শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাজবাড়ীতে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ওলকচু চাষ 

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২, ১৭:৪৫

রাজবাড়ী জেলার মাটি ওলকচু চাষের উপযোগী ও কম খরচে বেশি ফলন পাওয়ায় দিন দিন বাণিজ্যিক ভিত্তিক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ওল কচুর চাষ। চলতি বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলাতে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে ওলকচু চাষাবাদ করেছেন এ জেলার কৃষকরা। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছেন, সঠিক পরিচর্যা অব্যাহত রেখে এ জেলার ওল কচু চাষিরা শতাংশ প্রতি ৫/৬মন ওলকচু সংগ্রহ করছেন। ফলে তাদের সংসারে যেমন সচ্ছলতা আসছে তেমনি ওই এলাকায় কৃষকরা ওল চাষের প্রতি দিন দিন আগ্রহী উঠছেন। 

জানা গেছে, চৈত্র মাসে জমিতে ওল কচুর বীজ রোপণ করতে হয়। ওল কচুর পূর্ণতা পেতে পুরো ৬ মাস সময় লাগে। সেই হিসেবে জমি থেকে ভাদ্র মাসে ওল কচু উত্তোলন করা যাবে। এ সময়ে ওলকচু চারা ওজনের ৪/৫ গুন বৃদ্ধি পেয়ে একেকটি ওলকচু ৮/ ১০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ করা ওলকচু অত্যন্ত সুস্বাদু। কোন রকম গলা জ্বালা করে না। এ কারণে বাজারে এ ফসলের চাহিদা রয়েছে অনেক। 

 রাজবাড়ী সদর উপজেলার কৃষি অফিসার মো. বাহাউদ্দিন সেক ওলকচু চাষ বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নের সিংগা গ্রামের রনজন কুমার সেন ২০শতাংশ জমিতে শ্বেতী জাতীয় ৪০০টি ওলকচু চাষাবাদ করেছেন। সদর উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ১দিনের প্রশিক্ষণ, বীজ, সার ও লেবার খরচ পেয়েছিলেন। নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ওলকচুর গাছগুলো ৪/৫ হাত লম্বা হয়েছে। কয়েকজন লেবার জমিতে ঘাস পরিষ্কার, পাতা পচা ও কাণ্ড পড়া ওল গাছগুলো  তুলে ফেলছেন। 

ওলচাষি রনজন কুমার সেন বলেন, আগে জমিতে বাণ্যিজিক ভাবে ওলকচু চাষাবাদ দেখিনি। আমি এ বছর চাষ করেছি। আশাকরি অনেক ভালো ফলন পাবো। ২০ শতাংশ জমি থেকে প্রায় ১০০মণ ওলকচু বিক্রি করতে পারবো। কচুর পাশাপাশি বীজও সংগ্রহ করে বিক্রি করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি। বর্তমান বাজারে ওলকচুর চাহিদা ব্যাপক রয়েছে। 

সদর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ওল কচু গাছে তেমন কোনো রোগ হয় না, তবে পাতা ও কাণ্ড পচা রোগ দেখা যেতে পারে। ওলকচুর ক্ষেত্রে কীট পতঙ্গ তেমন কোন সমস্যা নেই। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার, গোড়া উঁচু করে দেয়া ও গোড়ায় খড় বা আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। জৈব সার বেশি ব্যবহার করা ভালো। তবে রাসায়নিক সার যেমন ইউরিয়া, পটাশ, টিএসপি সারও কিছু দেওয়া যায়। গাছ লাগানোর ৭-৯ মাস পর যখন ৮০% গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাবে, তখন ওল সংগ্রহ করতে হবে। 

রাজবাড়ী সদর উপজেলার কৃষি অফিসার মো. বাহাউদ্দিন সেক বলেন, চলতি অর্থ বছরে সদর উপজেলায় ৪একর জমিতে ওলকচু চাষের ১৫টি প্রদর্শনী রয়েছে। এটি একটি পুষ্টি সমৃদ্ধ ও নিরাপদ সবজি। উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউনিয়ন পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি অফিসারগণ নিয়মিত কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছেন। 

ওলকচু চাষি

পাংশা উপজেলা কৃষি অফিসার রতন কুমার ঘোষ বলেন, এ বছর উপজেলার প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে কন্দাল ফসল উৎপাদন প্রদর্শনী শ্বেতী জাতের ওল কচু চাষ করা হয়েছে। গত বছরের চেয়ে ২গুন বৃদ্ধি পেয়েছে এ চাষ।  উপজেলা কৃষি অফিসের আওতায় ১০টি প্রদর্শনীতে ২০০ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এই ওলকচু চাষিদের চাষবাস ও রোগ পোকামাকড় সংক্রান্ত কারিগরি বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। 

গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসার মো. খোকন উজ্জামান বলেন, অপচলীত ফসলকে পূণরায় কৃষকদের মাঝে বহুল আবাদ বিস্তার ঘটাতে সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। চলতি অর্থ বছরে ১০টি প্রদর্শনী প্রকল্প সহ প্রায় ২ হেক্টর জমিতে ওলকচু চাষ করেছেন চাষিরা। 

কালুখালী উপজেলা কৃষি অফিসার পূর্ণিমা হালদার বলেন, উপজেলার ৭জন কৃষক নিজ উদ্যোগে ওলকচু চাষে আগ্রহী হয়ে প্রায় ২ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করেছেন। সরকারি ভাবে বীজ, সার না দিতে পারলেও কৃষি অফিস সার্বক্ষণিক চাষিদের সাথে যোগাযোগ ও বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছেন। 

ওলকচু চাষি পাংশা পৌরসভার সাবেক নারায়ণপুর গ্রামে মো. নিয়ামুল ইসলাম বলেন, গত বছর পাংশা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ২০ শতাংশ জমিতে ওলকচুর চাষাবাদ করি। প্রায় ৫০ হাজার টাকার কচু ও ৪/৫শ পিচ চারা বিক্রিও করেছি। কম যতেœ বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব ওলকচু চাষাবাদ করে। 

ওল কচু গাছে তেমন কোনো রোগ হয় না

ওলকচু চাষি কালুখালী উপজেলা বোয়ালিয়া ইউনিয়নের হাটগ্রামের মো. শফিকুর ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ৫ বছর আগ থেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভাবে প্রায় ১ একর জমিতে ওলকচু চাষাবাদ করছি। এ বছর ৪ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। আশা করি, ফলন ভালো পাবো এবং কাঙ্ক্ষিত বাজার মূল্যে বিক্রি করে লাভবান হবো। 

রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এস.এম সহীদ নূর আকবর বলেন, রাজবাড়ী সদর, গোয়ালন্দ, পাংশা উপজেলা কৃষি অফিস কর্তৃক কন্দাল ফসলের উৎপাদন বিস্তারের লক্ষ্যে চলতি বছরে ১২০ জন কৃষক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। এছাড়া কৃষি অফিস থেকে ওলকচুর বীজ, সার ও পরামর্শ প্রদান করে আসছেন। নির্দিষ্ট সাইজের ওলকচু বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করে কৃষকরা ফসলের পাশাপাশি বীজ বিক্রি করেও অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।

 

 

ইত্তেফাক/এআই