রোববার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নারায়ণগঞ্জে আতঙ্কের নাম কিশোর গ্যাং

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০৬:০৯

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে কিশোর গ্যাং একটি আতঙ্কের নাম। দিন দিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হচ্ছে ১৪ থেকে ১৭ বয়সি ছেলেদের সংঘবদ্ধ অপরাধপ্রবণতা, যা ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ। সম্প্রতি চাঁনমারি এলাকায় তাদের নৃশংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬ বছর বয়সি সজীব। সচেতন মহলের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, তা নাহলে কিশোরদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকবে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর অপরাধ অনেকটাই সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। তারা বড়দের সঙ্গে অসদাচরণ থেকে শুরু করে, সহপাঠী কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি, তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, অশ্লীলতা, ইভটিজিং এবং ছিনতাইয়ের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছে খুন ও ধর্ষণের মতো অপকর্মে। আবার ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের সঙ্গে সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গেও বাড়ছে তাদের একাংশের সংশ্লিষ্টতা। ৩১ জুলাই রাতে চাঁনমারি নীট হাউজের সামনে কিশোরদের দুই গ্রুপে সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় এক পক্ষের ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয় সজীবের। একই মাসের ২৭ জুলাই রাতে সিদ্ধিরগঞ্জে বাগমারা এলাকায় আট-দশ জন ‘কিশোরের’ সঙ্ঘবদ্ধ হামলায় প্রাণ হারায় ১৭ বছর বয়সি কলেজের ছাত্র ইমন।

এর আগে এ বছরের মে মাসের শুরু থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত কিশোরদের হামলায় খুন হয়েছে তিন জন। আহত হয়েছে আরো কয়েক জন। একই মাসের ১৬ তারিখ রাতে দেওভোগ এলাকার সুব্রত মণ্ডলকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাত করে বাসার সামনে ফেলে যায় একদল কিশোর। হাসপাতালে নেওয়ার ছয় দিন পর মারা যায় সুব্রত। এ ঘটনার এক দিন পর ১৭ মে ফতুল্লার ইসদাইর এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে খুন হয় দশম শ্রেণির ছাত্র দ্রুব চন্দ্র দাস। জানা যায়, এই হত্যার সঙ্গে জড়িতরাও স্কুল পড়ুয়া ছাত্র। এদিকে, গত ১৪ মে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর থানা এলাকায় তিনটি হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় দেওভোগ পানির ট্যাঙ্ক এলাকায় মিরাজুল ইসলাম দিপু, সিদ্ধিরগঞ্জে কলেজ শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন রিয়াদ ও বন্দরে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রিফাত ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা বেশির ভাগই ছিল কিশোর বয়সের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ‘অল্প বয়সেই ছেলেরা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে। এদের ‘কিশোর’ বলা হলেও মূলত এসব গ্রুপে কৈশোরের বয়স অতিক্রম করেছে, এমন সদস্যরাও রয়েছে। এদের মধ্যে যেমন স্কুলকলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রয়েছে, তেমনি আছে অছাত্ররাও। এছাড়া বিভিন্ন সময় কিশোরদের অস্ত্র বহন ও ব্যবহারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য, ছবি ও ভিডিও চিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে দেখা গেছে। এ ব্যাপারে শহরের কয়েক জন কিশোরের সঙ্গে কথা হলে তারা জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও নেতাদের সঙ্গে রয়েছে তাদের ভালো সম্পর্ক। আর নেতাদের সংস্পর্শে থাকলে তাদের কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। এছাড়া এলাকার বড় ভাইদের ক্ষমতা বলে তারা পুরো মহল্লা দাপিয়ে বেড়ায়।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেছেন, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশে খেলার মাঠের সংকট। প্রতিটা স্কুলের মাঠগুলো বন্ধ করে রাখা হয়। বাচ্চাদের মধ্যে কোনো সংস্কৃতিচর্চা নেই। তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক মাস্তান তাদেরকে অপব্যবহার করছে।

নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেছেন, কিশোর অপরাধ শুধু নারায়ণগঞ্জ না, সারা বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। কিছু কিছু বড় ভাই ও গডফাদার আছেন যারা তাদের লালনপালন করেন। তিনি বলেন, অপরাধ করার পরে এরা আইনগত একটি সুবিধা পায়, কারণ তারা কিশোর। জেলের পরিবর্তে তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেছেন, প্রতিটি পরিবারের বাবা মাকে তার সন্তানের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে। ছেলে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে ও কি করে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তা হলেই এই কিশোর অপরাধ আস্তে আস্ত অনেকটা কমে যাবে। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিছুর রহমান বলেছেন, আমরা সব সময় অভিযান পরিচালনা করছি। যারাই অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করছি। নারায়ণগঞ্জকে অপরাধমুক্ত করতে আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নাই। আমরা পর্যায়ক্রমে কাজ করছি।

ইত্তেফাক/ইআ