শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বঙ্গমাতা থেকে বর্তমান প্রজন্মকে রাজনীতি ও মানবিকতা শিখতে হবে: শেখ পরশ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২২, ২২:১৪

যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস্ পরশ বলেছেন, বঙ্গমাতা থেকে বর্তমান প্রজন্মকে শিখতে হবে রাজনীতি এবং মানবিকতা। আগস্টের ট্রাজেডির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক কুইন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব। তার সমগ্র জীবনটা অনুসরণ কররে দেখা যায়, তার মত ভুক্তভোগী মানুষ খুব কম আছে। মাত্র ৪ বছর বয়সে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে তিনি অনাথ হয়েছেন। অর্থাৎ জীবনের শুরুতেই জীবনের সবচেয়ে বড় হোঁচট। আমার মত যারা শিশু বয়সে বাবা-মা হারিয়েছে, তারা বুঝবে একজন এতিমের কষ্ট।

সোমবার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী, মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সভায় সভাপতিত্বকালে তিনি এসব কথা বলেন।

পরশ বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা “শেখ ফজিলাতুন নেছা, আমার মা” রচনায় লিখেছেন, স্বামীকে তিনি খুব কম সময় কাছে পেতেন, কখনো একটানা দুটি বছর আমরা কিন্তু বাবাকে কাছে পাইনি। কাজেই স্ত্রী হিসাবে আমার মা ঠিক এভাবে বঞ্চিত ছিলেন। বাচ্চাগুলো নিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদদের ঘিরে তার জীবন। বেশিরভাগ সময়ই প্রিয়তম স্বামীর অপেক্ষায় নির্মম সময় কাটে। সকল কষ্টের অবসান ঘটিয়ে যখন স্বাধীন হল স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন আমাদের বঙ্গমাতা, ভাবলেন এবার হয়তোবা স্বামীকে কাছে পাবে। বাকি জীবনটা কিছুটা স্বস্তিতে কাটানো যাবে। কিন্তু না, সেই সুখ তার কপালে জুটল না। স্বাধীনতা অর্জনের ৪ বছরের মধ্যে ইতিহাসের সেই নারকীয় এবং বীভৎস হত্যাকাণ্ড তার সকল স্বপ্ন গ্রাস করে সবকিছু চুরমার করে দিল। তিনি যখন জানলেন যে তার কামালকে হত্যা করা হয়েছে, যখন দেখলেন তার প্রিয়তম স্বামীকে তার সামনে গুলি করা হলো, কি রকম ভয়াবহ ছিল সেই শেষ মুহূর্তগুলো? তারপরে আবার জামাল, রাসেল, সুলতানা, খুকি আর রোজির জীবনের নিরাপত্তার আশঙ্কা নিয়ে কি তার শেষ নিশ্বাস ছাড়তে হলো বাংলার ট্রাজিক কুইন ফজিলাতুন নেছা মুজিবের?

 

তিনি আরও বলেন, অতি সাধারণ জীবন যাপন ছিল বেগম মুজিবের। তার কোন জৌলুশ ছিল না, ছিল না কোন চাকচিক্য, অতি সাধারণ জীবন যাবনে অভ্যস্ত ছিলেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব। তিনি দুইবার মন্ত্রীর স্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী, প্রেসিডেন্টের স্ত্রী, কিন্তু তারপরেও তার চালচলনে ছিল-শাশ্বত বাঙালি মধ্যবিত্ত নারীর আটপৌঢ়ে রূপ। ছিল না কোন লোভ-লালসা বা সখ-আহ্লাদ। জীবনে কোন কিছু আবদার করে নাই স্বামীর কাছে বা শ্বশুরের কাছে। জননেত্রীর লেখায় “মা কখনও বলেননি যে আমার টাকার অভাব। সংসার চালাতে হচ্ছে।” নিভৃতে তিনি সকল কষ্ট সহ্য করেছেন। আজন্ম কষ্ট, বঞ্চনা এবং বিয়োগব্যাথা তাকে এক অসাধারণ মানবিক ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করেছিল। বঙ্গমাতাকে কাছ থেকে দেখার সামান্য সৌভাগ্য থেকে আমি মনে করি, যে প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যে মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলি দেখে আমরা বিমোহিত হই, তার প্রত্যেকটা শেখ হাসিনা উত্তরাধিকারী করেছেন তার মা, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব থেকে। স্বাধীনতা উত্তর বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনে তিনি বিশেষ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন এবং সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। জননেত্রীর ভাষায়; স্বাধীনতার পর যেসব মেয়ে নির্যাতিত ছিল, নির্যাতিত মেয়েদের সাহায্য করা, তাদেরকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া। ওই মেয়েদের যখন বিয়ে দিতো, মা নিজেও তখন উপস্থিত থেকেছেন। নিজের গহনা দিয়ে দিয়েছেন। আমাকের একদিন বললেন, মাত্র ১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে তাকে যেভাবে অত্যাচার করেছৈ, তা দেখে তার খুব মন খারাপ হয়েছে। এভাবে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ান, যে এসে যা চেয়েছে হাত খুলে তা দিয়ে দিয়েছেন, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না।

যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, শিশুদের প্রতিও ছিল তার অগাধ উদারতা। শিশুদেরকে তিনি বিশেষ মনোযোগ দিতেন এবং অকৃত্রিম মমত্ববোধ প্রদর্শন করতেন। শিশুদের আবদার এবং বায়নার প্রতি বঙ্গমাতা নজর রাখতেন। শুধু মানুষ নয়, যেকোন পশু-পাখি, জীবজন্তুর প্রতি ছিল তার অগাধ মমত্ববোধ। তিনি বাগান করতেন, কুকুর, কবুতর, মুরগি পোষতেন এবং ওদের যত্ন নিতেন। আমার ছোটবেলার একটা ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করছি। একবার ৩২নং বাসায় গিয়ে দেখি যে, একটা মুরগি অনেকগুলা বাচ্চা দিয়েছে। আমি ওদেরকে নিয়ে মাতওয়ারা হয়ে গেলাম এবং ওদেরকে ছাড়া আসতে চাচ্ছিলাম না। আমি বায়না ধরলাম যে আমারও ঐ মুরগিগুলি লাগবে। মা তো মহা মুসিবতে পড়লো। আমি কিছুতেই ওদের পিছ ছাড়ি না। মা আমাকে একরকম জোর করে বাসায় নিয়ে আসল। আমি কাঁদতে কাঁদতে ওবাসা থেকে চলে আসলাম। বাসায় আসার পর, বিকালে দেখি আপন দাদী (বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব) মুরগি আর মুরগি বাচ্চাগুলো আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঐ বাসায় আমি আপন দাদির অনেক ভক্ত ছিলাম। আমার নিজের দাদীকে বাদ দিয়ে ওনাকেই ‘আপন দাদি’ বলে ডাকতাম। এমনই মায়াবতী এবং মমতাশীল ছিলেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব শিশুদের প্রতি। আমি মনে করি এই সকল মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং সক্রিয় করে তুলেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা লিখেছেন; আওয়ামী লীগের কোন নেতা-কর্মীর অসুখ-বিসুখ হলে তাকে সাহায্য করা, যারা বন্দি তাদের পরিবারগুলো দেখা, কার বাড়িতে বাজার হচ্ছে না, সে খোঁজ-খবর নেওয়া এবং এগুলো করতে গিয়ে মা কখনও কখনও গহনা বিক্রি করেছেন। আমার মা কখনও কিছু না বলতেন না। সর্বক্ষেত্রে তিনি বঙ্গবন্ধুকে সহযোগিতা করেছেন, একাগ্রচিত্তে এবং নিঃশর্তভাবে। জাতির পিতার জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। এভাবে তিনি নিপীড়িত বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে। আমদের মুক্তির সংগ্রামে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করেছে। সংকট মুহূর্তে এ ধৈর্য ধরে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে তিনি সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত গুলো নিতে পেরেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর লেখায়; অনেক ঘাঁত-প্রতিঘাত এসেছে। কিন্তু আমার মাকে আমি কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। এমনি দৃঢ় চিত্তের অধিকারী ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম মুজিব। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাও ছিল অতুলনীয়।

যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি’র রাজনৈতিক এবং লেখক হিসাবে গড়ে উঠার পেছনে প্রেরণারও কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গমাতা। পড়াশোনার প্রতি ছিল তার অদম্য আগ্রহ। শেখ মণি’র লেখক এবং সাংবাদিক হওয়ার পেছনেও বেগম মুজিবের অবদান অপরিসীম। সুতরাং বেগম মুজিবের চারিত্রিক গুণাবলি থেকে আমাদের প্রজন্মের অনেক কিছু শিক্ষণীয়, বিশেষ করে মানবিকতা এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি যে উদাহরণ রেখে গেছেন তা সত্যি অনুকরণীয়।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন-ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো. মাইনুল হোসেন খান নিখিল।

ইত্তেফাক/এএএম