বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হিজরি সনের গোড়াপত্তন নবিজির (স.) হাতেই

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২, ০৯:০৬

হিজরি সন। মুসলিম জীবনের এক তাত্পর্যময় অধ্যায়। বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক তাত্পর্যময় ঘটনার অবিস্মরণীয় স্মারক এ হিজরি সন। হিজরি সনের গোড়াপত্তন করেছিলেন খোদ নবি করিম (স.)। খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি চুক্তিপত্রের নিচে হিজরতের ৫ম বর্ষ উল্লেখ করার নির্দেশ দেন বলে ইসলামের ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) স্বীয় খেলাফতকালে হিজরতের ১৭তম বর্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরি সন গণনা শুরু করেন।

হিজরি তারিখ গণনার সূচনা কীভাবে হলো, কবে থেকে হলো তা বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্নভাবে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। ‘আল মাওসুয়াতুল ফিকহিয়া আল কুয়েতিয়া’ গ্রন্থে বিষয়টি এভাবে এসেছে— ইসলাম আসার আগে আরবের সমষ্টিগত কোনো তারিখ ছিল না। সে সময় তারা প্রসিদ্ধ ঘটনা অবলম্বনে বছর, মাস গণনা করত। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তানরা কাবা শরিফ নির্মিত হওয়ার আগে তার আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা অবলম্বনে তারিখ নির্ধারণ করত। কাবা শরিফ নির্মাণের পর তারা বিক্ষিপ্ত হওয়া পর্যন্ত এর আলোকেই সাল গণনা করতেন। তারপর বনু ইসমাইলের যারা হেজাজের তেহামা অঞ্চল থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যেত, তখন সেই গোত্র বেরিয়ে যাওয়ার দিন থেকে তারিখ গণনা করত। যারা তেহামাতে রয়ে যেত তারা বনি জায়েদ গোত্রের জুহাইনা, নাহদ ও সাদের চলে যাওয়ার দিন থেকে সাল গণনা করত। কাব বিন লুয়াইয়ের মৃত্যু পর্যন্ত এ ধারা চলমান ছিল। পরে তার মৃত্যুর দিন থেকে নতুনভাবে সাল গণনা শুরু হয়। এটি চলতে থাকে হস্তীবাহিনীর ঘটনা পর্যন্ত। হজরত ওমর (রা.) হিজরি নববর্ষের ঘোষণা করার আগ পর্যন্ত আরবে হস্তীবর্ষই প্রচলিত ছিল।

হিজরি সনের গোড়াপত্তন: মহানবি (স.)-এর হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মারক বানিয়ে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) হিজরি সনের আনুষ্ঠানিক অপরিহার্যতা বোধ করেন। তিনিই প্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্র মাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। আল্লামা ইবনে সমরকন্দী (র.) লিখেছেন, হজরত আবু মুসা আশয়ারি (রা.) ইরাকের গভর্নর থাকাকালে একবার হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে চিঠি লেখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অনেক ফরমান আসে। কিন্তু তাতে তারিখ লেখা থাকে না। সুতরাং সময়ক্রম নির্ধারণের জন্য সন গণনার ব্যবস্থা করুন। তারপর ওমর (রা.) হিজরি সনের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেন।

যেভাবে সন গণনা শুরু: হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। যখন হজরত ওমর (রা.) সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি এক পরামর্শসভার আহ্বান করেন। সভায় হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) রসুল (স.)-এর ওফাত থেকে সন গণনার প্রস্তাব দেন। হজরত তালহা (রা.) বিশ্বনবি (স.)-এর নবুয়তের বছর থেকে সন গণনার অভিমত ব্যক্ত করেন। আর হজরত আলী (রা.) প্রস্তাব দেন হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে সন গণনার। অবশেষে সকলেই আলি (রা.)-এর প্রস্তাবে ঐকমত্য পোষণ করেন। হিজরতের সাল থেকে সন গণনা চূড়ান্ত হওয়ার পেছনে তাৎপর্য হলো, হিজরতকে মূল্যায়ন করা হয় আল ফারিকু বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল তথা সত্য-মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী বিষয় হিসেবে। হিজরতের পর থেকেই মুসলমানরা প্রকাশ্য ইবাদত ও সমাজ গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। প্রকাশ্যে আজান, নামাজ, জুমা, ঈদ ও অন্য সবকিছু হিজরতের পর থেকেই শুরু হয়েছে। এসব তাৎপর্যের দিকে লক্ষ্য করেই মুসলমানদের সন গণনা হিজরত থেকেই শুরু হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

হিজরি সন কেন মহররম দিয়ে শুরু: রসুলুল্লাহ (স.) যখন মদিনা মুনাওয়ারায় আসেন, তখন মাসটি ছিল রবিউল আউয়াল। আর হজরত ওমর (রা.) হিজরি সনের প্রথম মাস ধরেন মহররমকে। যদিও প্রিয়নবি (স.) মদিনায় পৌঁছেন রবিউল আউয়াল মাসে। কিন্তু হিজরতের পরিকল্পনা হয়েছিল নবুয়তের ১৩তম বর্ষের হজের মৌসুমে। সময়টি ছিল মদিনার আনসারি সাহাবিদের সঙ্গে আকাবার দ্বিতীয় শপথ সংঘটিত হওয়ার পর। তখন ছিল জিলহজ মাস। আর তার পরের মাসই হলো মহররম।

বাংলাদেশে হিজরি সনের প্রচলন: ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হজরত ওমর (রা.) কর্তৃক হিজরি সন প্রবর্তিত হওয়ার এক বছর পরই আরব বণিকদের আগমনের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসার ও হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ৫৯৮ হিজরি মোতাবেক ১২০৯ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের মাধ্যমে বাংলার জমিনে মুসলিম শাসনের ইতিহাস সূচিত হয়। এর ফলে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভের মাধ্যমে জাতীয় সন গণনায় পরিণত হয়। সন গণনায় ৫৫০ বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর থাকার পর ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের মাধ্যমে হিজরি সনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবসান হয়। এ চান্দ্রবর্ষকে কেবল আরবদের সন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না; বরং হিজরি মুসলমানদের সন। এটি ইসলামের সন।

লেখক: মুহাদ্দিস, গবেষক ও প্রাবন্ধিক; বিভাগীয় প্রধান (হাদিস) আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন