শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাসটিতে টানা তিন ঘণ্টা তাণ্ডব চালায় ডাকাতরা

মধুপুরে চলন্ত বাসে ডাকাতির ঘটনায় মামলা, গ্রেফতার এক,
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারীর আদালতে জবানবন্দি

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২, ০০:৩৪

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় এক জনকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে টাঙ্গাইল শহরের দেওলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত রাজা মিয়া (৩২) জেলার কালিহাতী উপজেলার বল্লা গোরস্হান এলাকার মৃত হারুন অর রশীদের ছেলে। বাসের চালক ও হেলপারকে জিম্মি করার পর রাজা গাড়ি চালিয়েছিল। সে ডাকাতদলের সদস্য।

আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সদস্যরা গত মঙ্গলবার গভীর রাতে ঐ বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। টানা তিন ঘণ্টা বাসের যাত্রীদের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে তাদের সর্বস্ব লুটে নেয়। এ সময় বাসের এক নারী যাত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে চার ডাকাত।

বৃহস্পতিবার দুপুরে টাঙ্গাইল পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, গ্রেফতারকৃত ডাকাত রাজা টাঙ্গাইলের যাত্রীবাহী বাস ঝটিকা সার্ভিসের একজন চালক। দীর্ঘদিন যাবত্ সে টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনাল এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিল। এ ঘটনায় বাসের যাত্রী কুষ্টিয়ার হেকমত বাদী হয়ে মধুপুর থানায় মামলা করেছেন। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে গণধর্ষণের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়েছে।

বাসের যাত্রী ও পুলিশ জানায়, ঘটনার রাতে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ঈগল পরিবহণের বাসে (পাবনা-ব-১১-০১৫৪) যাত্রী বেশে ডাকাত দল ওঠে প্রথমে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে যাত্রীদের হাত পা, চোখ বেঁধে মারধর ও জিনিসপত্র লুট করে। তারপর এক নারীকে গণধর্ষণ করে। সব ঘটনা শেষে পথ পরিবর্তন করে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া জামে মসজিদের উলটোপাশে বালির ঢিবিতে বাস উঠিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। বাসটিতে অন্তত ৩০-৩৫ জন যাত্রী ছিল।

বাসযাত্রীরা জানান, সিরাজগঞ্জের কাছাকাছি দিবারাত্রি হোটেলে নৈশভোজের জন্য যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে আবার বাস যাত্রা শুরু করে। পথে কাঁধে ব্যাগ বহনকরা ১০-১২ জন তরুণ যাত্রী ওঠে। বাসের প্রায় সবাই তখন ঘুমে ছিলেন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর যাত্রীবেশে থাকা ঐ তরুণদল ঘুমন্ত যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে একে একে সবাইকে বেঁধে ফেলে। প্রত্যেক যাত্রীর চোখ ও মুখ বেঁধে চালককেও জিম্মি করে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা, গয়না লুট করে। তারপর এক নারী যাত্রীকে ডাকাতদলের চার জন পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এ সময় ডাকাত দলের কেউ কেউ মৌখিক বাধা দিলেও তা না মেনে চার তরুণ নারীটিকে ধর্ষণ করে। পরে ভোরের দিকে পথ পরিবর্তন করে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া জামে মসজিদের পাশে বালির ঢিবিতে বাসটি উঠিয়ে ডাকাতদল নেমে যায়।

নাটোরের বড়াইগ্রামের বাসিন্দা ফল ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হাবিব ঐ বাসের নিয়মিত যাত্রী। বাসের সুপারভাইজার রাব্বি ও হেলপার দুলাল তার পূর্বপরিচিত কিন্তু বাসের চালক ছিলেন নতুন। হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এ পাশবিকতা ‘৭১-এর বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। সকালে স্হানীয় বাসিন্দারা আমাদের উদ্ধার করে। রক্তিপাড়া জামে মসজিদের ইমামসহ অন্যরা তাদের নাশতাও করিয়েছেন।’

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার তারাগুনিয়া গ্রামের শিল্পী বেগম অসুস্হ মেয়ে জেসমিনকে চিকিত্সার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। বুধবার কানের অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। তিনি জানান, তার কাছে থাকা ৩০ হাজার টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে ডাকাতরা। এ সময় তার স্বামী পিয়ার আলীকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে আহত করেছে ডাকাতরা।

বেসরকারি চাকরিজীবী নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ নাটোর থেকে বাড়ি যাচ্ছিলেন অসুস্হ মাকে দেখার জন্য। বেতনের ২২ হাজার ৮০০ টাকা ডাকাতরা নিয়ে গেছে। ‘ভাতিজারা সব নিয়া গেলা?’ এমন প্রশ্ন শুনে তাকে ১০০ টাকা ফিরিয়ে দেয় ডাকাতরা।

সকালে সংবাদ পেয়ে মধুপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্হলে গিয়ে বাসযাত্রীদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। গাড়িতে থাকা দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথা স্বীকার করেছেন মধুপুর থানার উপপরিদর্শক এনামুল হক। পুলিশের সহযোগিতায় বাসটিও উদ্ধার করা হয়।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার ঘটনাস্হল পরিদর্শন করেন এবং মধুপুর থানায় অবস্হান করে বাসযাত্রী ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় ময়মনসিংহ থেকে আসা ডিএনএ পরীক্ষাগারের কর্মীদের থানায় অবস্হান করতে দেখা গেছে। মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাজহারুল আমিন জানান, সব ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তকাজ চলছে।

পুলিশ সুপার জানান, গ্রেফতারকৃত রাজার সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে বৃহস্পতিবার আদালতে তোলা হবে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

ধর্ষণের শিকার নারীর আদালতে জবানবন্দি:টাঙ্গাইলের কোর্ট ইন্সপেক্টর তানবীর আহাম্মেদ জানান, ধর্ষণের শিকার ঐ নারী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। বাসের ভেতর তাকে পালাক্রমে ধর্ষণের কথা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুমি খাতুন এ জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

‘ধর্ষণের আলামত মিলেছে’:এর আগে টাঙ্গাইল শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রেহেনা পারভীন জানান, তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভিকটিমের মেডিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তবে চূড়ান্ত মতামত দিতে কিছুটা সময় লাগবে।

রাজা মিয়া রিমান্ডে :কোর্ট ইন্সপেক্টর তানবীর আহাম্মেদ জানান, গ্রেফতারকৃত আসামি রাজা মিয়াকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে বিকালে আদালতে আনা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শুনানি শেষে আসামিকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বাদল কুমার চন্দ এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি