ঘুষের টাকা ফেরত চেয়ে লাশ বাসায় রেখে অনশন

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ১৪:০৭

চাকরির জন্য ঘুষের দেওয়া টাকা ফেরতসহ দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের প্রধানপাড়া দারুল ফালাহ দাখিল মাদরাসার সাবেক সভাপতি জুলফিকার আলী প্রধানের বাসায় লাশ রেখে অনশন করেছেন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) রাত ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই অনশন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ মিয়া।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘুষের টাকা দিয়ে ছেলে জাকিরুল ইসলামের চাকরি না হওয়ায় এবং ঘুষের টাকা উঠাতে না পারায় দবিরুল ইসলাম প্রধান (৫৫) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার মারা যান। খবর পেয়ে পঞ্চগড় থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যান। পরে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মিমাংসা শেষে রাত সাড়ে ৩টায় দবিরুলের পরিবারসহ স্থানীয়রা লাশ বাসায় নিয়ে যান। শুক্রবার (১২ আগস্ট) সকাল ১০টায় দবিরুল ইসলামের লাশ প্রধানপাড়া গোরস্থানে দাফন করা হয়। 

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, প্রধানপাড়া দাখিল মাদরাসার তৎকালীন সভাপতি ও হোটেল ব্যবসায়ী জুলফিকার আলম প্রধান ২ বছর আগে মাদরাসার সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে জাকিরুল ইসলামকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে দবিরুল ইসলাম প্রধানের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। গত দুই মাস আগে জুলফিকারের সভাপতির সময়সীমা শেষ হয়ে যায়। ছেলের চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত দিতে চাপ দেয় দবিরুল। কিন্তু জুলফিকার বিভিন্নভাবে হয়রানি ও টালবাহানা করে কালক্ষেপণ করে আসছিলেন। ২০/২৫ দিন আগে দবিরুল জুলফিকারের কাছে টাকা ফেরত চাইতে যান। এসময় জুলফিকার দবিরুলকে টাকা না দিয়ে উল্টো লাঞ্ছিত করেন এবং বাড়ি থেকে বের করে দেন। অপমান সইতে না পেরে বাড়ি এসেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হন দবিরুল। চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৭ আগস্ট আবারও হৃদরোগে আক্রান্ত হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রংপুর প্রাইম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুরে মারা যান দবিরুল। 

পরে সন্ধ্যায় লাশ নিয়ে মাদরাসার সাবেক সভাপতির বাসায় রাখা হয়। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত লাশ দাফন করা হবে না মর্মে হুমকি দেন দবিরুলের পরিবারসহ স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পঞ্চগড় থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যান। গভীর রাতে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মিমাংসার জন্য বৈঠক বসে। বৈঠকে ১২ লাখ টাকার মধ্যে ৬ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে অনশন প্রত্যাহার করেন এলাকাবাসী। নগদ ১ লাখ টাকা ও ৫ লাখ টাকার একটি চেক দিয়ে দুই মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধ করবেন মর্মে মুচলেকা দেন জুলফিকার। এরপর রাত সাড়ে ৩টায় স্থানীয়রা লাশ নিয়ে যান। শুক্রবার সকাল ১০টায় লাশ প্রধানপাড়া গোরস্থানে দাফন করা হয়। 

দবিরুল ইসলামের ছেলে আব্দুস সবুর প্রধান বলেন, ‘প্রধানপাড়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষক আমানুল্লাহ স্যারসহ বিভিন্ন ব্যক্তির উপস্থিতিতে আমার বাবা জুলফিকারের কাছে ১২ লাখ টাকা দিয়েছেন। টাকা উদ্ধারে সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি।’ 

দবিরুলের আরেক ছেলে জাকিরুল ইসলাম (চাকরি প্রত্যাশী) বলেন, ‘মাদরাসায় চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে জুলফিকারকে বাবা ১২ লাখ টাকা দিয়েছেন। জমি-জায়গা, গরু-ছাগলসহ প্রয়োজনীয় মালামাল বিক্রি করে জুলফিকারকে টাকা দিয়েছেন। কিন্তু সে আমার চাকরি দেয়নি, টাকাও ফেরত দিচ্ছে না। উল্টো বাবাকে লাঞ্ছিত করাসহ হয়রানি করেছে।’  

সাতমেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান। বিষয়টি উভয়পক্ষকে আলোচনা করে সমাধানের পরামর্শ দেন। 

বৈঠকে সাতমেরা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হেলালউদ্দীন, জগদল বাজার বণিক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর প্রধান, সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের, দবিরুল ইসলামের ভাই বদিরুল ইসলাম, ছেলে আব্দুস সবুর প্রধান, জুলফিকার আলী প্রধান (অভিযুক্ত), পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। রাত ৮টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত জুলফিকার ও তার পরিবারের লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে ছিলেন। 

পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ মিয়া বলেন, ‘লাশ রেখে অনশন করার বিষয় সম্পর্কে খবর পেয়ে পঞ্চগড় থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। গভীর রাতে উভয়পক্ষ বসে ৬ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া সাপেক্ষে বিষয়টির মীমাংসা হয়।’

ইত্তেফাক/মাহি