শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

৩ মন্ত্রীর সঙ্গে ব্যাচেলেটের বৈঠক: বিচারবহিভূ‌র্ত হত্যা, গুম, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:৩৯

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট গতকাল রবিবার (১৪ আগস্ট) ঢাকায় এসেছেন। সফরের প্রথমদিনে তিনি স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি মানাবধিকার সংক্রান্ত বেশ কিছু ইস্যুতে জানতে চান। মন্ত্রীরা এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

চার দিনের সফরে মিশেল ব্যাচেলেট গতকাল সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন তাকে স্বাগত জানান। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনারের এটাই প্রথম বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক সফর। দুপুরের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকোচন, সুশীল সমাজসহ মানবাধিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন ব্যাচেলেট। বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছি—গুম বলে আমাদের দেশে কোনো শব্দ নেই। তবে, কিছু কিছু লোক বলেছে যে, ৭৬ জন লোক গত ১০ বছরে নিখোঁজ হয়েছেন। তারা বলছে যে, সরকার নিখোঁজ করেছে। এই ৭৬ জনের মধ্যে ১০ জনকে পাওয়া গেছে, ঘোরাঘুরি করছে। বাকিগুলো আমরা ঠিক জানি না। তাদের তথ্য পেলে অবশ্যই আমরা তদন্ত করব। নিখোঁজদের বিষয়ে পরিবার কোনো তথ্য দেয় না। তারা ভয়ে তথ্য দেয় না। মন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর পুলিশ হাজারখানেক লোককে মেরে ফেলে। আমাদের দেশে আগে হতো এখন আর হার্টফেল নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে মোমেন বলেন, ২০০৮ সাল থেকে এরকম হত্যাকাণ্ডের কোনো খবর নেই। তবে এ ধরনের ঘটনা থাকলে সরকার তদন্ত করবে।

বঙ্গবন্ধুর খুনি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা আমাদের আইনের কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে, আইনের শাসনের কথা বলে তাদের দেশে আত্মস্বীকৃত খুনি ঘুরে বেড়ায়, বাজার করে, সন্তান নিয়ে সিনেমা হলে যায়। দেশে ফেরত এলে তাদের ফাঁসি হবে—এই অজুহাতে যদি ফেরত না পাঠান, তবে ঐ দেশের জেলে রাখেন না কেন। সেটাও তো করেন না।

মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘ খুব উদ্বিগ্ন। তারা রোহিঙ্গাদেরকে সাহায্য করতে এবং এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে থাকবে। আমরা বলেছি, রোহিঙ্গা আগেও এসেছিল বহুবার এবং ফেরত গেছে। এবারে সংখ্যা বেশি। তবে দুঃখের বিষয় যারা মানবাধিকারের জন্য শান্তি পুরস্কার পেয়েছে তারা মিয়ানমারের সঙ্গে আগের মতো সম্পর্ক বজায় রাখছে। চুটিয়ে ব্যবসা করছে এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ব্যবসা ১৫ গুণ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য বেড়েছে ১০০ গুণ। বিনিয়োগ হয়েছে গত পাঁচ-ছয় বছরে ২৩০ কোটি ডলার। আমরা বলেছি, আপনারা রাখাইনে গিয়ে সাহায্য করেন। মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, তারা (জাতিসংঘ) মনে করেন বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই এবং সরকার সেন্সরশিপ আরোপ করে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে মোমেন বলেন, আমি এমন কিছু দেখছি না, বাংলাদেশের গণমাধ্যম খুবই শক্তিশালী। ব্যাচেলেটকে বলেছি দেশে প্রতিদিন ২৮০০ সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। তারা মনে করে যে, আমাদের সুশীলসমাজ নেই। আমি বললাম, এখানে একটি শক্তিশালী সুশীলসমাজ আছে। বাংলাদেশে কয়েক হাজার এনজিও কাজ করছে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থায় মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চান মিশেল ব্যাচেলেট। আইনমন্ত্রী বলেন, হাইকমিশনার মুশতাক নিয়ে জানতে চেয়েছেন এবং আমি উত্তর দেওয়ার পরে আর কোনো প্রশ্ন করেননি।

বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি জোরালোভাবে এসেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণের বিষয়ে জোর দিয়েছি। আমরা বলেছি—আপনারা একটি প্রস্তাব পাঠান, আমরা বিবেচনা করব। আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছি যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার মানবাধিকারকে সাংঘাতিক গুরুত্ব দেয়। তার কারণ হচ্ছে—মানবাধিকার লংঘনের একজন ভিকটিম হলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। সেজন্য শেখ হাসিনার সরকার মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখবে। আইন দ্বারা কীভাবে এর লংঘন বন্ধ করা যায়, সেই বিষয়ে সরকার সক্রিয় থাকবে বলে জানান আইমন্ত্রী।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েও হাইকমিশনারকে বলা হয়েছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আমি একটি টিম করে দিয়েছি, যেখানে আইন সচিব সভাপতি এবং ঐ কমিটিতে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, আইসিটি ডিভিশনের প্রতিনিধিরা আছেন। এই কমিটি হাইকমিশনার অফিসের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আলোচনা করছেন এবং এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বের হয়েছে। আমি প্রতিবেদনটি দেখার পরে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেব সেটির সিদ্ধান্ত জানাব।

এরপর বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন মিশেল ব্যাচেলেট। বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি মিয়ানমার। এ বিষয়টি ব্যাচেলেটকে অবহিত করেছি। তিনি (ব্যাচেলেট) বলেছেন, মিয়ামারের অবস্থা ভালো নয় বলে রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে পারছে না দেশটিতে। তারা যাতে ফিরতে পারে এজন্য কাজ করছে জাতিসংঘ।

দেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে বলেন, এদের বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক অভিযোগ রয়েছে। অনেকের পারিবারিক অশান্তি রয়েছে। অনেকে স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে রয়েছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে ভালো করতে না পেরে, ঋণে জর্জরিত হয়ে ও নানা ঝামেলায় অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ ইচ্ছাকৃত গুম হলে তাকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

বিভিন্ন সময় গুম হওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, দেশে যারা ‘গুম দিবস’ পালন করে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন তারা একটি উদ্দেশ্য নিয়েই করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে তুলে নিয়ে গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করে থাকে।

 

ইত্তেফাক/ইআ