শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আয়মান আল জাওয়াহিরি : চোখের ডাক্তার থেকে শীর্ষ আল-কায়েদা নেতা

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২২, ০১:৩২

মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত আয়মান আল জাওয়াহিরি একসময় ছিলেন চোখের ডাক্তার। যিনি পরে মিশরের জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক জিহাদ প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়তা করেন। ২০১১ সালে পাকিস্তানে আমেরিকার হামলায় আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পরে আয়মান আল-জাওয়াহিরি আল-কায়েদার নেতৃত্ব আসেন। আয়মান আল-জাওয়াহিরি ছিলেন আল-কায়েদার প্রধান মতাদর্শিক নেতা। এর আগে জাওয়াহিরিকে মনে করা হতো ওসামা বিন লাদেনের ডান হাত। 

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার মূল বাস্তবায়নকারী ছিলেন জাওয়াহিরি। সে হামলার পরে আমেরিকা যে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকা প্রকাশ করেছিল সেখানে ওসামা বিন লাদেনের পরেই জাওয়াহিরির নাম ছিল। সেসময় তার মাথার মূল্য ঘোষণা করা হয় আড়াই কোটি ডলার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাওয়াহিরি ছিলেন আল- কায়েদার সবচেয়ে সুপরিচিত মুখপাত্র। তিনি ১৬টি ভিডিও এবং অডিও বার্তা দিয়েছেন, যেটি ছিল ওসামা বিন লাদেনের চেয়ে চার গুণ বেশি। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব জুড়ে মুসলিমদের চরমপন্থায় উদ্বুদ্ধ এবং তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। এর আগেও জাওয়াহিরিকে হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কয়েকবার হামলা চালায়। ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে জাওয়াহিরিকে লক্ষ্য করে মিসাইল হামলা চালায় আমেরিকা। সে হামলায় আল-কায়েদার চার জন সদস্য নিহত হয়। এর দুই সপ্তাহ পরেই এক ভিডিও বার্তায় জাওয়াহিরি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে সতর্ক করে বলেন, তিনি কিংবা ‘দুনিয়ার সব শক্তি’ তার মৃত্যু এক সেকেন্ডও এগিয়ে আনতে পারবে না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাওয়াহিরি খুব কমই সামনে এসেছেন।

সম্ভান্ত পরিবার

১৯৫১ সালের ১৯ জুন মিশরের রাজধানী কায়রোর একটি সম্ভান্ত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে আয়মান আল-জাওয়াহিরির জন্ম। তাদের ছিল চিকিৎসক এবং শিক্ষাবিদের পরিবার। তার দাদা রাবিয়া আল-জাওয়াহিরি ছিলেন কায়রোর আল-আজহারের গ্র্যান্ড ইমাম, যেটি মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি ইসলামিক শিক্ষার কেন্দ্র। তার একজন চাচা ছিলেন আরব লিগের প্রথম মহাসচিব। স্কুলে পড়ার সময়ে আল-জাওয়াহিরি রাজনৈতিক ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মিশরের নিষিদ্ধ মুসলিম সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও সেটি তার পড়াশুনার জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। তিনি ১৯৭৪ সালে কায়রো ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল স্কুল থেকে স্নাতক এবং এর চার বছর পরে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। আয়মান আল-জাওয়াহিরির বাবা মোহাম্মদ ছিলেন একই মেডিক্যাল স্কুলের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক। তিনি ১৯৯৫ সালে মারা যান।

চরমপন্থি যুবক

পড়াশোনা শেষ করার পর আল-জাওয়াহিরি পরিবারের পথ অনুসরণ করেছিলেন। কায়রো শহরের কাছেই একটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু খুব দ্রুত তিনি চরমপন্থি ইসলামিক গ্রুপগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, যারা মিশরে সরকার উৎখাতের ডাক দিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে যখন ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ গঠন করা করা হয় তখন তিনি সেখানে যোগ দেন। ১৯৮১ সালে ইসলামিক জিহাদের কিছু সদস্য সেনাবাহিনীর পোশাক পরিধান করে রাজধানী কায়রোতে একটি মিলিটারি প্যারেডে ঢুকে পড়েন। সে প্যারেডে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করা হয়। এরপর সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েক শ সদস্যের সঙ্গে আল-জাওয়াহিরিকেও আটক করা হয়। বিচারের সময় আল-জাওয়াহিরি অভিযুক্তদের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তখন আদালতে তাকে বলতে দেখা যায়—আমরা মুসলিম এবং আমাদের ধর্মে বিশ্বাস করি। আমরা একটি মুসলিম দেশ ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থেকে আল-জাওয়াহিরিকে মুক্তি দেওয়া হলেও অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে আদালত তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। কারাগারে থাকার সময় জাওয়াহিরিকে প্রতিনিয়ত নির্যাতন করা হতো। এর ফলে ধর্মান্ধ এবং সহিংস জঙ্গিতে রূপান্তর ঘটে জাওয়াহিরির। এমনটাই বলছেন, তখন তার সঙ্গে কারাগারে থাকা অন্য ইসলামপন্থি কয়েদিরা। ১৯৮৫ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সৌদি আরব চলে যান। এর পরপরই তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ারে যান এবং সেখান থেকে আফগানিস্তান যান। সেখানে গিয়ে তিনি ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ-এর একটি অংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া আফগানিস্তানে যখন সোভিয়েত আগ্রাসন চলছিল তখন তিনি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ পুনরায় আত্মপ্রকাশ করলে তার নেতৃত্ব নেন জাওয়াহিরি। এ সংগঠনটি মিশরের সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালায়। এ সময় মিশর জুড়ে তারা প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষকে হত্যা করে।

১৯৯৭ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ইসলামিক জিহাদের একটি অংশ কনকোয়েস্ট গ্রুপের প্রধান নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে। এই গ্রুপটি মিশরে বিদেশি নাগরিকদের হত্যার জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। এর দুই বছর পর জাওয়াহিরির অনুপস্থিতিতে মিশরের একটি সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

পশ্চিমা লক্ষ্যবস্তু

ধারণা করা হয়, ১৯৯০-এর দশকে জাওয়াহিরি নিরাপদ আশ্রয় এবং অর্থ জোগাড়ের জন্য বিশ্ব জুড়ে ঘুরে বেরিয়েছেন। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পরের বছরগুলোতে তিনি বুলগেরিয়া, ডেনমার্ক এবং সুইজারল্যান্ডে বসবাস করেছেন বলে মনে করা হয়। কখনো কখনো ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে বলকান অঞ্চল, অস্ট্রিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান এবং ফিলিপাইন ভ্রমণ করেন বলে মনে করা হয়।

১৯৯৬ সালে তিনি রাশিয়ায় গ্রেফতার হয়ে ছয় মাস কারাগারে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ভিসা ছাড়া চেচনিয়া ভ্রমণ করেছেন। ১৯৯৭ সালে তিনি আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে যান। যেখানে ওসামা বিন লাদেনের ঘাঁটি ছিল। এর এক বছর পর ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ এবং আল-কায়েদাসহ পাঁচটি ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন মিলে ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট গঠন করে। তারা ইহুদি এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মার্কিন নাগরিকদের হত্যার জন্য প্রথম ফতোয়া দেয় ইসলামিক ফ্রন্ট। এর ছয় মাস পরে কেনিয়া এবং তাঞ্জানিয়াতে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনায় ২২৩ জন নিহত হয়। স্যাটেলাইট টেলিফোনে জাওয়াহিরির কথোপকথন থেকে জানা যায়, এসব হামলার সঙ্গে ওসামা বিন-লাদেন জড়িত ছিল। এর দুই সপ্তাহ পর আফগানিস্তানে ইসলামিক ফ্রন্টের ট্রেনিং ক্যাম্পে বোমাবর্ষণ করে আমেরিকা। এর পরের দিন পাকিস্তানের এক সাংবাদিককে ফোন করে জাওয়াহিরি বলেন, আমেরিকাকে বলুন তাদের বোমা হামলা, হুমকি এবং তাদের আগ্রাসনে আমরা ভয় পাই না। যুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে।

ইত্তেফাক/ইআ