মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রস 

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৩:৫৯

রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে প্রায় প্রত্যেক দিনই কিছু না-কিছু শিখি। রসবোধ বা সৌন্দর্যজ্ঞানের ৮০ শতাংশ রবীন্দ্রনাথ থেকেই পেয়েছি। ‘রস’ কাকে বলে, তা বোঝবার জন্য আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের এক অধ্যাপিকার সাহায্য নিয়েছিলাম। সেই অধ্যাপিকা বইপত্র বেঁধে রোববার-রোববার আমার বাড়ি এসে রসতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতেন—ঘটনাটা ২৫ বছর আগে ঘটেছে। মাস তিনেক তিনি আমাকে রসশিক্ষা দিয়েছিলেন—কিন্তু খোদা জানেন, আমি রসের কিছুই শিখে বা বুঝে উঠতে পারিনি। তখন মনে হলো, ‘রস’ ব্যাপারটা না বুঝে চলবে কেন? কিন্তু উপায়ই বা কী?

রবীন্দ্রনাথ পড়তে পড়তে একদিন একটি ছোট্ট লেখা চোখে পড়ল।

রচনাটির নাম রবীন্দ্রনাথ দিয়েছেন—‘রূপ’—তা এরকম

— ‘যেখানে জীবন আছে সেখানে রস আছে, এবং যেখানে রস আছে সেখানে অনুভূতি আছে। রসনায় রস আছে বলিয়াই আমরা আস্বাদন করিতে পারি এবং জারকরস আছে বলিয়াই জীর্ণ করিতে পারি। জারকরস যদি না থাকিত, তবে যে কেবল জীর্ণ করা হইত না তাহা নহে, সমূহ দুঃখ ও ব্যাধি উত্পন্ন হইত। লোচনে রস আছে, তাই দৃষ্টি সম্ভব। চর্মে রস আছে তাই স্পর্শসুখ। ব্যাধিবিশেষে যখন চর্ম রসহীন হয়, তখন আমাদের অনুভূতি চলিয়া যায়। আমরা তখন সেখানে মৃত। পক্ষাঘাত হইলে অঙ্গবিশেষ যে অনুভূতিহীনমাত্র হয় তাহা নহে—সকল অঙ্গের সে তখন বিষম ভার।’

পড়তে পড়তে মনে হলো, ‘রস’ কাকে বলে, আমি যেন অনেকখানি ধরতে পারছি। অনেকখানি না হোক, কতকটা তো পারছি।

এই রচনারই শেষ বা তৃতীয় প্যারায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন

— ‘এই বিশ্বজগৎ কেবলমাত্র মুক্তি বা শৃঙ্খলার জগৎ; ইহা জ্ঞানে রসে প্রেমে পরিপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক এই বিশ্ববিধানের মধ্যে কেবলমাত্র যুক্তিকে খুঁজিতেছেন, তাই পর্দার পর পর্দা কেবল যুক্তিকোষ খুলিতেছে—জগতের সার্বভৌমবোধ তাহার নাই। ইহা একটি সামান্য ক্ষতি নহে। আমাদের সাধনা হইবে—সমগ্রের সাধনা, সমঞ্জসের সাধনা। সর্বত্র রসকে সঞ্চার করিয়া সর্বত্র জীবনাধীন করিতে হইবে। সর্বত্রব্যাপ্ত আনন্দে আমাদের আত্মা, মন প্রাণ দেহ কৃতার্থ হইবে। ‘এষোহস্য পরমানন্দ’র কণামাত্র পাইয়া সন্তুষ্ট হইব না।’

রসকে সৃষ্টি ও জীবন-সমগ্রতায়, নৈসর্গিক সার্বভৌমত্বে দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু রসই যে অনুভূতির উত্স, সেটি তো আগে বোঝা চাই। ইন্দ্রিয়ানুভূতির মধ্যেই রস; মানুষের বাসনালোকেই রসের উৎপত্তি। যখন বলি, ‘আনন্দাশ্রু’—তখন তো রসকেই বোঝাই। বা অন্যের চোখে জল দেখে আমার চোখে যখন জল আসে—তখন সেই অনুভূতির নামই রস।

যা রসোত্তীর্ণ, তা মৃত্যুকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। একজন খাঁটি লেখক বা কবির কাছে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলির সংবেদন সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশি স্পষ্ট।

একবার সাগরদা (‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ) অমিয়ভূষণ মজুমদারের কাছে একটি গল্প চেয়ে চিঠি দিলেন—কিন্তু গল্প আসে না, কোনো চিঠিও আসে না। এলো ১ মাস বাদে। অমিয়ভূষণ দু’লাইনের একটি চিঠি দিয়েছেন সাগরদাকে। সেই চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন—তিনি অসুস্থ। এই অবস্থায় গল্প লিখলে, গল্পটি রুগ্ণ হবে।

চিঠিটা খুলতে হয়েছে আমাকেই। কারণ ‘দেশ’ পত্রিকার চিঠিপত্র বিভাগের সম্পাদক আমি।

চিঠিটা পড়ে অন্তত আধঘণ্টা আমার চেয়ারে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করেনি।

পাঠক! উদ্ধৃতাংশে লক্ষ করুন, ‘যেখানে রস আছে সেখানে অনুভূতি আছে।’ রস নেই, অনুভূতি নেই। অনুভব করার শক্তি কীসে বাড়ে, সেটাও দেখতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, যার কল্পনাশক্তি বেশি তার অনুভাবকতাও বেশি। তা হলে কল্পনাশক্তি বাড়বে কীসে? নিশ্চয় তা হলে অনুভাবকতা বাড়াতে হবে। সেজন্য রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, কল্পনারও শিক্ষা আবশ্যক। সৌন্দর্য ভোগের জন্যও শিক্ষা দরকার। অমিয়ভূষণের কাছেও আমি এক প্রকার শিক্ষালাভ করেছি। এ কথাও ঠিক যে, মধুসূদন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অবস্থায় মেঘনাদবধ কাব্য লিখে উঠতে পেরেছিলেন। কোনো রুগ্ণ অবস্থায় নয়—তখন কবির মন প্রেমে পূর্ণ ছিল।

কবি-শিল্পী-লেখকদের প্রধান কাজটি কী? মানুষের সৌন্দর্যবোধকে বাড়িয়ে দিয়ে মানুষকে আগের তুলনায় অধিক সংবেদনশীল করে তোলা—সহৃদয় সামাজিক হিসেবে মানুষকে আরো অনুভাবক করে দেওয়া। তার কল্পশক্তিকে আরো মার্জিত করে তোলা—সবই ঘটবে সৌন্দর্যবোধের উন্নততর রূপের মাধ্যমে।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘প্রকৃতির সৌন্দর্য সকলের চক্ষে কিছু সমান দেখায় না। সৌন্দর্য ভোগের জন্য শিক্ষা আবশ্যক। দার্জিলিং-এর শোভা ও সৌন্দর্য বিষয়ে শিক্ষিত ইংরাজ কিংবা বাঙালির যতটা জ্ঞান আছে, দার্জিলিংবাসী ভুটিয়াদের অবশ্য তার এক অংশও নেই।’

রবীন্দ্রনাথের এই পর্যবেক্ষণ মানব-মনস্তত্ত্বের চরম সীমা স্পর্শ করেছে।

ঐ রচনাতেই রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন—‘প্রত্যেক কবি লেখকে জগত্সুদ্ধ লোককে নিজের নিজের সৌন্দর্যজ্ঞানের উত্তরাধিকারী করে গেছেন। ক্রমে এই সূত্রে প্রচুর সৌন্দর্যজ্ঞান আজকাল সাহিত্যে এবং অত্ঃ-এ বদ্ধ রয়েছে, ইচ্ছা করিলেই তাহার আস্বাদ গ্রহণ করা যায়। সহিত্যচর্চা দ্বারা আমাদের সৌন্দর্যজ্ঞান বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, আমরা নূতন চোখে পৃথিবী দেখতে শিখি।’

বাঙালির সাহিত্যিক সৌন্দর্যজ্ঞান পৃথিবীর অনুভাবকতার নিরিখে অনন্য। কবি আল মাহমুদের গল্প ও কবিতার আমি ভক্ত। সম্ভবত তিনিই ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বা শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা। পশ্চিমবঙ্গে এই কবির গল্পেরও উপাসক রয়েছে। তাঁকে মৌলবাদী বলাটা পাপ। আমি আনন্দবাজারের একটি আলোচনায় এই কবিকে মৌলবাদী বলার প্রতিবাদ করেছিলাম।

তাঁর ‘নোলক’ কবিতার মৌলকত্বের কোনো তুলনা কোথাও মিলবে না।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ-কে মাথায় রেখেও বলছি, আল মাহমুদের গল্পগুলি নূতন সৌন্দর্যজ্ঞানের আধার। তাঁর কাছে শেখার কতকিছু আছে।

তাঁর অনুভাবকতা ও কল্পনার বিস্তার বিস্ময়কর। যদি কেউ বলে, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ছোটগল্প নতুন কোনো দ্বীপভূমি খুঁজে পেয়েছে কি না! জবাব হচ্ছে, অবশ্যই খুঁজে পেয়েছে। বিকেলের এক নক্ষত্রের কাছে দূরতর সেই মহিমুদ-দ্বীপটি জেগে রয়েছে।

আসুন, আমরা সেই দ্বীপে পাড়ি জমাই; রবীন্দ্র তিরোধান দিবসে এইই আমাদের এক উতল অভিযাত্রা।

জলবেশ্যার সেই নৌকোটা ফের জেগে উঠেছে। কাম আর মৃত্যুর গন্ধ! আল মাহমুদের অতিপ্রাকৃত চেতনা ইউরোপীয় কবিতা ও গল্পের চেয়েও তুখোড়।

ভেবে পাইনে, অমন প্রতিভা বাংলায় কী করে জন্মায়। কী করে উপেক্ষিত হয়!

কী করে সম্মানিতও হয়! সেলাম! মাহমুদ ভাই!

লেখক : প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, ভারত

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন