরের বাসিন্দারা আপডেটটা দেখেন না। আমাদের আওতায় যে সমস্ত এলাকা রয়েছে, সেখানে শিডিউলের বাইরে বিদ্যুৎ যায় না।’
চলছে লোডশেডিং
 
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশেষ দিন, বিশেষ সময় বা বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার ওপর ভিত্তি করে অনেক সময় কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ কম-বেশি দেওয়া হয়। যেমন শুক্রবার জুমুয়ার নামাজকে কেন্দ্র করে নামাজের পুরো সময়টাই সবজায়গায় বিদ্যুৎ দিতে চেষ্টা করেছি। এক্ষত্রে একটু এদিক-সেদিক হয়।’
 
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘আমরা সব সময় বলে আসছি বর্তমান সংকট সাময়িক সময়ের জন্য। এই সমস্যা খুব বেশিদিন থাকবেনা। তবুও বর্তমান বিদ্যুৎ সমস্যার জন্য সম্মানিত গ্রাহকদের কাছে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি এবং সবার সহযোগিতাও কামনা করি। সংকট সমাধানে আমরা সারাদেশে শিডিউল ভিত্তিক লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছি। তবে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করে লোডশেডিংয়ের বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’
 
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট ও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়ে যাবে এবং একই সাথে ভারতের আদানী পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হলে ৪ হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমাদের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সবার প্রতি অনুরোধ ধৈর্য্য ধরুন। এই কঠিন সময়ে আপনাদের সকলের সহযোগিতা আমাদের একান্ত কাম্য।’
ইত্তেফাক অনলাইন/এনই