প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মমুখী হতে চায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ 

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২২, ১৪:০৫

সমাজের পিছিয়ে পড়া অবহেলিত জনগোষ্ঠিকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে রংপুরের তৃতীয় লিঙ্গের টেকসই জীবনমান উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে পিছিয়ে পড়া এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোত ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের চেতনা নিয়ে সমাজের বিত্তবান শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং সমাজ সেবকদের টেকসই কর্মসূচি নিয়ে স্থায়ী কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর এ লক্ষ্যে রংপুরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে তা কিছুটা পরিপালন করছে। তবে এ ব্যাপারে সমন্বিত উদ্যোগ এবং সুর্নিদিষ্ট স্থায়ী কর্মমূখী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় সে উদ্যোগ কার্যত কোনো ইতিবাচক সুফল বয়ে আনতে পারছে না। ফলে কর্মহীন অবহেলিত এই বিরাট হিজড়া জনগোষ্ঠির মধ্যে এদের একটি শ্রেণী সমাজে প্রতিনিয়ত উশৃংখল ও অশালীন আচরণ অব্যাহত রেখে সামাজিক জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। 

এরা একদিকে পরিবার ও সমাজে অবজ্ঞা, উপেক্ষা, উপহাস এবং কৌতুকের পাত্র হয়ে যৌন প্রতিবন্ধী এই জনগোষ্ঠীর মানুষ সমাজ সভ্যতার নাগপাশ থেকে ছিটকে পড়ে অবহেলিত জীবনযাপন করছে। এদিকে তারা সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের কাছে যেন উপহাস আর বিনোদোনের পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে পিছিয়ে পড়া তৃতীয় লিঙ্গের এই হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর ইতোমধ্যে রংপুর জেলার ৮ উপজেলায় জরীপ চালিয়ে ৩৭০ জন হিজড়াকে তালিকাভুক্ত করেছে। এসব তালিকা ভুক্তদের মধ্য থেকে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকাসহ ৭ উপজেলার মোট ১৫০ জন হিজড়াকে বাছই করে তাদের আত্মর্ম সংস্থানের উদ্যেশ্যে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। তবে এরপর থেকে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অজ্ঞাত কারণে বন্ধ রয়েছে। এই কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে তাদের সেলাই, কম্পিউটার, বিউটিফিকেশন এবং রান্নাসহ হাতের কাজের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। 

তিন মাস মেয়াদী এই প্রশিক্ষণ শেষে এদের প্রত্যেকে আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ১০ হাজার টাকা করে এককালীন আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ১৫/২০ জন তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া স্বাবলম্বী হয়েছে বলে তাদের সূত্রে জানা গেছে। তবে এদের অধিকাংশই এখন রয়েছে কর্মহীন। ফলে ভিক্ষাবৃত্তি এবং চাঁদাবাজিই এই জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার স্বম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অবহেলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এই হিজড়া সম্প্রদায় আবহমান কাল ধরে পারিবরিক, আর্থসামাজিক, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্নভাবে চরম বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়ে আসছেন। পাশাপাশি এদের একটি অংশ সমাজের প্রত্যাহিক জীবন ধারায় অসামাজিক ও অশ্লীল আচরণের মাধ্যমে মানুষকে অস্বস্থিকর পরিবেশে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। এরা দল বেঁধে বিভিন্ন সড়কের গুরুত্বর্পূন এলাকায়, বাসা বাড়ী, যানবাহন, যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেন এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে চাঁদাবাজী এবং ভিক্ষাবৃত্তি করে জন জীবনকে চরম বিব্রত করে তুলছে। 

শুধু তাই নয় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী বিশেষ করে ছাত্রী এবং নারী যাত্রী ও পথচারীসহ নিরীহ পথচারীদের সঙ্গে এরা নানা ধরনের অশ্লীল আচরণ এবং অঙ্গভঙ্গী করে তাদের চরম অস্বস্থিকর অবস্থার মধ্যে ফেলে জোরর্পূবক চাঁদা আদায় করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ঈদ এবং সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এই প্রবনতা আরও বেড়ে যায়।এসব অস্বস্থিকর অসামাজিক পরিবেশ প্রতিরোধে সমাজসেবা অধিদপ্তর, জেলা এবং পুলিশ প্রশাসনসহ সবাই যেন র্নিবিকার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুর মহানগরীর প্রবেশ দ্বার মর্ডান মোড়, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়, মাহিগঞ্জ সাত মাথা মোড়, নববাগঞ্জ বাজার ও সিটি বাজার এলাকা এবং কাচারী বাজার এলাকাসহ মহানগরী এবং জেলা-উপজেলার বিভিন্ন জনঅধ্যুষিত স্থানে এই হিজড়া সম্প্রদায়ের একটি অংশ দল বেঁধে এ ধরনের চাঁদাবাজি এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে আসছে। এসব দেখা কিংবা প্রতিরোধ করার যেন কেউ নেই। 

সম্প্রতি নগরীর কামাড়পাড়া এলাকায় এক বাসায় প্রবেশ করে এই হিজড়ার দল শিরিন বেগম নামে এক গৃহবধূকে তার শিশু সন্তানসহ জিম্মী করে ১০ হাজার টাকা দাবি করে। শেষে কিছু টাকা দিয়ে পরিবারটি ওই যাত্রায় রক্ষা পায়। এ চিত্র প্রায় সর্বত্র বিরাজ করছে।            

