মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মৃত্যু নেই

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ০৪:৫২

১৫ আগস্ট। বাঙালি তথা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক দিন। যে মানুষটা আজীবন বাঙালি জাতির স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, জেল-জুলুম আর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, দীর্ঘদিনের নির্যাতন আর বৈষম্যের কাঁটাতার উপড়ে ফেলে যে মানুষটা পরাধীন জাতির ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার সোনালি সূর্যোদয় ঘটিয়েছিলেন, দেশের সেচছ একজন হয়েও যিনি তার দুয়ার সর্বদা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন, রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও যিনি জনতার মধ্য থেকে দেশ পরিচালনা করতেন—সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিদ্ধ হতে হয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকের নির্মম বুলেটে। দেশ এবং জাতিকে ভালোবাসার করুণ পরিণতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি। এরচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায় একটি জাতির জীবনে আর কিছু হতে পারে না।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলার গণমানুষের নেতা। তাই পরাধীন বাঙালি জাতি যখন পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতন আর জুলুমে নিষ্পেষিত, তখন তিনিই জাতিকে মুক্ত করার গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার প্রতিবাদে আন্দোলন, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ’৭১-এর ৭ই মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা এবং ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশকে শত্রুমুক্ত করার প্রতিটি আন্দোলনের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের এই পথ-পরিক্রমা মোটেই সহজ ছিল না। তবে বঙ্গবন্ধুর দুঃসাহসী নেতৃত্ব আর ইস্পাতকঠিন মনোবলই এদেশকে স্বাধীনতা দিয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে, শাসকগোষ্ঠীর চোখে চোখ রেখে স্বাধীনতার কথা বলা নেতৃত্ব পৃথিবীতে বারবার আসে না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই ক্ষণজন্মাদের একজন। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল মানুষকে ভালোবাসতে পারা। অতি সহজেই তিনি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। মানুষের দুঃখদুর্দশা তাকে আঘাত করত। তাই যখন স্বাধীনতার পর ঘাতকের বন্দিখানা থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে ফিরলেন তখন মানুষের দুর্দশা আর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চিত্র দেখে তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। হাতে নেন দেশ পুনর্গঠনের কাজ। কীভাবে জাতির জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো যায়। একটু একটু করে বাস্তবায়ন ঘটাতে লাগলেন সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের। সেই কাজে যখন তিনি মশগুল তখন গোপনে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ডানা মেলতে শুরু করেছে। বাঙালি জাতিকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন যে, নিজের নিরাপত্তার কথা তিনি কখনো ভাবেননি। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন নিজের দরজা। আর সেই সুযোগকেই পুঁজি করল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে দুর্বল দিক বাঙালি জাতির প্রতি তার ভালোবাসা-বিশ্বাসকে বেছে নিল তারা। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার অর্জনকে, জাতির উন্নয়নকে বানচাল করে দিতে কাপুরুষের মতো পেছন থেকে আঘাত হানল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে তারা ষড়যন্ত্রের নীল-নকশা মোতাবেক আক্রমণ করল বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি। নির্মমভাবে হত্যা করল বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতাকে। বাঙালি জাতির জীবনে রচিত হলো এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের। সেদিনের সেই ষড়যন্ত্রের রাতে ঘাতকবাহিনী বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে ছাড় দেয়নি ঘাতকের নির্মম বুলেট। শুধু তাই নয় খুনীদেরকে বাঁচাতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে ক্ষমতা দখলকারী পরবর্তী সরকার।

তবে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বোঝেনি সীসার গোলক কখনো আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এমন এক অনুভূতি যাকে দাবায়ে রাখা অসম্ভব। সেই আদর্শকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কর্মের কর্মযজ্ঞ কাঁধে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। আগস্টের শোককে দুর্দমনীয় শক্তিতে পরিণত করে তিনি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাই আজ বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে এক বিস্ময়। বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিঃশেষ করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর এ পর্যন্ত ২১ বার হামলা চালানো হয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পরের বছরই বঙ্গবন্ধুর খুনীদের দল ফ্রিডম পার্টি হত্যা চেষ্টা চালায়। তবে প্রাণের ভয় দেখিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে দাবিয়ে রাখা যায় না। সেই আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপে দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের উদ্যোগ নেয় এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার কার্যকরের মাধ্যমে বাঙালি জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়। তবে এখনো পাঁচ ঘাতক রয়ে গেছে অধরা। তাদের চক্রান্ত থেমে নেই। ’৭৫-এর কুশিলবরা অনেকেই রং বদল করে আজও গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এদেরকে চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় কোনো স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির ঠাঁই হতে পারে না, এই হোক ১৫ আগস্টের শপথ।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন