শুচিবায়ু—আমি এখন কী করব? 

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২২, ০৪:২৪

অনেকেই একটু বেশি পরিষ্কার থাকা পছন্দ করে, অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে গিয়ে একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের হয়। এই অতিরিক্ত পরিষ্কার বা খুঁতখুঁতে আচরণকে শুচিবায়ু বলে। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এই শুচিবায়ু আচরণগুলো খুব সামান্য হলে তেমন কোনো সমস্যাই হয় না, তবে অনেক বেশি তীব্র হলে মনোবিজ্ঞানীরা একটি মানসিক রোগ হিসাবে মনে করেন, যাকে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা সংক্ষেপে ওসিডি বলে। ওসিডিতে সাধারণত অবসেশন ও কমপালশন এই দুটো বিষয় থাকে।

সাধারণত আমরা অবসেশন বলতে বুঝি, ব্যক্তির মধ্যে জোর করে কতগুলো চিন্তা, ছবি ও কল্পনা আসে, যেগুলোকে ব্যক্তি ইচ্ছা করলেই থামাতে পারে না। এই চিন্তা, ছবি ও কল্পনাগুলোকে অবসেশন বলে। অবসেসিভ চিন্তাগুলো ব্যক্তির নিজের মন থেকে আসে এবং ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। তবে এই চিন্তাগুলো কখনো বাস্তব জীবনে সত্যি সত্যি কোনো প্রভাব ফেলে না, তথাপি আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য চিন্তা, অনুভূতি বা আচরণ দিয়ে এই অবসেশনগুলোকে দূর করতে চায়।

অবসেশনের লক্ষণ : অনেকে নিজেকে ময়লাযুক্ত বা অপবিত্র মনে করেন। অনেকেরই না চাইলেও কোনো অস্বস্তিকর শব্দ বা বাক্য বা নাম বা নিজ ধর্ম নিয়ে নেতিবাচক বাক্য মনে আসে। অনেক সময় ব্যক্তি কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে বিষয়ের অনেক ভেতরে চলে যায়, যার ফলে আর মূল বিষয়ে ফিরে আসতে পারে না। অনেকের মধ্যে অন্যের যৌন অঙ্গের ছবি, ছুরি দিয়ে কাউকে আঘাত করছেন, লাথি মারছেন, কাউকে মেরে ফেলবেন এরকম কল্পনা আসতে থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে বাসার বাইরে যাওয়ার পর মনে হতে থাকে যে, তিনি হয়তো চুলা, দরজা, জানালা, তালা ইত্যাদি ঠিকমতো বন্ধ করেননি। এগুলোর কারণে কোনো ঘটনা ঘটলে সেগুলোর জন্য নিজেকে দায়ী হতে হবে।

কমপালশন কী? অবসেশনের কারণে ব্যক্তির মধ্যে অনেক কষ্টকর অনুভূতি তৈরি হয়। এই কষ্টকর অনুভূতিগুলোকে অকার্যকর করা বা এগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যক্তি কতগুলো কাজ বারংবার করেন যে, কাজগুলোকে কমপালশন বলে। কমপালসিভ আচরণ করলে রোগীর মধ্যে অল্প সময়ের জন্য ভালো অনুভূতি তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে তার রোগটি অনেক বেড়ে যায় এবং ব্যক্তি অবসেশন ও কমপালশনের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে যায়।

কমপালশনের লক্ষণগুলো হলো— বারবার হাত ধোয়া বা গোসলে বেশি সময় লাগানো বা অতিরিক্ত পরিষ্কার থাকা, কোনো কিছু বারবার চেক করা বা কোনো কাজ বারবার করা, ভালো মানুষের নাম বারবার নেওয়া, ভালো চিন্তা দিয়ে খারাপ চিন্তাগুলোকে দূর করার চেষ্টা করা ইত্যাদি।

ওসিডির আরো বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এক. অনেক ওসিডি ক্লায়েন্টের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে। তারা প্রায়ই ফোবিয়া ক্লাইন্টের মতো আচরণ করে। কিন্তু এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ওসিডি রোগটিকে আরো ট্রিগার করে। যেমন—যাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সমস্যা রয়েছে, তারা যাকে নোংরা মনে করেন তা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। দুই. ক্লাইন্টরা ঘন ঘন তাদের বাধ্যতামূলক আচরণ না করলে বিপর্যয়কর পরিণতির আশঙ্কার কথা জানায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন বিবাহিত নারী যতবার দুর্ঘটনার কথা শুনেছেন তিনি বাধ্যতামূলকভাবে তার হাত ধুতেন। তিনি মনে করেন যে, এটি করে তিনি তার স্বামীকে রক্ষা করছেন। তিন. অনেক ওসিডি রোগী পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বারংবার আশ্বাস চায়। তারা বারবার বলতে থাকে, যেমন : আমি কি পাগল হয়ে যাব? আমার কি আবার ট্যাপ চেক করতে হবে? যখন আশ্বাস চাওয়ায় রোগীরা আপাত কিছুটা স্বস্তি পেলেও ওসিডির পরিমাণ বেড়ে যায়। চার. যখন অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার রোগীরা কমপালসিভ আচরণ করেন, তখন তারা এটিকে যথাযথভাবে সম্পাদন করার প্রয়োজন অনুভব করেন। যদি আচরণটি কোনো বাহ্যিক কারণে ব্যাহত হয়, তখন তাদের আচরণটি অকার্যকর হয়ে যায় এবং পুনরায় শুরু করার প্রয়োজন হতে পারে। পাঁচ. অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের রোগীদের জটিল বিষয় হিসেবে কিছু চিন্তায় রোমম্হন করেন। এই চিন্তাগুলো জাবর কাটার মতো বারবার আসে। যেমন : মৃত্যুর পর কি কোনো জীবন আছে? আমি কি জিনগতভাবে অস্বাভাবিক? এই চিন্তাধারা অবান্তর, দীর্ঘায়িত এবং হতাশাজনক।

ওসিডি রোগের চিকিৎসায় মেডিসিন ও সাইকোথেরাপি দুই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। রোগের মাত্রা অনুযায়ী মনশ্চিকিত্সকের পরামর্শে মেডিসিন খেতে হয়। আর সাইকোথেরাপি হলো মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি একধরনের চিকিত্সাপদ্ধতি। সাইকোথেরাপিতে মনোবিজ্ঞানীরা রোগীর চিন্তা, আচরণ, আবেগসহ রোগের জন্য দায়ী কারণ ও পরিস্থিতিগুলোকে অনুসন্ধান করার পর যথাযথ মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল অবলম্বন করে ত্রুটিপূর্ণ চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতিগুলোকে পরিবর্তন করা এবং চাপমূলক পরিস্থিতিতে ব্যক্তি কীভাবে অভিযোজন করতে পারবে সে সম্পর্কে ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। সাইকোথেরাপির ফলাফল নির্ভর করে ব্যক্তি মনোবৈজ্ঞানিক কৌশলগুলো কত বেশি অনুশীলন করে আয়ত্ত করতে পারেন তার ওপর। গবেষণায় দেখা যায়, সমস্যা অল্পমাত্রার হলে সে ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি দিয়ে সফলতা পাওয়া যায়। তবে সমস্যার মাত্রা গুরুতর হলে সাইকোথেরাপির পাশাপাশি অবশ্যই মেডিসিনের প্রয়োজন হয়।

রোগীদের ক্ষেত্রে পরামর্শ : অবসেশনের চিন্তাগুলো বারবার এলেও এগুলো তেমন কোনো ক্ষতি করে না, তাই এগুলোকে স্বাভাবিক চিন্তা হিসাবে মেনে নিলে আপনার সমস্যা অনেক কমে যাবে। এই চিন্তাগুলো নিজের মন থেকে আসে তবে এগুলো আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই এই রোগের জন্য নিজেকে দায়ী করবেন না। অবসেশনগুলো অনেকেরই আসে আবার চলেও যায়, আপনি বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এগুলো আপনার ক্ষতি করছে। তাই অবসেশনগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে সহজভাবে গ্রহণ করে এগুলো নিয়ে থাকার চেষ্টা করুন। রোগীরা অবসেশন কমানোর জন্য চিন্তাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। তবে নিয়ন্ত্রণ করলেই এগুলো বেড়ে যায়। তাই অবসেশন নিয়ন্ত্রণ করবেন না। অস্বস্তিকর পরিস্থিতিগুলো থেকে যত বেশি দূরে থাকবেন তত বেশি সমস্যা বাড়তে থাকবে। তাই অস্বস্তিকর পরিস্হিতিগুলোর সঙ্গে অভিযোজন করতে পারলে এ সমস্যা কমে যায়, যদিও একজন ওসিডি আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে এটা সহজ নয়। এই অবসেশনগুলো থেকে মুক্ত হতে কতগুলো কমপালসিভ আচরণ করেন, এই কমপালশন করার কারণে ব্যক্তি আপাত শান্তি পেলেও পরবর্তী সময় এগুলো আপনার অবসেশনের তীব্রতা বাড়ায়। তাই আপনার সর্বদা কমপালশন আচরণ না করার চেষ্টা করবেন। তবে কমপালশন থেকে বিরত থাকা এসব রোগীদের জন্য অনেক কঠিন কাজ। তাই ধৈর্য্য ধরে কমপালশন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। অনেক রোগী মনে করে অবসেশনের নিয়ন্ত্রণে যদি কমপালশন না করেন তাহলে তার জীবনে বড় ধরনের সমস্যা হয়ে যাবে। গবেষণায় দেখা যায় কমপালশন না করলে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। আপনি রিলাকজেশন, মেডিটেশন করা, গান বা কবিতা শোনা, ধর্মীয় চর্চা করা প্রভৃতি কাজের মাধ্যমে নিজেকে মানসিকভাবে প্রশান্ত রাখতে পারেন। প্রয়োজনে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর কাছে সেশন নিতে পারেন। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী আপনার সমস্যা পরিমাপন ও মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে সহায়তা করবে।

পরিবারের সদস্যদের করণীয় :অন্যসব রোগের মতো ওসিডি একটি রোগ, এক্ষেত্রে রোগীর আচরণগুলো রোগী ইচ্ছা করে করে না। এসব রোগী নিজে অনেক কষ্ট পায় তাই তারা নিজেরাই এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে চায়। রোগীকে তার রোগের জন্য বা শুচিবায়ু আচরণের জন্য দায়ী করবেন না।

ওসিডি আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরিবারের অন্য সবার থেকে আলাদা না করে সবার মধ্যে রেখে তার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে, যাতে করে সে কোনোভাবেই হীনম্মন্যতায় না ভোগে এবং আগ্রহ নিয়ে এ রোগের মোকাবিলা করতে পারেন। এসব রোগীকে কখনো রাগারাগি, বকাবকি বা সমালোচনা করবেন না। এগুলো করলে মানসিক চাপ বেড়ে যায় যা তাদের রোগ বাড়াতে সহায়তা করে। বরং মাঝে মাঝে প্রশংসা ও ছোট ছোট ভালো আচরণ পুরস্কৃত করা যেতে পারে। রোগীকে অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, তাহলে রোগের পরিমাণ বাড়বে। তাকে সাহস দিতে হবে, বোঝাতে হবে যে, পরিবারের সদস্যরা তাকে সত্যিকারের ভালোবাসে। রোগী কোন কমপালসিভ আচরণ (হাত ধোয়া, বারবার একই কাজ করা, চেক করা ইত্যাদি) করলে তাকে থামাবেন না, রোগীকে থামালে তার কমপালসিভ আচরণ অনেক বেড়ে যায়। রোগীকে উত্সাহ দিন, তাকে আশ্বস্ত করুন বর্তমান বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি দ্বারা এ রোগ থেকে বের হয়ে আসা যায়। প্রয়োজনে রোগীকে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর কাছে সেশনে বসতে আগ্রহী করে তুলুন।

লেখক : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন