শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এক ঘণ্টা ও ‘এক ঘণ্টা করে’র শুভঙ্করের ফাঁকি

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২২, ২২:০০

সরকার সারাদেশে প্রতি এলাকায় দিনে এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং-এর কথা বললেও বাস্তবে কোথাও কোথাও দিনে ৯ ঘণ্টাও হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের নতুন যে শিডিউল দেয়া হয়েছে তাতে কোথাও দিনে তিন ঘণ্টার কম লোডশেডিং নেই।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ডয়চে ভেলের কাছে দিনে এক ঘণ্টা লোডশেডিং-এর নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তারা বলছে, পুরো দিনে এক ঘণ্টা লোডশেডিং নয়। যখন লোডশেডিং করা হবে, তখন টানা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা করা হবে। এটা দিনে একাধিকবারও হতে পারে।

১৯ জুলাই থেকে বিদ্যুতের এই রেশনিং শুরু হয়। তখন বলা হয়েছিল প্রথম সাত দিন ২৪ ঘণ্টায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করা হবে। পরে  পরিস্থিতি বুঝে দুই ঘণ্টা করা হতে পারে। ২৫ জুলাই এক সপ্তাহ শেষে দুই ঘণ্টা বা তার বেশি লোডশেডিংয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো ২৬ জুলাইয়ের যে লোড শেডিং শিডিউল প্রকাশ করেছে, তাতে সর্বনিম্ন তিন ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ৯ ঘণ্টার লোডশেডিং করা হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। সিলেটের কোথাও চার ঘণ্টার কম লোডশেডিং নেই। সর্বোচ্চ ৯ ঘণ্টা সেখানেই।

ঢাকায় ডেসকো যে শিডিউল দিয়েছে, তাতে সর্বনিম্ন লোডশেডিং তিন ঘণ্টা আর সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা। তবে ঢাকার আরেকটি বিতরণ কর্তৃপক্ষ ডিপিডিসি অবশ্য এক ঘণ্টা করেই লোডশেডিংয়ের শিডিউল দিয়েছে। তবে তাদের ওয়েবসাইটে লিখে রেখেছে " এই মুহূর্তে কোনো লোডশেডিং নেই।

"ওয়েস্ট জোন পাওয়ার কোম্পানি” লোডশেডিংয়ের নতুন শিডিউল প্রকাশ করছে না। তবে পুরোনো শিডিউলে যশোর ও খুলনা এলাকায় দুই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা বলা হয়েছে। রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে নেসকো এক ঘণ্টা করেই লোড শেডিংয়ের কথা বলছে।

পিডিবি সরাসরি যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেটের কিছু অঞ্চলে। ওইসব এলাকায় সর্বনিম্ন দুই ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের তালিকা দেয়া হয়েছে।  সিলেট ওসমানি বিমান বন্দরেই ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। তবে এর আগে তারা ২৫ থেকে ২৭ জুলাইয়ের যে শিডিউল প্রকাশ করে, তাতে সিলেটের মিয়াপাড়া, মেন্দিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ ৯ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা বলা হয়। সর্বনিম্ন ৮ ঘণ্টা।

বাংলাদেশে বিদ্যুতের সবচেয়ে বেশি গ্রাহক বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের। তারা উপজেলা পর্যায়ে এবং গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তারা সর্বনিম্ন তিন ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের তালিকা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা মানা হচ্ছে না।

সিলেটের বাসিন্দা মনোয়ার জাহান জানান, বিদ্যুতের যে শিডিউল দেওয়া হচ্ছে, তা-ও মানা হচ্ছে না। এখন এক ঘণ্টা পর এক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ থাকে না। বলতে গেলে দিনে ৯-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। আর গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল। এখন আরো খারাপ। কোথাও কোথাও ১২-১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।

সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল কাদির বলেন, আজকে (মঙ্গলবার) সিলেট বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা ৫৫০ মেগাওয়াট। পাওয়া গেছে চাহিদার অর্ধেকের একটু বেশি ২৭০ মেগাওয়াট। আজকে আবহাওয়া একটু ভালো থাকায় আমরা শিডিউল অনেকটা মানতে পারছি। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে শিডিউল কখনো কখনো মানা যায় না।

তিনি বলেন, আমাদের সর্বোচ্চ ৯ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হয়।তার বেশি লোডশেডিং হয় না।

রংপুরের বাসিন্দা লিয়াকত আলী বাদল বলেন, এখানে শিডিউল মানা হচ্ছে না। এক ঘণ্টা পরপরই বিদ্যুৎ যায়। রাত ১১ টা থেকে সকাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে। দিনের বেলা আসলে বিদ্যুতের ঠিক থাকে না। গ্রামের অবস্থা আরো খারাপ।

রংপুর বিভাগের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বলেন, দিনে বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা আছে ৭০০ মেগাওয়াট। পাচ্ছি ৫৫০ মেগাওয়াট। ফলে শিডিউল মানা কঠিন।

তিনি বলেন, দিনে এত ঘণ্টা করে লোডশেডিং করলে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকে।  কিন্তু আমার তো ঘাটতি ১৫০ মেগাওয়াট। তাই বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে।

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে পুরো দিনে এক ঘণ্টা নয়, এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করতে হবে। তাই দিনে যতবারই করি এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসেবে মঙ্গলবার সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু সম্ভাব্য উৎপাদন হচ্ছে এগারো হাজার ৮১০ মেগাওয়াট। ঘাটতি আছে দুই হাজার ৪০ মেগায়াটের। বিদ্যুৎ রেশনিংয়ের শুরুতে বলা হয়েছিল প্রতিদিন ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। তিনি এখন তার চেয়েও আরো এক হাজার ১৯০ মেগাওয়াট কম পাওয়া যাচ্ছে। বোর্ডের পরিচালক শামিম হাসান জানান, আমরা কাঁচামালের অভাবে বিদ্যুৎ চাহিদামতো উৎপাদন করতে পারছি না, যা পারছি সেভাবে লোডশেডিং করে বিতরণ করছি।

তার কথায়, উৎপাদন আর কমার সম্ভাবনা কম। বাড়তে পারে। আমরা আগামীকাল (বুধবার) পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো। দিনে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের প্রশ্নে তিনি বলেন, পুরো ২৪ ঘণ্টায় এক ঘণ্টা নয়, কোনো এলাকায় যখন লোডশেডিং করা হবে, তখন একঘণ্টা করা হয়। তাই কোনো এলাকায় টানা নয়, পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টা লোডশেডিংও হতে পারে।

ডয়চে ভেলে বাংলার হয়ে প্রতিবেদনটি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি