মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গণপরিবহণের নৈরাজ্য থামাবে কে?

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২২, ২০:৪৯

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ানো হয়েছে বাস ভাড়া। বাস মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করেই বাড়তি ভাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় বাসের চালক-সুপারভাইজারেরা সেই সিদ্ধান্ত মানছেন না। তারা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন। এ নিয়ে প্রতিদিনই বাসের স্টাফদের সঙ্গে যাত্রীদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। কোথাও হাতাহাতিও হচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার থেকে মাঠে নামছেন পরিবহণ মালিক সমিতির নেতারা। ১১টি দল রাজধানীতে এই নৈরাজ্য দেখতে মাঠে থাকবে, প্রয়োজনে বাসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। ডয়চে ভেলেকে এমনটাই জানালেন ঢাকা পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তিনি বলেন, অভিযোগ আমরাও পাচ্ছি। এখন ব্যবস্থা নেব।

সংবাদমাধ্যমে বাস ভাড়া নিয়ে যা আসছে তা কি সত্যি? নাকি সংবাদপত্রগুলো বাড়িয়ে লিখছে? সেটা দেখতে রোববার বাসে চড়েছিলেন আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, মিরপুরের পল্লবী থেকে বনানীর সৈনিক ক্লাব পর্যন্ত আমি বাসে চড়েছি। বাসটির নাম সম্ভবত মক্কা পরিবহন। আগে এই পথটুকুতে ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো। এদিন বাসের স্টাফ আমার কাছে ৩০ টাকা ভাড়া চাইলেন। আমি তাকে বললাম, সরকার যে ২২ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করেছে তাতে তো ভাড়া হওয়ার কথা ২৪ টাকা। তুমি এক টাকা বেশি নিতে পার। অর্থাৎ ২৫ টাকা। কেন ৩০ টাকা চাচ্ছো। জবাবে সে আমাকে বলল, মালিকেরা ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে, এই টাকাই দিতে হবে। না দিলে আপনি নেমে যেতে পারেন। বিষয়টি আমি দলীয় ফোরামে বলেছি। সেখানে আমাদের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও ছিলেন। আমি মনে করি, জনগণের কাছ থেকে বাসের স্টাফরা বেশি ভাড়া নিচ্ছেন। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

এই চিত্র শুধু কাজী জাফরউল্লাহর ক্ষেত্রে নয়, অন্য যাত্রীদের কাছ থেকেও একইভাবে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। রইসুল ইসলাম নামে একজন বাসযাত্রী বললেন, মোহাম্মদপুর থেকে মালিবাগ রেল গেট পর্যন্ত আগে ভাড়া নিত ২০ টাকা। এখন নিচ্ছে ৩০ টাকা। এরা ভাড়ার কোনো সামঞ্জস্য রাখছে না। যা খুশি নিচ্ছে। এই পথের দূরত্ব ৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। আগের হারে ভাড়া হয় ১৪ টাকা ৪০ পয়সা। বর্তমান হারে তা আসে ১৬ টাকা ৭৫ পয়সা। অর্থাৎ বাড়তি আদায় করা হচ্ছে ১৩ টাকা ২৫ পয়সা। আড়াই টাকা কিলোমিটারের বদলে আদায় করা হচ্ছে ৪ টাকা ৪৭ পয়সা হারে।

যাদের এই বিষয়টি দেখার কথা সেই বিআরটিএও শুধু ভাড়া নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। এটা কেউ মানছে কি না, তা দেখতে মাঠে দেখা যাচ্ছে না তাদের। সোমবার চট্টগ্রামে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে সাতটি বাসকে জরিমানা করেছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি- বি আরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ভাড়া নির্ধারণের পর আমরা বসে আছি, এই কথাটি ঠিক না। প্রতিদিনই আমরা ৮-১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। যারা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন তাদের জরিমানা করছি, গাড়ি ডাম্পিং করছি। ইতিমধ্যে ভাড়ার চার্ট সব জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তো এনফোর্সমেন্ট দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মানুষকে সচেতন হতে হবে, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও আইন মান্য করতে হবে। মোবাইল কোর্ট দিয়ে আমরা কয়টা বাস ধরতে পারব?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কোম্পানির ৮০-৯০টি বাসের মধ্যে একটি বাসকে জরিমানা করলে মালিকদের কী এসে যায়? এভাবে কাজ হবে না। খোদ রাজধানীতেই যদি এমন বিশৃঙ্খলা হয় তাহলে অন্য শহরগুলোর অবস্থা কী? যাত্রীরা কার কাছে বিচার চাইবে, তাও বুঝতে পারছে না। ফলে অধিকাংশ মানুষ বাসের মধ্যে কোনো ঝামেলায় না গিয়ে বাস স্টাফদের দাবি করা অতিরিক্ত টাকা দিয়েই নীরবে চলে যাচ্ছেন। দু-একজন যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের বাসের স্টাফদের কাছে নাজেহালও হতে হচ্ছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে রাজধানীতে বাস কমিয়ে দিয়েছেন মালিকেরা। ফলে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও বাস পাওয়া যাচ্ছে না।

গত সোমবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যাংক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলছিলেন, মালিকেরা ইচ্ছে করেই এখন বাস নামাচ্ছেন না। রাস্তায় বাস কম থাকলে যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করবে না। এই সুযোগে তারা অতিরিক্ত ভাড়াটাকেই নিয়মিত ভাড়া বানিয়ে তারপর রাস্তায় নামাবে বাস। ৯ মাস আগে একবার বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এখন আবার বাড়ানো হল। এই সময়ের মধ্যে কী আমাদের বেতন বেড়েছে? এভাবে সাধারণ মানুষ টিকবে কিভাবে?

অবশ্য বাংলাদেশ পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী ডয়চে ভেলেকে বলেন, রাস্তায় বাস কমানো হয়েছে, এটা ঠিক না। ২০১১ সালে বাসের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার। আর এখন বাস আছে  পাঁচ হাজার। এই ১১ বছরে ব্যাংক তুলে নিছে, নষ্ট হয়ে গেছে সব মিলিয়ে ছয় হাজার বাস নেই। ফলে বাসই কমে গেছে। ব্যবসা হচ্ছে না বলে মালিকেরা এখন আর নতুন বাস নামাতে চাইছেন না। সবাই তো খালি শ্রমিকদের দোষ দেয়, এখন মালিকেরা দৈনিক ভিত্তিতে একটা বাস চালক-সুপারভাইজারের কাছে ছেড়ে দিচ্ছেন। তুমি যাই আয় কর না কেন মালিককে আড়াই হাজার তিন হাজার টাকা দিতে হবে। শ্রমিকেরা করবে কি? টাকা তো তাকে তুলতে হবে। আবার সকালে বাস নিয়ে বের হওয়ার পর রাতে জমা দেওয়ার সময় বলছে আমার চাকরি নেই। চাকরির নিশ্চয়তা কে দেবে? আমরা তো বলছি, নিয়োগপত্র দেন, দৈনিক ভাড়ার চুক্তি বাদ দেন তাহলে দেখবেন দুর্ঘটনাও কমবে, শৃঙ্খলাও ফিরবে।

বিআরটিএর নির্ধারণ করা মহানগরীতে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। অর্থাৎ বর্ধিত ভাড়া অনুসারেই এই টাকায় চার কিলোমিটার পথ যাওয়ার কথা। মোহাম্মদপুর থেকে বনশ্রী রুটে চলাচল করা স্বাধীন পরিবহনের যাত্রী আমিরুল ইসলাম বললেন, মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত তিন দশমিক তিন কিলোমিটার। এখানে ভাড়া নিচ্ছে ১৫ টাকা। যা এতদিন আদায় করা হতো ১০ টাকা। সরকার নির্ধারিত বর্ধিত হারে এই ভাড়া এখন ১০ টাকাই হওয়ার কথা। কিন্তু বাসের স্টাফরা সেটা মানছেন না।

যাত্রীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, সরকার ভাড়া বাড়িয়েছে কিলোমিটার হিসাবে। রাজধানীর বাসে আগে যে বাড়তি ভাড়া নিত, তার সঙ্গে আবার নতুন করে পাঁচ থেকে ১০ টাকা যোগ করেছে। আমাদের অভিযোগটাও সেই জায়গায়। বি আরটিএর জরিমানায় কাজ হচ্ছে না। একটা পরিবহনের বাস যদি ৮০টি হয়, একটি বাসকে জরিমানা করল, তাহলে বাকি ৭৯টি বাস তো নৈরাজ্য চালাচ্ছেই। অতীতে যে রকম লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়েছে, ঐ ধরনের অভিযান দিয়ে এই অভিযোগ নিষ্পত্তি করা যাবে না। কোম্পানির প্রধানকে ধরে আনতে হবে। ধরে এনে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। বাস স্টপেজগুলোতে ডিজিটাল ভাড়ার তালিকা টানাতে হবে। বি আরটিএ যেটা ভাড়ার তালিকা দেয়, এটা তো সাধারণ যাত্রীরা বোঝে না। এই ধরনের গোঁজামিল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই গোঁজামিল অতিরিক্ত ভাড়াকে উৎসাহিত করে।

 

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সমীর কুমার দে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি