চিরজীবী বাংলাদেশ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ০২:৪৫

ভারতে চলেছে স্বাধীনতার ৭৫ বৎসর পূর্ণ হওয়ার অমৃত-উৎসব-সমারোহ। ১৫ই আগস্ট ভারতবাসী স্বাধীনতার আনন্দে পাগল হয়ে উঠবে। ভারতকে রোখা যাবে না। ভারতের চোখে আজ সবই অমৃতময়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এটাই যে, ৭৫ বৎসরে পৌঁছে ভারত তার রাষ্ট্রব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটিই খুইয়ে বসেছে—ভারতবর্ষে যথাযথ গণতন্ত্র নেই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও সত্য যে, ভারতবাসীর প্রবল চেষ্টাতেই গণতন্ত্র ফিরবে, ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটি তার মেরুদণ্ড ফিরে পাবে।

নানা ধর্ম, নানান ভাষা, বিচিত্র কালচার ও রহন-সহন মিলে যে ভারতীয় বহুত্ববাদ, তার জয়গান গেয়েই আমার জীবনের ৭২ বছর কেটে গিয়েছে। আমার জীবনের একটি আশ্চর্য দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। কী সেটা? দ্বন্দ্বটি হলো আমি কে?

আমার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় কী?

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে আমার সংযোগ কী ধরনের? স্বাধীন বাংলাদেশ আমাকে কতটা উৎফুল্ল করে? বুদ্ধির মুক্তি আমার পক্ষে কতটা জরুরি?

আমি ভারতীয় কত পার্সেন্ট?

আমি বাঙালি কত পার্সেন্ট?

আমি মুসলমান কত পার্সেন্ট?

আমি কে?

প্রধানতম প্রশ্নটি হলো ১৫ই আগস্ট আমি কেমন থাকি? মনমরা হয়ে থাকি, নাকি আনন্দে আত্মহারা হই? মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যু এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু—দুই জাতির পিতার মৃত্যু কি আমার কাছে সমান শোকাবহ?

‘হরিষে বিষাদ’ বলে বাংলা ভাষায় একটি ভাবুক শব্দ পাওয়া যায়। ১৫ই আগস্ট হলো আমার কাছে হরিষে বিষাদ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু এই পৃথিবীতে পাহাড়ের মতো ভারী।

এই রচনায় কতকগুলি সত্য স্বীকারোক্তি করা ভালো। হিন্দি হলো ভারতবর্ষের কোথাও ঘোষিত এবং কোথাও অঘোষিত রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তানের যেমন একটি রাষ্ট্রধর্ম আছে; ভারতভর্ষের তেমনি একটা রাষ্ট্রভাষা আছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে ভারতবর্ষের আসল কণ্ঠস্বরটি হবে হিন্দি। ‘এক দেশ, এক জবান’—এটিই হলো স্লোগান।

কথাটাকে আখবার-এ-মাশরিক উর্দু খবরের কাগজে ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রধানতম খবর হিসেবে শিরোনাম করেছে অমিত শাহের ঘোষণাকে অবলম্বন করে, আর তা হলো এরকম :

এক মুল্ক এক জবান হো :অমিত শাহ

অমিত শাহের ঘোষণার পাশেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যাপোধ্যায়ের মন্তব্য ছাপা হয়েছে ঐ উর্দু খবরের কাগজটির প্রথম পৃষ্ঠায়; মমতা বলেছেন

— দিগর জবানোঁকা ইহ্তিরাম জরুরি লেকিন

মাদরি জবান কি কিমত পর নহিঁ—মমতা

অর্থাৎ আমরা (বাঙালিরা) ভারতীয় সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু সেই শ্রদ্ধাপ্রদর্শন বাঙালির মাতৃভাষার মূল্যের বিনিময়ে নয়। কথাটি স্পষ্টত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হিন্দি ভাষাকে ঘিরে যে রাষ্ট্রীয় অস্মিতা তার পুরোপুরি বিরোধী।

আমি মমতার উক্তির অনুবাদে অনেকটা স্বাধীনতা নিয়েছি, যাতে বাঙালি পাঠকের বুঝতে সুবিধা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ঘোষিতভাবেই উর্দু ভাষারও মর্যাদা দাবি করে। উর্দু ভাষারও জন্মভূমি ভারতবর্ষ; কিন্তু অমিত শাহের কথা অন্য; তিনি উর্দু ভাষাকে দেশছাড়া করতে চান। এ বিষয়ে উর্দু সংবাদপত্রে নানান প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছে। উদু‌র্র কথা যদি ধরি, তাহলে বলতেই হয়, বাওয়াতনকে অমিত বেওয়াতন করে দিতে চাইছেন। বাওয়াতন মানে ওয়াতনের সঙ্গে যে রয়েছে, অর্থাৎ—যার দেশ রয়েছে। বেওয়াতন মানে যে ওয়াতন হারিয়েছে, যার ওয়াতন নেই। এই যে হিন্দি-উর্দু সংঘাত, হিন্দি-বাংলা সংঘাত—এইসব সহ্য করেই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু-মুসলিম-বাঙালি মাতৃভাষার জন্য লড়াই করে চলেছে। হিন্দি আধিপত্যবাদ এক প্রবল রূপ ধারণ করেছে। হিন্দি ও ইংরেজির মাঝখানে সাংঘাতিক চাপের মুখে বাংলা ভাষা এই বাংলায় বিপন্ন। এই অবস্থায় মাতৃভাষার জন্য লড়াই করার প্রেরণা বাংলাদেশ থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকে সংগ্রহ করে নিতে হয়।

মুজিবুর রহমানের উক্তি মনে পড়ে।

শেখ মুজিব ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের একজন (১১ই মার্চ ১৯৪৮)। ১৯৫৫ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তান গণপরিষদের বাংলা ভাষার প্রশ্নে তার প্রদত্ত ভাষণ ছিল আবেগসম্মত অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি মাতৃভাষার বক্তব্য রাখার অধিকার দাবি করে বলেছিলেন, ‘আমরা এখানে বাংলায় কথা বলতে চাই। আমরা অন্য কোনো ভাষা জানি কি জানি না, তাতে কিছুই যায়-আসে না। যদি মনে হয়, আমরা বাংলাতে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি, তাহলে ইংরেজিতে কথা বলতে পারা সত্ত্বেও আমরা সব সময় বাংলাতেই কথা বলব। যদি বাংলায় কথা বলতে দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা পরিষদ থেকে বেরিয়ে যাব। কিন্তু পরিষদে বাংলায় কথা বলতে দিতে হবে। এটাই আমাদের দাবি।’

আমি মনে করি, মুজিবের কথায় সব বাঙালির চলা উচিত। আজ মুজিব-মন্ত্রেই প্রকৃত দীক্ষা জরুরি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বাংলা ছেড়ে হিন্দি ও ইংরেজি বলতে ওস্তাদ। বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করতে পারলে তার জন্য পুরস্কার ও অলিখিত সম্মান বরাদ্দ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি একটি তেআশলা জাতি।

আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আগত লেখকদের সঙ্গে কথা বলি, তখন বুঝতে পারি, তাদের মুখের ভাষার মধ্যেও মিশে আছে মুজিবের ভাষা-সংস্কৃতির সুর; মাতৃভাষাকে ভালোবাসার অদম্য উত্সাহ প্রতি লব্জে ভাষার প্রতি, মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর মমতা। এই বিষয়টি আমরা কখনো ভেবে দেখিনি। বাংলাদেশের মানুষ ইংরেজি জানা সত্ত্বেও ইংরেজিকে হটিয়ে রেখে নির্ভেজাল বাংলায় কথা বলে।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির ভাষাচর্চা বামফ্রন্টের আমলে এমনই জখম হয়ে গিয়েছে যে বলার নয়। ভাষা শিক্ষার গুরুত্বই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ঐ আমলে। তিন দশক ধরে ভাষা শিক্ষা মার খেয়েছে। ইংরেজি এবং বাংলা দুটোকেই থাপ্পড় মেরে ঠান্ডা করে দেওয়া হয়েছিল। গরিব মানুষের এক্তিয়ারেই রাখাই হয়নি ভাষাকে।

ভাষাচর্চা দুর্বল হয়ে পড়লে সাহিত্য দুর্বল হয়ে পড়ে। যে ভাষা রবীন্দ্রনাথের হাতে বিশ্বসম্মানের অধিকারী হয়েছিল, বলা উচিত, যে সাহিত্য বিশ্বস্বীকৃতি করায়ত্ত করেছিল সেই ভাষাও সাহিত্য মুখ্যত সেই ভাষা বাংলাদেশের জন্য দুটি বিশ্বখেতাব এনে দিয়ছে ২১শে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর সকল ভাষার মাতৃভাষা দিবস আর বাংলাই পৃথিবীর মধুরতম ভাষা।

‘২১শে ফেব্রুয়ারি’ দিনটি পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে উদযাপিত হয়ে থাকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত গর্বের এই দিনটি সরকারিভাবে পালন করেন; ভাষাশহিদদের স্মরণ করেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তার সর্বাধিক প্রিয়। কথাগুলি মোটে বাড়তি কথা নয়। ‘জয়হিন্দ’ বলার পর মমতার বক্তৃতার শেষ লব্জটি হলো ‘জয় বাংলা’।

তারপর সভা ভঙ্গ হয়ে যায়।

মুজিবের ‘স্পিরিট’ কোথাও পশ্চিমবঙ্গের জিহ্বায় রসনার রসের মতো জবানে-জবানে জড়িত হয়ে রয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতে চান, আমরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভারতীয় বটে, কিন্তু মজ্জার গভীরে মর্মে মর্মে অন্তগূ‌র্ঢ় চেতনায় আমরা পুরোপুরি বাঙালি—বাংলার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-জৈন-খিষ্টান বাঙালি আগে, তারপর অন্যকিছু। একজন কাশ্মীরি যেমন ভারতীয় হয়েও কাশ্মীরি, প্রবল আবেগে কাশ্মীরি—আমরাও সেই রকম, যাই-ই কেন হই, বাঙালি ছাড়া অন্য কিছু নই। রবীন্দ্র-নজরুল-নেতাজি-শেখ মুজিব বাদ দিয়ে আমরা আমাদের একটি পদক্ষেপও নিতে প্রস্ত্তত নই।

চাই রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ধর্মনিরপেক্ষ ঔদার্য; সকল ধর্মকে ভালোবাসার শক্তি। মুজিবের আদর্শের পূর্ণ বিকাশ হোক চাই। তার আর্দশেরই সবচেয়ে সাহসী প্রতিরূপ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—তিনিই বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের সম্মানে বসিয়েছেন। আশা করা যায়, আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশে উন্নত দেশের তকমা পেয়ে যাবে।

যখনই মুজিব পরিবারটির কথা ভাবি, তখন বুকের মধ্যে এমন এক বিষাদ জমে ওঠে এবং কষ্ট হয় যে, তার কোনো ভাষা আমার কলমে নেই।

ভারতবর্ষে থাকলে মহাত্মা গান্ধীর বিষাদ-মৃত্যুর জন্য কষ্ট পাব—নাথুরাম গডসে এখন একজন দেশপ্রেমিক—তার নামে রেলওয়ে স্টেশনে হয়েছে। জয় ভারত।

কী বিচিত্র এই দেশ!

কী বিচিত্র বাংলাদেশ!

১৫ আগস্টের মহাবিষাদের অন্ধকারেই সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষা করে রয়েছে বাঙালি জাতি। জয় বাংলা।

বিষাদ পেরিয়েই তো স্বর্গের ঠিকানা।

এসো বলি, মুজিবের অপরাজেয় আদর্শ ও শক্তির জয়। তার ত্যাগ ও আত্মত্যাগ চিরজীবী হয়ে রয়ে গেছে বাংলার প্রাঙ্গণে-প্রাঙ্গণে।

হ লেখক :ভারতের কথাসাহিত্যিক

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন