মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাংলা সাহিত্যের নিঃসঙ্গ রাজপুত্র 

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২২, ০৩:০০

শত বছর আগে, ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলায় জন্ম নেওয়া সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে এককথায় বলা যায় বাংলা সাহিত্যের ‘নিঃসঙ্গ রাজপুত্র’। অল্প বয়সেই মাতৃহীন ওয়ালীউল্লাহ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতার বদলির চাকরির কারণে বিভিন্ন দেশের প্রান্তে পড়ালেখা করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পড়ালেখার সময়ই ১৯৪৫ সালে তিনি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ‘দি স্টেটসম্যান’-এ সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এবং সাংবাদিকতার সূত্রেই কলকাতার সাহিত্যিক মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। 

তখনই বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠিত পত্রপত্রিকায় তাঁর গল্প ছাপা শুরু হয়। ‘মোহাম্মদী’, ‘সওগাত’, ‘চতুরঙ্গ’, ‘পূর্বাশা’, ‘পরিচয়’-এর মতো পত্রিকায় তাঁর গল্প প্রকাশ হতে থাকে। ১৯৪৭ সালে তিনি দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। এবং ঢাকায় বেতার কেন্দ্রে সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫০-এ তিনি করাচি বেতারে বার্তা সম্পাদক হন এবং তারপর তিনি কূটনৈতিক দায়িত্বে নিয়োজিত হন। প্রথমে নয়াদিল্লিতে তারপর ক্রমান্বয়ে ঢাকা, সিডনি, করাচি, জাকার্তা, বন, লন্ডন এবং প্যারিসে তিনি চাকরি করেন। তাঁর শেষ কর্মস্হল প্যারিস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করার জন্য তিনি নির্দ্ধিধায় পাকিস্তান সরকারের চাকরি ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন। এর আগে তাঁর গল্পগ্রম্হ ‘নয়ন চারা’ ও ‘দুই তীর’ প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯৪৬ ও ১৯৬৫ সালে এবং উপন্যাস ‘লালসালু’ ‘চাঁদের অমাবস্যা’ ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র প্রকাশকাল যথাক্রমে ১৯৪৮, ১৯৬৪ ও ১৯৬৮ সালে। তাঁর তিনখানি নিরীক্ষামূলক নাটকও রয়েছে—বহিপীর, তরঙ্গভঙ্গ ও সুড়ঙ্গ। ৩৯ বছর বয়সে ১৯৬১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন মূলত ‘লালসালু’ উপন্যাসের জন্য। পরবতী‌র্ সময়ে উপন্যাসটি অনূদিত হয় ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান এবং চেক ভাষায়।

বাংলাদেশ তখন মুক্তিসংগ্রামে উত্তাল। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর। প্রবাসী জীবন এবং ফরাসি স্ত্রীকে নিয়ে তখন এক বেসামাল জীবনযাপন করছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। এর কিছুদিন আগে তাঁর ইউনেস্কোর সঙ্গে চাকরির চুক্তি বাতিল হয়ে গেছে। ফলে নিরেট বেকার তিনি। সংসারে অর্থ জোগানোর জন্য তাঁর স্ত্রী আন মারি পুনরায় চাকরির চেষ্টা করছেন আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেই যুগসন্ধিকালে তিনি দেশকে সাহাঘ্য করার জন্য সমস্ত আত্মশক্তি দিয়ে লন্ডনে দৌড়ঝাঁপ করেন। কিন্তু ফিরে আসার অল্প কিছুদিনের মধ্যে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি ফ্রান্সের মুঁ্যদ শহরে নিজের বাড়িতে স্ট্রোকের মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে মৃতু্যবরণ করেন। মুঁ্যদ শহরে, যেখানে একটা বাড়ি কিনেছিলেন, সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। এখনো তিনি সেখানেই সমাহিত।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যখন লেখালেখি শুরু করেন, সে সময়টা ছিল ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণ। ঢাকা ও কলকাতার মধ্যবিত্ত নাগরিকজীবন তখন নানান ঘাত-প্রতিঘাত ও অস্হিরতায় পরিপূর্ণ। তবে তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে বাঙালি মুসলমান। তার স্পষ্ট বয়ান আমরা পাই ওয়ালীউল্লাহর ফরাসি স্ত্রী আন মারির লেখায়। মারি তাঁর ‘ওয়ালী, মাই হাজবেন্ড, অ্যাজ আই স হিম’ শিরোনামে রচনায় বলেছেন, ‘... মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসতে পছন্দ করত ও (ওয়ালীউল্লাহ)। পৃথিবীর সর্বত্রই ঘরে লুঙ্গি পরে থাকতে ভালবাসত। বড়দের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করত। সুপারি চিবোত। ভাটিয়ালি গান খুব পছন্দ করত। মাঝেমধ্যেই বাংলাগান গেয়ে উঠত।’ তিনি জানিয়েছেন, ফ্রান্স থেকে তাঁরা সপরিবারে বহু ভ্রমণে গেলেও গ্রানাদার আলহামরা ও করদোবরা মসজিদ ঘুরে দেখার সময়ে মুসলিম স্হাপত্যবৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যায় স্বামীর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

এই লেখকই তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’-তে একরকম বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেন। এই উপন্যাসটি বহু বছর ধরে বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক দ্রুতপঠনে পাঠ্য হিসেবে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী পড়েছেন এবং দেখেছেন ধর্মান্ধতার এক অন্য রূপ। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই উপন্যাসটিকে একজন প্রতিভাবান লেখকের দুঃসাহসী বললে কম বলা হয়। ঢাকা ও কলকাতার মধ্যবিত্ত নাগরিকজীবন তখন নানা ঘাত-প্রতিঘাতে অস্হির ও চঞ্চল। ব্রিটিশ শাসনবিরোধী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশবিভাগ, উদ্বাস্ত্ত সমস্যা, আবার নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান গড়ে তোলার উদ্দীপনা ইত্যাদি নানা রকম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আবর্তে মধ্যবিত্তের জীবন তখন বিচিত্রমুখী জটিলতায় বিপর্যস্ত ও উজ্জীবিত। 

নবীন লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এই চেনা জগত্কে বাদ দিয়ে তাঁর প্রথম উপন্যাসের জন্য গ্রামীণ পটভূমি ও সমাজ-পরিবেশ বেছে নিয়েছিলেন। ‘লালসালু’তে বাংলার গ্রামীণ সমাজের এক অন্ধকার চিত্রকে ওয়ালীউল্লাহ অত্যন্ত সাবধানে এঁকেছেন। তাঁর ধারালো কলমের ডগা দিয়ে এই উপন্যাসে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য দুঃসাহসী শব্দ ও বাক্য। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের আগাছা বেশি।’ তিনি মনে করতেন, ধর্ম মানুষকে সত্যের পথে, কল্যাণের পথে, পারস্পরিক মমতার পথে নিয়ে এসেছে; কিন্তু ধর্মের মূল ভিত্তিটাকেই দুর্বল করে দিয়েছে কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস। এ কারণে মানুষের মন আলোড়িত, জাগ্রত ও বিকশিত তো হয়ইনি বরং দিন দিন হয়েছে দুর্বল, সংকীর্ণ এবং ভীত। স্বার্থ ও লোভের বশবর্তী হয়ে এক শ্রেণির লোক যে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানান ভণ্ডামি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর আঘাত তার বিরুদ্ধে। লালসালুর মাধ্যমে তিনি উন্মোচন করেছেন প্রতারণার মুখোশ।

বাবার বদলির চাকরির সুবাদে তিনি বাংলাদেশের দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। এর ছাপ লালসালুর পাশাপাশি ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাস কিংবা ‘বহিপীর’ নাটকের সমান্তরালে ‘লালসালু’ উপন্যাসেও তাঁর সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর রচনা সম্ভারের বিস্ময় বাংলা সাহিত্যে যুগ যুগ বেঁচে থাকবে নিঃসন্দেহে। কারণ, দিন দিন তিনি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন