বুয়েটে সাবেকদের শোক সভা-বর্তমানদের ক্ষোভ, চলছে সমালোচনা

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ১৬:৫১

আগামীকাল ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। এ উপলক্ষে গত শনিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীরা 'সাবেক ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ' ব্যানারে কর্মসূচির আয়োজন করে। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। সেই জেরে 'রাজনীতিমুক্ত' ঘোষিত বুয়েটে শোক সভা পালন কর্মসূচিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে 'সাধারণ শিক্ষার্থী'রা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে আন্দোলনগুলোর পাশাপাশি ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিলো বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও বুয়েটে যারা আগে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা কী বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন না? এমন প্রশ্ন করছেন সাবেক বুয়েটিয়ানরা। সম্প্রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর দিন ও জাতীয় শোক দিবসকে কেন্দ্র করে বুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা এক শোকসভার আয়োজনের পর তা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে প্রশ্নটি তোলা হয়।

বুয়েট শিক্ষার্থীদের এমন পদক্ষেপের পক্ষে-বিপক্ষে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আয়োজিত এই শোকসভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী রওনক হাসান তার ফেসবুকে অনুষ্ঠানের এক ছবি পোস্ট করে লেখেন, বুয়েটের ছাত্রলীগের সাবেক নেতৃবৃন্দ (যাদের মধ্যে কয়েকজন ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন), যদি তাদের স্বপরিচয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে একসঙ্গে বসে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া অনুষ্ঠান করার অধিকার না থাকে, তাহলে তো খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার।

তিনি আরও লেখেন, সমবেত রানিং স্টুডেন্টরা শুধুই আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাইলেন, কিন্তু তার আগের দু'জনের (সাবেকুন নাহার সনি ও আরিফ রায়হান দিপ) হত্যার কথা বললেন না। আর এটাই হচ্ছে রাজনীতির খেলা, কোমলমতি ছাত্রদেরকে সামনে রেখে পেছন থেকে খেলছে বুয়েটের শিবির, ছাত্রদল ও মৌলবাদীরা। অনেকেই মনে করেন বুয়েট ক্যাম্পাস এখন রাজনীতিমুক্ত। আরে ভাইরে, চোখটা খুলেন, তাকিয়ে দেখেন বুয়েটে রাজনীতি বন্ধ নাই, বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি চলছে পূর্ণ গতিতে!

ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, এই রাজনীতি করছে শিবির, ছাত্রদল ও হিজবুত তাহরীর। এদের প্রত্যেকের সক্রিয় কমিটি আছে বুয়েটে। বুয়েট ছাত্রলীগকে বলির পাঁঠা বানিয়ে বুয়েটের প্রত্যেকটা হলে দুর্গ বানিয়ে ফেলেছে মৌলবাদীরা। ওরা এটাই কোমলমতি বুয়েটিয়ানদের মাথায় গেঁথে দিচ্ছে যে, ছাত্রলীগের কর্মীরা হচ্ছে "শুবুছালী" বা ''শু** বুয়েট ছাত্রলীগ"। কোমলমতি ছাত্রদের ব্রেন ওয়াশ করে ওদের দিয়েই জাতির জনক কে অপমান করার ফন্দি এঁটেছিলো ওরা। তবে আমি স্যালুট জানাই কয়েকজন রানিং ছাত্রকে, যারা আমাদের সামনেই পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টায় দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এ ঘটনার পর বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা তন্ময় আহমেদ বলেন, বুয়েটে সব আলোচিত ঘটনায়, সব আন্দোলন করে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা, একথা সত্য। কিন্তু পেছনে থেকে গোপনে বা প্রকাশ্যে পুরো কলকাঠি নাড়ে শিবির। অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমাদের সময় ২০১২ সালের ভিসি বিরোধী আন্দোলনে ‘সেভ আওয়ার বুয়েট’ নামের একটি ফেসবুক আইডিকে কে পীর মেনে পুরো আন্দোলন করেছিল সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা।

তিনি বলেন, বার বার কথা তোলার চেষ্টা হলেও কেউ বিশ্বাসই করতে চায়নি যে এটা শিবিরের কাজ, পুরো গেম তাদের সেট করা। দোষ দেই না কাউকে, পরে অবশ্য লজ্জা দিয়েছি। ৮ম ব্যাচের সিভিলের যেই ছেলে এই আইডি চালাতো, তার নাম শফিক। আন্দোলনের পরে সে আইডির নাম চেঞ্জ করে 'বেঙ্গল ফোর্ট’ নামে, সঙ্গে সঙ্গেই ধরা পড়ে যায় অনেক প্রগতিশীল মানুষের কাছে। এই শফিক রমনা থানায় আটকের পর তার রুম থেকে পাওয়া যায় একটি ডায়েরি। যাতে আইডি পাসওয়ার্ড সবই থাকায় এক্সেস নেওয়ার পর পুরো ঘটনা সামনে আসে।

এদিকে বুয়েটে এ ঘটনার সমালোচনা করেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে দেওয়া পোস্টে লেখেন, যে শিক্ষার্থীরা শোকসভার বিরোধিতা করে প্রতিবাদ করেছে, রাষ্ট্রীয় অর্থে তাদের পাঠদান চালিয়ে যাওয়া উচিৎ কিনা, সেই সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের নেওয়া প্রয়োজন। এটি প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমতূল্য অপরাধ।

বুয়েটে বিগত বছরগুলোতে সাবেকুন নাহার সনির স্মৃতিফলকে ছাত্রলীগ ছাড়াও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনগুলোও পুষ্পস্তাবক অর্পন করে আসছে। এ ছাড়াও বুয়েট ছাত্র নজরুল ইসলাম হলের রায়হান দীপের মামলা এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় এবং তার স্বঘোষিত খুনির বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা না করায় এ বিষয়ক অনলাইন আলোচনার পাশাপাশি একাধিকবার পুষ্পস্তাবক অর্পন করেন ছাত্রলীগ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাবেক নেতাকর্মীরা।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি