মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্মল হিথ পার্ক

বহির্বিশ্বে প্রথম পতাকা উত্তোলনের দাবি

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ১৭:১৮

কভেন্ট্রি রোডের পাশেই সবুজের আচ্ছাদনে সুবিশাল মাঠ। ছোট্ট একটা লেকও আছে। বিকালে বাচ্চাদের খেলাধুলা চলে নিত্য। বিশ্রামরত মানুষের দেখা মেলে দিনভর। পরিবারসহ সময় কাটাতে আসেন অনেকে। এখানে ঈদ জামাতও অনুষ্ঠিত হয়।

স্মল হিথ পার্ক নামেই এটি পরিচিত। এই পার্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। প্রতি বছর ২৮ মার্চ এখানে বার্মিংহাম, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডে থাকা হাজারো প্রবাসী বাঙালি একত্রিত হন। ২০১১ সাল থেকে নিয়মিত ২৮ মার্চ পতাকা উত্তোলন দিবস উদযাপন করেন স্থানীয় বাঙালিরা।

ইংল্যান্ডের বুকে অনেক জায়গায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান হয়। সেগুলোর তুলনায় স্মল হিথ পার্কের অনুষ্ঠানটা ঐতিহ্যবাহী এবং গৌবরের স্মারক। বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত এবং ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বহির্বিশ্বে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন হয়েছিল ভারতের কলকাতায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল সেখানে। এখনো প্রতি বছর দিবসটি উদযাপন করে কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশন।

তবে বার্মিংহামের স্থানীয় বাঙালি আশিক মিয়া ও হাসিব উদ্দিনের দাবি, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন হয়েছিল স্মল হিথ পার্কে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বার্মিংহাম, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের ১০ হাজার বাঙালি সমবেত হয়েছিলেন এই পার্কে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশ নিয়ে ইংল্যান্ডের দৈনিক গার্ডিয়ানেও খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সমাবেশে তত্কালীন পাকিস্তানি পাসপোর্ট জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালিরা। স্বাধীন দেশের স্বপ্নে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তারা। এমনকি তখন বার্মিংহামে থাকা পাকিস্তানিদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন বাঙালিরা। বহু লোক আহত হন সেই সমাবেশে, জেলে যেতে হয়েছিল অনেককে।

বার্মিংহামে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট ২৮ মার্চ উদযাপন পরিষদের বর্তমান সভাপতি তোজাম্মেল হক (টনি হক)। ১৯৭১ সালের সেই সমাবেশে ছিলেন তিনি। বাংলায় ও ইংরেজিতে বক্তব্য দিয়েছিলেন। বার্মিংহামেই থাকেন ৮২ বছর বয়সি এই কীর্তিমান বাঙালি। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স ও স্পেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন টনি হক।

স্মল হিথ পার্কের সেই সমাবেশের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরা প্রতি বছর ২৮ মার্চ এখানে জমায়েত হই। ১৯৭১ সালে এখানে মানুষ পাসপোর্ট জ্বালিয়েছে, সংঘর্ষ হয়েছে, আমরা পতাকা উত্তোলন করেছি। ইংল্যান্ডে আমাদের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিমও বিষয়টি অবগত। বার্মিংহামের সহকারী হাইকমিশনার আমাদের এখানে আসেন।’

বহির্বিশ্বে দেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনের স্বীকৃতি আদায়ের দাবি সরকারের কাছে জানিয়েছেন তারা। টনি হক বলেন, ‘আমরা এর স্বীকৃতি দাবি জানিয়েছি বাংলাদেশ সরকারের কাছে। আমরা হাইকমিশনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছি। সবাই বলে ভারতের কলকাতায় আগে হয়েছে। ওটা তো এপ্রিলে হয়েছে। আমাদের এখানে তো ২৮ মার্চ।’

হাসান হাফিজুর রহমানের স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৬ খণ্ডের দলিলপত্রের চতুর্থ খণ্ডে এই বার্মিংহামের স্মল হিথ পার্কের সমাবেশের কথা উল্লেখ রয়েছে। আবু সায়ীদ চৌধুরীর বইয়েও (মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি) লেখা আছে বিষয়টি।

টনি হক জানান, ইংল্যান্ড ভ্রমণে এসে ১৯৬৯ সালে বার্মিংহামের সিভিক হলে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে মিটিং করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরে ঘূর্ণিঝড়ের খবর পেয়ে দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

সহকারী হাইকমিশনার মোহাম্মদ আলিমুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘প্রতি বছর ২৮ মার্চ স্মল হিথ পার্কে একটা গণ জমায়েত হয়। আমরা অংশগ্রহণ করি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২৮ মার্চ এখানে বাঙালিদের সমাবেশ হয়েছিল। তাদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। আমরা এখানে একটা শহিদ মিনার চেষ্টা করছি।’

স্মল হিথ পার্কেই ভাষা শহিদদের সম্মানে শহিদ মিনার বানানোর প্রসঙ্গে ২৮ মার্চ উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মশুদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা শহিদ মিনার বানানোর অনুমতি পেয়েছি। আমাদের ফান্ডে ৭৩ হাজার পাউন্ড হয়ে গেছে। এটা করতে পারলে পাকিস্তানিদের সামনেই আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করব।’

ইত্তেফাক/এএএম