এ ব্যাপারে রংপুর জেলা সমাজসেবা অধিপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মতিন জানান, রংপুর নগরীর বিভিন্ন স্থানে উত্যক্ত করা হিজরা জনগোষ্ঠী ভিন্ন এলাকা থেকে আগত এবং বহিরাগত। এরা রংপুর জেলার বাসিন্দা নয়। হিজরা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এদের কাউন্সিলিং করে এসব বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে রংপুর জেলা হিজরা নেতা আনোয়ারুল ইসলাম রানা জানালেন ভিন্ন কথা। তার ভাষায়, এরা রংপুরেরই সন্তান। তবে পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য এসব করে থাকে। আমরা এসব আচরণ না করার জন্য পরামর্শ দেই। তবে জীবন পরিচালনার কাজ পেলে এসব বন্ধ হবে বলে তার বিশ্বাস।

রংপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পিছিয়ে পড়া অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোত ধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত হিজড়াদের মধ্য থেকে বাছাই করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কারিগরী প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এরমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জনপ্রতি ৭০০ টাকা, মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ৮০০ টাকা, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী ১১০০ টাকা এবং উচ্চতর শিক্ষার্থীদের ১২০০ টাকা হারে প্রতিমাসে উপবৃত্তি দেওয়া হয়। 

এই কর্মসূচির আওতায় রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬ জন এবং মিঠাপুকুর উপজেলায় ৩ জন হিজড়া শিক্ষার্থী শিক্ষা সহায়তা ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া ৫০ বছর বা তর্দূধ বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির আওতায় জনপ্রতি মাসে ৬০০ টাকা হারে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ২ জন, পীরগঞ্জ উপজেলায় ১১ জন, মিঠাপুকুর উপজেলায় ১০ জন ও বদরগঞ্জ উপজেলায় ১ জনসহ রংপুর মহানগর এবং জেলায় মোট ৩৩ জন হিজড়াকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। 

এবিষয়ে হিজড়াদের সংগঠন ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয়লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা’, রংপুরের সভাপতি হিজরা আনোয়ারুল ইসলাম রানা বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষগুলো সর্বপ্রথম নিজ গৃহ থেকেই নিগৃহীত হন। আমরাও যে মানুষ, তা বোঝাতে যুদ্ধ করতে হয়। কেবল মা ছাড়া আর কেউ আমাদের স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না। পরিবারের অন্য সদস্যদের কথিত ’পারিবারিক ভবিষ্যৎ নিরাপদ’ পরিবেশের স্বার্থেই আমরা যেন এমন বঞ্চনার শিকার।

রংপুরের হিজড়া বাঁধন, জলিল, আরিফ, হারুন, জানু, রাশেদুল, সোণালী, শেফালী বলেন, আমরা হিজড়া হয়ে জন্মাতে চাইনি। বিধাতার খেয়ালেই আমাদের এ পরিণতি। সমাজের অন্য মানুষের মতই আমরাও সম্মান মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই। হিজড়া যেন আমাদের কাছে একটি অভিশপ্ত বাক্য। পরিবার ও সমাজের অবহেলায় আমাদের অনাহারে-অর্ধহারে জীবন কাটে। ফলে বাধ্য হয়ে জীবিকার তাগিদে ভিক্ষা করে অতিকষ্টে জীবন ধারণ করতে হয়। সরকার এবং সমাজের সচেতন মানুষ আমাদের স্থায়ী কর্মসংস্থানসহ সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করলে আমরাও সমাজের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবো। আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। ইতোমধ্যে আমাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ লেখাপড়া শিখে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। স্বেচ্ছাসেী সংগঠনের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দিয়ে সমাজের কল্যাণমূলক কাজ করে এবং বিভিন্ন পেশা ভিত্তিক কাজে মানবিক যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।  


            
রংপুরের শিল্পপতি ব্যবসায়ী ও রংপুর চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু হিজরা জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়ন বিষয়ে জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসায় হিজরা সম্প্রদায় আগের থেকে কিছুটা সুশৃঙ্খল। তবে এদের শারীরিক কাঠামো অনুপাতে উপযোগী কর্মসংস্থানের মতো পরিবেশ ও সুযোগ এখনও রংপুরে গড়ে ওঠেনি। এদের জন্য গার্মেন্টস শিল্পের মত বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। এজন্য সরকারি সহায়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের সবাইকে সরকারি ভাতার আওতায় এনে ভাতার পরিমাণ জীবন চলার উপযোগী করে বাড়ানো উচিৎ। সেইসঙ্গে সরকারের আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে এদের পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) আবু মারুফ হোসেন বলেন, এদের পূর্নবাসন এবং মোটিভেশনের বিষয় নিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সঙ্গে আমরা বসেছি। সরকারও সাধ্যমত কিছু করছে। হিজড়াদের চাঁদাবাজি বন্ধে বিভিন্ন পয়েন্টে মাঝে মাঝে একশনও নেওয়া হয়। কখনো বা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি।                       

ইত্তেফাক/মাহি