শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ পর্যাপ্ত নয়: সিপিডি

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৩

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে| আর এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয় বলে উল্লেখ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)| অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণ, রাজস্ব আহরণ ও ঋণখেলাপির দিকে আরো নজর দিতে বলেছে সংস্থাটি|

গতকাল রবিবার ধানমন্ডিতে সিপিডির অফিসে ‘সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ : কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়| সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম| ব্যাংকিং খাত নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বহিঃখাত নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান| এ ছাড়া ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান|

স্বাগত বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সংকট স্বল্পমেয়াদি নয়, মধ্যমেয়াদি| এভাবে চললে দেশ দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে যাবে| বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো না হলেও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে| এর জন্য দীর্ঘমেয়দি পদক্ষেপ নিতে হবে|

এক প্রশ্নের জবাবে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রীলঙ্কার মতো খাদে পড়ে যাওয়ার অবস্থা বাংলাদেশের হয়নি, কিন্তু আমাদের ঝুঁকি রয়েছে| নতুন গভর্নরের নেওয়া উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গণহারে খেলাপিদের সুযোগ দেওয়া সঠিক হয়নি| আমি মনে করি, অন্য যে কোনো সংস্থা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তুলনামূলক নিজস্ব ক্ষমতা বেশি রয়েছে| আমি বলব, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শুনুন| তারা ১০টা কথা বললে ২টা তো শুনবেন| ওনারা যদি মনে করেন সব জানেন, এটা ঠিক নয়| বাংলাদেশের মানুষের কথা শুনুন|’

এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশে আয়বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি| বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দেন তিনি| বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাহসিকতার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে| জনগণকে হয়তো ত্যাগ স্বীকার করতে হবে|

আলোচনায় অংশ নিয়ে ম. তামিম বলেন, বিদ্যুতের প্রাথমিক জ্বালানি জোগান না বাড়িয়ে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে|| দ্রুতগতিতে বিদ্যুৎ আনার জন্য একসময় তেলভিত্তিক কেন্দ স্থাপনের প্রয়োজন ছিল| তবে সেটাকে তিন বা পাঁচ বছর পর্যন্ত রাখার পরামর্শ ছিল| কিন্তু সেটা না করে এখন পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে| ফলে তেলের ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়েছে| আর তেলের ওপর এই নির্ভরতার কারণেই বর্তমান সমস্যা তৈরি হয়েছে| দেশে যখন কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র শুরু হয়, তখন কয়লা ও তেল আমদানি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল| একই সময়ে উচিত ছিল নিজেদের গ্যাসের জন্য অনুসন্ধান চালানো| সেটি হয়নি| পরবর্তীকালে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা-ও অনেক দেরি করে নেওয়া হয়েছে| ২০০০ সালের পর থেকে গ্যাস অনুসন্ধানের রাজনৈতিক সাহস কোনো সরকারই নিতে পারেনি| বর্তমানে দেশে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে উল্লেখ করে ম তামিম বলেন, দেশে যে কোনো সময়ে উৎপাদন কমে যেতে পারে| আন্তর্জাতিকভাবে গ্যাস ও তেল আমদানি নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে| ইউরোপ এখন রাশিয়ার ওপর থেকে গ্যাসনির্ভরতা কমাচ্ছে| এ জন্য সারা বিশ্বে যত জায়গায় যত গ্যাস আছে, তা নিতে ইউরোপ হাত বাড়াবে| সে জন্য আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে| পাশাপাশি কয়লার ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রাখাটা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে|

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কোভিড-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হলেও নতুন করে ৩ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমায় যুক্ত হয়েছে| গ্রাম ও শহরের মানুষের আয় কমেছে| অর্থনীতিতে একধরনের অবিচারের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে| নতুন নতুন দারিদ্র্য এই অবিচারের একটি| কিছু উন্নয়ন সূচক যেমন—পুষ্টি ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে| এতে এসডিজির লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হবে| এছাড়া যুব বেকারত্ব বাড়ছে| আর এই তিনটি মিলে অর্থনীতিতে অবিচারের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে| তিনি বলেন, আমাদের উন্নয়ন-দর্শন এখন একমাত্রিক দর্শনে আটকে গেছে| অর্থনীতি এখন স্বার্থের দ্বন্দ্বনির্ভর| প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে|

এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যে খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছেন, সেটি বলব না| তবে তাদের লাভের অংশ কমে যাচ্ছে| দেশে লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন| আমরা অস্বস্তিতে আছি| এর মূল কারণ গ্যাসের সংকট| এই সংকটের সমাধান না হলে রপ্তানিমুখী শিল্প সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে| এতে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং রপ্তানি কমে যাবে| এর ফলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হবে|’

ইত্তেফাক/ইআ