শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং

মৃত্যুর দায় নেই, শাস্তিও হয় না

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২২, ০২:৩০

রেলের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দেশে কমছে না রেলসংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেলের লেভেলক্রসিংগুলোতে মৃত্যু। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত পাঁচ বছরে লেভেল-ক্রসিংয়ে কাটা পড়ে মারা গেছে দুই শতাধিক মানুষ। যদিও বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি।

লেভেলক্রসিংয়ে এমন মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা অননুমোদিত লেভেলক্রসিংগুলোকে প্রধানত দায়ী করে থাকেন। তবে অনুমোদিত ও প্রহরী নিযুক্ত লেভেলক্রসিংয়েও দুর্ঘটনার সংখ্যা কম নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অননুমোদিত লেভেলক্রসিংয়ের কারণে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, কিন্তু এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি সচেতন নয়। এসব রেলক্রসিং বন্ধ করতে হবে। আর বৈধ ক্রসিংগুলোতে সার্বক্ষণিক তদারক করতে হবে। তবে রেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি সচেতন নয়, এমন অভিযোগ মানতে নারাজ বাংলাদেশ রেলের ট্রাফিক বিভাগ। ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে এসব দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশে রেলের মোট লেভেলক্রসিং ২ হাজার ৬১২টি। এর মধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত লেভেলক্রসিং ১ হাজার ৪১২টি। বাকি ১ হাজার ২০০টি অনুমোদনবিহীন। সরকারের কমবেশি পাঁচটি সংস্থা রেললাইনের ওপর সড়ক নির্মাণ করার কারণে রেলক্রসিং সৃষ্টি হয়েছে। রেলের নিজেদেরও ক্রসিং আছে। রেলসহ এই সরকারি সংস্হাগুলো গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে। কিন্তু রেলক্রসিং সুরক্ষায় কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। দায় চাপাচ্ছে একে অপরের ওপর।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই অনেক লেভেলক্রসিং তৈরি হয় বলে অভিযোগ আছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্হা ও স্থানীয় মানুষরা নিজেদের প্রয়োজনে ইচ্ছেমতো রেললাইনের ওপর দিয়ে যাওয়া রাস্তায় গড়ে তুলেছে লেভেলক্রসিং। এসব ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান কিংবা সতর্কবার্তা থাকে না। ফলে ট্রেন আসার সময়ই অবাধে রেলক্রসিং পারাপার করে পথচারী ও যানবাহন।

রেলের একটি তথ্য থেকে জানা যায়, সারা দেশে অননুমোদিত লেভেলক্রসিং সবচেয়ে বেশি বানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তাদের লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ৫১৬টি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অনুমোদনবিহীন লেভেলক্রসিং ১১টি। ইউনিয়ন পরিষদের অবৈধ লেভেলক্রসিং সংখ্যা ৩৬৩টি। পৌরসভা অবৈধ লেভেলক্রসিং বানিয়েছে ৮০টি। সিটি করপোরেশনের অবৈধ লেভেলক্রসিং সংখ্যা ৩৪টি। জেলা পরিষদ অবৈধ লেভেলক্রসিং বানিয়েছে ১৩টি। চট্টগ্রাম বন্দর অবৈধ লেভেলক্রসিং বানিয়েছে তিনটি। বেনাপোল বন্দরেরও একটি অবৈধ ক্রসিং রয়েছে।

বিগত এক যুগে রেলওয়েতে এক লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও লেভেলক্রসিংগুলোকে নিরাপদ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যে কারণে একটি দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আর একটি দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ছোট একটি সতর্কীকরণ নোটিশ টাঙিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় সারে। যখনই দুর্ঘটনা ঘটে তখন দায়ী ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী কোনো ব্যবস্হা নেওয়া হয় না।

রেল দুর্ঘটনার বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, রেলক্রসিংয়ে দিনে দিনে যে মানুষ মারা যাচ্ছে, সেদিকে কারো খুব একটা নজর নেই বলেই মনে হয়। অননুমোদিত রেলক্রসিং কমিয়ে আনার ওপর জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, পথের গুরুত্ব অনুযায়ী যেসব রেলক্রসিং বৈধতা দেওয়া দরকার, প্রয়োজনে তা দিয়ে সেখানে প্রহরী নিয়োগ দিতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি