রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রশ্নফাঁসে হাজার কোটি টাকা লেনদেন!

  • মাউশি কর্মকর্তা চন্দ্র শেখরের অ্যাকাউন্টেই ৫০ কোটি টাকা লেনদেন
  •  বুয়েট শিক্ষকসহ জড়িত প্রভাবশালীরা বহাল তবিয়তে
  • এ পর্যন্ত ১১ মামলা, চার্জশিট মাত্র দুটিতে
আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২২, ১৭:০৮

রীতিমতো বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হচ্ছে একেকটি প্রশ্নফাঁসের ঘটনায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষা, মাউশিতে নিয়োগ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করে কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গত ১০ বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়ের করা ১১টি মামলা সিআইডি তদন্ত করছে। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র দুইটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। মামলাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি এসব সিন্ডিকেটে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে।

সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে নিয়োগের নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িত নেপথ্যের রাঘববোয়ালরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। এ ঘটনায় মাউশির প্রভাবশালী শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক-১) চন্দ্র শেখর হালদার মিল্টনকে গ্রেফতার করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ তার সঙ্গে প্রশ্নফাঁস চক্রের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। 

 এর আগে গত বছরের নভেম্বরে বাতিল হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনাটিও আড়াল হয়ে গেছে। ঐ সময় ডিবি পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে জানিয়েছিল যে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে ঐ চক্রটি ৬০ কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে। বুয়েটের এক শিক্ষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। আর মাউশির কর্মকর্তা চন্দ্র শেখরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গত চার বছরে ৫০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের ১৩ সদস্যকে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রেফতার করে সিআইডি। গ্রেফতারকৃত ১৩ জনের মধ্যে সাত সদস্যের প্রায় ৩৩ কোটি টাকা মূল্যের জমির খোঁজ পায় সিআইডি। গ্রেফতারকৃতরা সিআইডিকে জানায়, প্রশ্নফাঁস করে অবৈধ টাকা দিয়ে তারা জমি কিনেছেন। তারা ১৩৫টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা লেনদেন করেন।

এই চক্রটির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকারী চক্রের যোগাযোগ ছিল। ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ও ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় শাহবাগ থানায় ছয় জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। এই মামলায় সিআইডি তদন্ত করে দেখতে পায়, ১২ জনের একটি সিন্ডিকেট এই প্রশ্নফাঁস করেছে। ঐ চক্রটি প্রায় ১ কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে।

ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, চন্দ্র শেখর হালদার মিল্টন শিক্ষা ভবনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা। মাউশিতে ডেপুটেশনে থাকা শিক্ষা ক্যাডারের ৩১ ব্যাচের এই কর্মকর্তার দাপটে শিক্ষা ভবনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অনেকটা কোণঠাসা। গত ২১ জুলাই কর্তৃপক্ষ তাকে মাদারীপুর সরকারি কলেজে বদলি করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বদলি করার পেছনে যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এর পরই তাকে গ্রেফতারে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে গ্রেফতারের অনুমতি পেতেও ডিবিকে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। গ্রেফতার ও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানোর পরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করেনি।

গত ২৫ জুলাই রাজধানীর সেগুনবাগিচার ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ চন্দ্র শেখর হালদারকে গ্রেফতার করে। এর আগে গত ১৩ মে মাউশির ৫১৩টি পদে নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলাকালে ইডেন কলেজ কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্রের উত্তরসহ চাকরি প্রার্থী সুমন জোয়ার্দারকে গ্রেফতার করা হয়। সুমনের দেওয়া তথ্যে ভিত্তিতে পুলিশ পটুয়াখালীর খেপুপাড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। পরে রাজধানীর টিকাটুলী ও ওয়ারী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৪তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ও পটুয়াখালী সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রাশেদুল ইসলাম, মাউশির উচ্চমান সহকারী আহসান হাবিব ও অফিস সহকারী নওশাদকে গ্রেফতার করে ডিবি।

এদিকে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) চন্দ্র শেখরের অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। চন্দ্র শেখর ও তার স্ত্রীর নামে যৌথ অ্যাকাউন্টে গত চার বছরে অন্তত ৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাদের যৌথ অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা জমা হয়েছে। আবার তা উত্তোলনও করা হয়েছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মিল্টনের আড়াই কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে একাধিক সংস্থা। এর বাইরেও গত কয়েক বছরে মিল্টন নামে বেনামে ২-৩ কোটি টাকার জমি কিনেছেন বলে জানা গেছে ।

এর আগে বিএফআইইউর অনুসন্ধানে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে বুয়েটের এক শিক্ষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। গত বছরের ৭ নভেম্বর পাঁচটি ব্যাংকে ক্যাশ অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এর পরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর ১১ নভেম্বর পরীক্ষা বাতিল হয়। ডিবি পুলিশের হাতে জনতা ব্যাংকের অফিসার শামসুল হক শ্যামল, রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার জানে আলম মিলন, পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মুস্তাফিজুর রহমান মিলন, আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির টেকনিশিয়ান মুক্তারুজ্জামান রয়েল এবং রাইসুল ইসলাম স্বপন গ্রেফতার হন। পরে আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক দেলোয়ার হোসেন, পারভেজ মিয়া এবং প্রেসকর্মী রবিউল আউয়ালকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায়।

গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

জানা যায়, বুয়েটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান নিখিল রঞ্জনের মাধ্যমেই এই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। বিএফআইইউ তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অনুসন্ধান করে ১০ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পায়। পরে তাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় বুয়েট কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষা ভবনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, গত চার বছর ধরে মাউশির বিভিন্ন পদে যেসব নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছিল, তার প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। এই প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের সঙ্গে শুধু চন্দ্র শেখরই নন, আরো অন্তত চার জন শীর্ষ কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন। এদের মধ্যে দুই শীর্ষ কর্মকর্তার উচ্চমান সহকারী আহসান হাবিব ও অফিস সহকারী নওশাদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ঐসব শীর্ষ কর্মকর্তা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মুহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে চন্দ্র শেখরকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। মাউশির প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে চন্দ্র শেখরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত।

ডিবির আরেকটি সূত্র জানায়, গ্রেফতারের আগেই চন্দ্র শেখর তার মোবাইল ফোনটি ধ্বংস করে ফেলেছেন। যে ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিয়ে প্রশ্নফাঁস করেছেন, তার কোনো প্রমাণই রাখেননি। তবে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করে চন্দ্র শেখরের মোবাইল ফোনের যাবতীয় তথ্য উদ্ধার সম্ভব।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার সাহাদত হোসেন সুমা বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস সিন্ডিকেটের সঙ্গে চন্দ্র শেখরের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। রিমান্ডে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। আমরা সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছি। 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সিগারেটে স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্মানহানিও হয়: শাজাহান খান

করোনায় আরও ১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২২৬

সারাদেশে ১৫ টাকায় চাল বিক্রি হবে 

‘বিরোধীরা আন্দোলন করছে, তাদের কাউকে যেন গ্রেফতার করা না হয়’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ঢাকায় পৌঁছেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনার

বিশেষ সংবাদ

ডলার পাচার রোধে সতর্কাবস্থা

বিশেষ সংবাদ

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় কষ্টে স্বল্প আয়ের মানুষ

অভিবাসী নারী শ্রমিক বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে