মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সাক্ষাৎকার: স্থপতি এহসান খান

চিরায়ত স্থাপত্যে চিরন্তন মুজিব

দেশের খ্যাতনামা স্থপতিদের মধ্যে অন্যতম এহসান খান। টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ, হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্প, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধ, গুলশান-বনানী লেক ব্রিজসহ বিভিন্ন প্রকল্প ও স্থাপনার নকশা প্রণয়ন করেছেন তিনি। তবে, জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধের নকশা প্রণয়নের কাজটিকেই এগিয়ে রাখেন। আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস ও  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম শাহাদত বার্ষিকী। দিনটিকে উপলক্ষ করে ইত্তেফাক অনলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্থপতি এহসান খান তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধের নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণের পেছনের গল্প।

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ০২:২৫

ইত্তেফাক: স্থপতিরা পরিবেশ-প্রকৃতির পাশাপাশি জীবনযাত্রা, জীবনবোধ ও ইতিহাসকে ব্যাপক গুরুত্ব দেন। সেই বিবেচনায় টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ নির্মাণের পেছনে প্রেরণা কী ছিল?

স্থপতি এহসান খান: বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত গোপালগঞ্জ জেলার এক ছায়া সুনিবিড় গ্রাম টুঙ্গিপাড়া।  লোকশ্রুতি আছে, পারস্য এলাকা থেকে আসা একদল মুসলিম সাধক এককালে এই এলাকায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। নিচু প্লাবিত এলাকায় তাঁরা টংঘর বেঁধে বসবাস করতে শুরু করেন। ঘটনাক্রমে 'টং' থেকেই নাম হয় 'টুঙ্গিপাড়া'। কালের বিবর্তনে স্থাপনার ধরন বদলেছে, তৈরি হয়েছে পাকা দালানকোঠা, তবে এখনো অধিকাংশ জায়গাজুড়েই অবস্থান করছে নিচু ঘরবাড়ি। কিছু কিছু জায়গায় এখনো টংঘরের প্রচলন আছে। একসময় এই এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান উপায় ছিল নৌপথ। আর তাই ঢাকা থেকে যখন বঙ্গবন্ধু বাড়ি যেতেন, তখন তাঁর বাহন হতো স্টিমার। গোপালগঞ্জে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর অন্যতম হল মধুমতী ও বাঘিয়ার। এ নদী দুটি টুঙ্গিপাড়ার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে। বঙ্গবন্ধু স্টিমারে করে এসে এই নদীগুলোর ঘাটেই নামতেন। বাড়ি যেতেন পায়ে হেঁটে। পথে যেতে যেতে মিশে যেতেন গ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে।

সমাধিসৌধের অভ্যন্তরে, মা-বাবার কবরের পাশে শায়িত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামেই কাটিয়েছেন দুরন্ত শৈশব আর কৈশোর। সবুজে ঘেরা, ছায়াঢাকা গ্রামের মানুষের সরলতা তাঁর মানসগঠন তৈরি করেছে অদ্ভুত সারল্যে। যে কারণে একসময় দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি ছিলেন খুব সাধারণ। গ্রামের বাড়ির পেছনে বয়ে যাওয়া খালের পাড় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এক হিজলগাছের তলা ছিল তাঁর আড্ডার জায়গা। এখানে বসেই গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন তিনি। ধারণা করা হয়, গ্রাম্য পরিবেশের সহজ-সরল রূপটিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছিল। একসময় দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে পরাধীন আর দ্বিধাগ্রস্ত বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রায় অসম্ভব কাজটিই সম্ভব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এসব গৌরবগাথা আমাদের সবার জানা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে সামনে নিয়ে পুরো দেশ নতুনভাবে গড়ে ওঠার যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় থমকে দিলো সেই স্বপ্নযাত্রা। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ভোররাতে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের দ্বারা নৃশংস, নির্মম একটি হত্যাকাণ্ড অপূরণীয় ক্ষতি করল পুরো জাতির। ইতিহাসে আরও অনেক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন, কিন্তু কাউকেই বঙ্গবন্ধুর মতো করে সপরিবারে নির্মমতার শিকার হতে হয়নি। অথচ বাংলার প্রতিটি মানুষই যেন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বজন। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি বঙ্গভবনে থাকেননি, থেকেছেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের অরক্ষিত বাড়িতে। সেখানেই তিনি প্রাণ দিলেন। স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, শিশুপুত্র, সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করা হলো। বুলেটের গুলিতে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির জানালার কাঁচ, দেয়াল ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল। সিঁড়িতে পড়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর লাশ। যে টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে তৈরি হয়েছিলেন এই মহান নেতা, সেখানেই তিনি ফিরলেন শেষ শয্যায়। নিজ বাড়ির কাছে মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে। এইযে জীবনজুড়ে তাঁর সরলতা, সেটিই আমাদের প্রেরণা।


ইত্তেফাক: জাতির পিতার সমাধিসৌধের নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব কীভাবে পেলেন?

স্থপতি এহসান খান: আমরা জানি, পচাত্তর-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা ওলটপালট হয়। উর্দিপরা শাসকরা ক্ষমতায় আসে। একসময় তারাও ক্ষমতা ছাড়ে। সপরিবারে পিতাকে হারানোর শোকের দহনকে শক্তিতে পরিণত করে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি প্রবাসী। দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন। পুনরুজ্জীবিত করতে চান বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন।

এসব কথার অবতারণা বঙ্গবন্ধু বা বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে নয়। বরং বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল করে রাখা দুটি স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত হবার যে সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিল, তারই কিছুটা তুলে ধরা। ১৯৯৪ সালে শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলীয় নেত্রী, ওই সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন ধানমণ্ডি ৩২-এর বাড়িকে উন্মুক্ত করবেন জনসাধারণের জন্য। গড়ে তোলা হবে জাদুঘর।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে একটি স্থাপত্য নকশা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরিকল্পনা বাছাই করা হয়। এতে নির্বাচিত হই আমরা। আমরা, অর্থাৎ আমি স্থপতি এহসান খান, স্থপতি ইশতিয়াক জহির ও স্থপতি ইকবাল হাবিব। বুয়েট থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করার পর আমরা তখন 'ভিত্তি স্থপতি' প্রতিষ্ঠা করে একসঙ্গে কাজ করছি। সেবার বঙ্গবন্ধুর বাড়িটিকে একটি জাদুঘরে রূপ দেওয়ার পরের বছর শেখ হাসিনা আমাদের ডেকে নিলেন টুঙ্গিপাড়ায়। বললেন, নিজেদের বাড়ি, বঙ্গবন্ধুর কবর ও চারপাশের এলাকা ঘিরে তৈরি করবেন সমাধি কমপ্লেক্স। বঙ্গবন্ধুকন্যা ধারণা দিলেন, এমন একটি স্থাপনা এখানে তৈরি করতে হবে, যা হবে টুঙ্গিপাড়ার পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুরো স্থাপনাটি সাধারণ মানুষকে সাদরে সম্ভাষণ জানাবে। এতে এলাকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা যাবে না। এটি যেন মিশে যায় টুঙ্গিপাড়ার প্রকৃতির সঙ্গে।

সমাধিসৌধের ছাদ ও দেয়ালের মধ্য দিয়ে আবছাভাবে দিনের আলো প্রবেশ করে। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, সে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। আবারও আমরাই নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব পেলাম। যে বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে স্বাধীন দেশ উপহার দিলেন, ঘাতকের গুলিতে অকালে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে—এ আমাদের পরম দুর্ভাগ্য। তাঁর সমাধিসৌধ তৈরির কাজটিও বেদনার। কিন্তু, মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে বঙ্গবন্ধু যে অমর কীর্তি গড়ে গেছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে এ স্থাপনা, তাই সেই নকশা তৈরির দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টিও আমাদের জন্য গৌরব ও প্রেরণার কারণ হলো। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পুরো স্থাপনার আদ্যপান্ত নিয়ে আমরা গভীর চিন্তায় মগ্ন হই।


ইত্তেফাক: নকশা তৈরির দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রাথমিকভাবে কোন বিষয়গুলো মাথায় রেখেছেন?

স্থপতি এহসান খান: বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করতে দেশবিদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের আনাগোনা ছিল টুঙ্গিপাড়ায়। তারা যেন এখানে এসে এ এলাকার প্রকৃতি ও বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠার পুরো পথপরিক্রমাকে উপলব্ধি করতে পারে, সেই ভাবনার সঙ্গে স্থাপত্যের নিবিড় যোগসূত্র ঘটানোই ছিল এই প্রকল্পের প্রধান কাজ। পুরনো বাড়িটি সংরক্ষণ, কবরকে বাঁধাই করা ছাড়াও মসজিদ, গবেষণাগার নির্মাণ, জাদুঘর, দর্শনার্থীদের ব্যবহার্য নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয় পরিকল্পনায়।

Conceptual Sketch

১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় এটি নির্মাণের। স্থাপনার অভ্যন্তরে ভাবগম্ভীর আবহে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার পরিবেশ, চারপাশের ঘনবসতির সঙ্গে এর সংমিশ্রণ, দর্শনার্থীদের জমায়েতের স্থান, কবর জিয়ারতের জন্য নিরিবিলি প্রাঙ্গণ তৈরি—এসকল বিষয়ে প্রাথমিক নির্দেশনা দেন শেখ হাসিনা। তিনি আরও বলেন, এই স্থাপনাটি এমন হওয়া চাই, যা গ্রামের গাছগাছালি ও প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ন রেখে পরিবেশের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করবে। চিরায়ত স্থাপত্যের মাঝে চিরন্তন হয়ে থাকবেন মুজিব, অম্লান থাকবে তাঁর চেতনা। বঙ্গবন্ধুকন্যার ভাষ্য ছিল, অতিরিক্ত আলোর ঝলকানিতে পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না।  সমাধিতে যেন ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যায়, যেমনটা গ্রামে সচরাচর শোনা যায়। তাঁর নিজ হাতে আঁকা খসড়া ধারণা অনুযায়ী আমাদের পরিকল্পনা ক্রমে চূড়ান্ত রূপ নেয়। বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শনে যে সরলতা ছিল, নকশার ক্ষেত্রেও সেটি হয়ে দাঁড়ায় আমাদের প্রধান উপজীব্য।


ইত্তেফাক: বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রত্যাশা অনুযায়ী পুরো কমপ্লেক্সের নকশায় কি কি অন্তর্ভুক্ত করা হয়? কোন ধরনের উপকরণকে প্রাধান্য দিয়েছেন?

স্থপতি এহসান খান: স্থাপত্যের ভাষায় 'ক্ল্যারিটি অব ল্যাঙ্গুয়েজ' বলে একটা কথা আছে, যা জ্যামিতিক আকার-আকৃতি, স্থাপনার ধরন ও উপকরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দেশীয় উপকরণ ও উপাদান, যেমন মাটির তৈরি ইট ও কংক্রিট ব্যবহারের পাশাপাশি আমরা এটিকে টেকসই স্থাপত্য হিসেবে গড়ার দিকেও জোর দেই। গ্রামের যে মেঠোপথ ধরে হেঁটে হেঁটে বঙ্গবন্ধু মানুষের সঙ্গে মিশে যেতেন, তারই বিমূর্ত রূপ নেয় এই সমাধিক্ষেত্রের অভ্যন্তরের পায়ে হাঁটা পথ। গাছের ছায়ায় ঘেরা সে পথ ধরে দুটি অংশে বিভক্ত হয় পুরো কমপ্লেক্সটি। হাজারও মানুষের পদচারণাকে সম্ভাষণ জানাতে বাইরের অংশে তৈরি করা হয় বড় পরিসরের এক উঠান। সেটির অবস্থান বঙ্গবন্ধুর কবর থেকে দক্ষিণ-পূর্বে। এর চারপাশে রয়েছে পাঠাগার, গবেষণাকেন্দ্র, প্রদর্শনী হল, পাবলিক প্লাজা, প্রশাসনিক ব্লক, মসজিদ, তথ্য কেন্দ্র, ক্যাফেটেরিয়া, বকুলতলা চত্বর, উন্মুক্ত মঞ্চ, স্যুভেনির কর্নার, ইত্যাদি। এখানে বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান ও সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সমাধিসৌধ নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নিজ হাতে লেখা প্রত্যাশার কথা। ডানের ছবিতে স্থপতিদের তৈরি মাস্টারপ্ল্যান। সৌজন্যে: স্থপতি এহসান খান

গণজমায়েতের পর পায়ে হাঁটার পথ ধরে মানুষ প্রবেশ করবে ভেতরের উঠোনে। এই পথে হাঁটতেই হাঁটতেই জাগ্রত হবে ভিন্ন এক অনুভূতি। ভেতরের উঠোনটির কেন্দ্রে বৃত্তাকার একটি স্থাপনার মাঝেই শায়িত আছেন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পিতা-মাতা। সামনে বেদী, যেখানে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক রাখা হয়। কংক্রিটের স্থাপনাটির দেয়ালগুলোতে একধরনের জালি ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দিনের শুরু থেকে শেষ অবধি বাতাস প্রবেশ করে এবং নানাভাবে আলোছায়া খেলা করে। তাছাড়া, এই অংশের কাঠামোটিকে পুরকৌশলের ভাষায় বলা হয় 'শেল স্ট্রাকচার', যার ওপর বসানো হয়েছে গম্বুজাকৃতির ছাদ। এটি স্থাপনাটিকে আরও অর্থবহ ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ এনে দিয়েছে। লেখার ভাষার মতো করে রঙেরও একটা ভাষা রয়েছে। সাদা ও কালো সময়োত্তীর্ণ দুটি রঙ। এই দুটির মিশ্রণে তৈরি হয় ধূসর। কংক্রিটের রঙ ধূসর। ধূসর ও সাদা সিমেন্ট ব্যবহার করে উজ্জ্বল কংক্রিট তৈরি করা হয়েছে সমাধিসৌধের জন্য। আর সমাধির অংশে সাদা-কালো মার্বেলের কারুকার্যে ফুটে উঠেছে বেদনার চিহ্ন। কমপ্লেক্সটির আরও একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি তৈরিতে স্বেচ্ছায় কাজ করেছেন গ্রামের অনেক মানুষ। অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বাড়তি জমি দিয়েছেন এর পরিধি আরও বিস্তৃত করতে।

স্থপতি এহসান খান। ছবি: সংগৃহীত


ইত্তেফাক: বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে এই স্থাপনাও গভীর অর্থ বহন করছে। এ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

স্থপতি এহসান খান: বঙ্গবন্ধুর নাতিদীর্ঘ অথচ চির উজ্জ্বল জীবনধারার সঙ্গে টুঙ্গিপাড়া গ্রাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ত্যাগকে চির অম্লান করে রাখতেই বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধকে কেন্দ্র করে গড়া হয় সমাধি কমপ্লেক্স। একাত্তরে পরাজিত হায়েনারা বাঙালির উত্থান ও স্বাধীনতা মেনে নিতে না পেরেই ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি করে, পঁচাত্তরে হত্যা করে শেখ মুজিবকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নাম তো কখনো মুছে ফেলা যাবে না, তাতে তারা সফলও হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অমর, অক্ষয় তাঁর কীর্তি। তাঁর কীর্তি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায় চির অম্লান হয়ে থাকবে।

বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটাকে নতুন করে সাজানোর জন্য কাজ করছিলেন, তখনই তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে গিয়ে আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে শতবছর। সেই ধাক্কা বঙ্গবন্ধুকন্যা খানিকটা কাটিয়ে উঠতে পারলেও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে আরও বহুদিন প্রয়োজন। দুঃখ-দুর্দশার গল্প শেষ হয়নি। তবে বাঙালি শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগোবার স্বপ্ন দেখে। একদিন নিশ্চয়ই পূরণ হবে জাতির পিতার স্বপ্ন। আর সেই পথচলায় প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন বঙ্গবন্ধু, যার চেতনার ক্ষুদ্র এক প্রতিফলন হয়ে থাকবে এই সমাধি।

ইত্তেফাক/এসটিএম