বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২, ২২:০২

ঘটনাটি ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিলের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য তিনি সেদিন একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বিল উত্থাপন করেন এবং এর মাধ্যমেই তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এভাবেই এই বাংলায় শুরু হয় জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্রের সফল অগ্রযাত্রা।

আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য বঙ্গবন্ধুর কত ধরনের অবদান রয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্রের প্রথিতযশা গবেষক-লেখক অনুপম হায়াত্ লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্র’ গ্রম্হটি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ গ্রম্হমালার অংশ হিসেবে ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত এই গ্রম্হটি মাত্র ৭১ পৃষ্ঠার হলেও এর প্রতিটি পৃষ্ঠাই কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যে ঋদ্ধ। ‘বঙ্গবন্ধু কর্তৃক চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্হা প্রতিষ্ঠা’ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে শুরু হয় প্রথম অধ্যায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা পাই ‘বঙ্গবন্ধুর আমলে চলচ্চিত্রের উন্নয়ন ও নানা প্রসঙ্গ’। চলচ্চিত্রে কীভাবে বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন তার বিস্তারিত বিস্ময় জাগানিয়া অধ্যায় সন্নিবিষ্ট হয়েছে তৃতীয় অধ্যায়ে। 

অধ্যায় চারে আমরা পাই ‘বঙ্গবন্ধুর সৃষ্ট পথে বিচ্ছুরিত আলোর মন্তাজ’। এরপর রয়েছে নাজীর আহমদের স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু, চলচ্চিত্রের উন্মেষ এবং এফডিসি-র প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত আলোচনা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চিত্র-প্রতিনিধিদলের সাক্ষাত্ এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিকাশকালে বঙ্গবন্ধুর কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে চিত্তাকর্ষক ঘটনার বিবৃতি। এর শিরোনামটাও চমত্কার: ‘অগ কইয়া দে, ওসব ছবি চলবো না বাংলাদেশে’। এই অংশটি অনুপম হায়াত্ সংকলিত করেছেন খান আতাউর রহমানের কলম থেকে।

পুরো গ্রম্হটি পড়ে আমরা উপলব্ধি করতে পারি সেই ১৯৫৭ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর সৃষ্ট পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প। তিনি যেমন ১৯৫৭ সালে এদেশে চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছেন তেমনি ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সালে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে চলচ্চিত্রের বিস্তার, উন্নয়ন ও প্রকাশ ঘটেছে নানা মাত্রায়। অন্যদিকে তাঁর বিস্ময়কর জীবন ও কর্ম চলচ্চিত্রের বিশাল পর্দায় দৃশ্য ও শব্দরূপের ব্যঞ্জনায় রূপায়িত হয়েছে : কখনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চিত্রে, কখনো প্রামাণ্য বা তথ্যচিত্রে। তারই প্রেরণা-উত্সে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, জীবনঘনিষ্ঠ ও শিল্পশোভন চলচ্চিত্র।

বলা যায় বঙ্গবন্ধু সৃষ্ট সেই প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গত ৬৫ বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প। এই গ্রম্হে একটি অংশে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ আলোচিত হয়েছে, যার শিরোনাম ‘অগ কইয়া দে, ওসব ছবি চলবো না বাংলাদেশে’। স্বাধীনতার আগে ঢাকায় পরিবেশক ও প্রযোজক ভিন্ন গোষ্ঠী ছিল। অধিকাংশ জাঁদরেল পরিবেশক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি। টিমটিম করে কয়েকঘর বাঙালি পরিবেশক ছিল। তখন প্রদর্শক ও পরিবেশকরা একজোট হয়ে বাংলাদেশে ছবি নির্মাণের বিরোধিতা করেছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর পশ্চিমা পরিবেশকরা পাততাড়ি গুটিয়ে করাচি, লাহোর চলে যান। তবু কিছু কিছু প্রাচীন প্রদর্শক-পরিবেশক ‘ভারত থেকে বৃটিশ ও পাকিস্তানি আমলে যে সমস্ত উর্দু ছবি আমদানি হয়েছিল, সেগুলো তো এখন বাংলাদেশি সম্পত্তি’—এই অজুহাতে সরকারের সম্মতি চেয়েছিল সেগুলো পুনরায় বাজারজাত করবার জন্যে। এফডিসি থেকে চলচ্চিত্র-কর্মীদের এক মিছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়েছিল এ সমস্যার সুরাহা করতে। এবং বঙ্গবন্ধু এক কথায় বলেছিলেন, ‘অগ কইয়া দে ওইসব ছবি চলবো না বাংলাদেশে।’

‘বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্র’ গ্রম্হটি একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু দূরদর্শিতা ও আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পাঠ। গুণী লেখক, চলচ্চিত্রবোদ্ধা ও নজরুল গবেষক অনুপম হায়াত্ এ গ্রম্হের জন্য অভিবাদন পেতেই পারেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন