রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পাটশিল্পের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা 

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ০৩:০৩

বাংলাদেশে বিরাজ করছে তীব্র দাবদাহ। আকাশে জ্বল জ্বল করছে সূর্য। মনে হচ্ছে জ্বলন্ত একটা অগ্নিকুণ্ড মাথার ঠিক ওপরেই। মানুষ ঘনঘন আকাশপানে তাকাচ্ছে। কখন নামবে স্বস্তির বৃষ্টি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। না বৃষ্টি, না শীতল পরিবেশ। অনেকেই এর কারণ খুঁজছেন। কেন হচ্ছে না বৃষ্টি। জানা গেছে, এমন দাবদাহ শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রায় অর্ধেক পৃথিবী জুড়েই বিরাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যেন কারখানার ব্রয়লার চেম্বারের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দিনে দিনে। তীব্র দাবদাহ এবং বৃষ্টি না হওয়ার কারণে পাট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

জেনে রাখা ভালো, পাট একটি বর্ষাকালীন ফসল। এর জীবনকাল ১০০ থেকে ১২০ দিন পর্যন্ত। চৈত্র-বৈশাখ থেকে আষাঢ়-শ্রাবণ। পাট বৃষ্টিনির্ভর ফসল। বায়ুর আর্দ্রতা ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশের পছন্দ। পাট চাষে কোনো রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। গড় ফলন হেক্টর প্রতি প্রায় দুই টন। পাটের আঁশ নরম উজ্জ্বল চকচকে এবং ১ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। তবে একক আঁশ কোষ ২ থেকে ৬ মিলি মিটার লম্বা এবং ১৭ থেকে ২০ মাইক্রন মোট হয়। পাটের আঁশ প্রধানত সেলুলোজ এবং লিগনিন দ্বারা গঠিত। সাধারণত পাটগাছ জৈব প্রক্রিয়ায় পানিতে জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়ানো হয়।

বাংলাদেশে পাটকে সোনালি আঁশ বলা হয়ে থাকে এবং পাট বাংলার শত বর্ষের ঐতিহ্য। সোনালি আঁশ খ্যাত পাটের কথা এখন তেমন শোনা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের বেশির ভাগ এলাকায় এক সময় ধান ও পাটের চাষ বেশি হতো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আমল থেকে বহু বছর পর্যন্ত পাট উৎপাদনে আমাদের দেশ পৃথিবীতে প্রথম স্থানে ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পাট উৎপাদনে আমরা দ্বিতীয় স্থানে নেমে আসি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রতিকূলতায় এ শিল্প বর্তমানে চরম অবহেলায় নিপতিত। পলিথিন বা সিনথেটিক আঁশের ক্রমাগত বিস্তারে পাটের কদর অনেকটা কমে গেছে। অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। লোকসান ও নানা জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকার পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল আদমজীকে বন্ধ করে দেয়। যে কয়টি পাটকল এখনো চলছে, সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের প্রায় রাস্তায় দেখা যায়।

আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পাটশিল্পের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। এই শিল্প আমাদের অর্থনীতির চাকার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এদেশের লক্ষ লক্ষ কৃষকের অবলম্বন এই পাট। কর্মসংস্থান, অর্থোপার্জন, দারিদ্র্যবিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন—সর্বোপরি এই দেশের ঐতিহ্য ও নিজস্বতা রক্ষায় পাটশিল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আধুনিকতার পদতলে নিষ্পেষিত যখন পুরো পৃথিবী, দূষণের ফলে বিশ্ব পরিবেশ যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন পাটশিল্পের যথাযথ ব্যবহার আমাদের বাঁচাতে পারে অদূর ভবিষ্যতের অনেক ভয়াবহতা থেকে। এ শিল্প আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। এ শিল্প বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের পরিচায়ক। সরকারের সজাগ দৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের এই শিল্পকে এবং ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের গৌরবান্বিত ঐতিহ্য, নিজস্বতার ধারক এই পাট শিল্পকে।

হ লেখক :শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ

ইত্তেফাক/ইআ