আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে পাওয়া সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংলাপের সারসংক্ষেপে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবকে ১০টি ভাগ করে নিজেদের মতামতও তুলে ধরেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন কোনো দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে না। সে ধরনের কোনো প্রয়াস নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করবে না। তবে সব দলকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান শেষ পর্যন্ত আন্তরিকভাবেই বহাল থাকবে। এছাড়া সেনা মোতায়েনের জন্য সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া প্রস্তাবে সায় দিয়েছে ইসি।
এই প্রস্তাবের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বলেছে, দেশে একই দিনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয় বিধায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকাজে নিয়োজিত অসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা অপর্যাপ্ত বা অপ্রতুল হতে পারে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকাজে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাবটি যৌক্তিক বলে কমিশন মনে করে। যদিও বিদ্যমান আইনে সরাসরি সেনা মোতায়েন করতে পারে না ইসি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল স্বাক্ষরিত ‘ইসির সঙ্গে নিবন্ধিত দলগুলোর সংলাপ থেকে প্রাপ্য মতামত ও পরামর্শ এবং কমিশনের পর্যালোচনা ও মতামত’ শীর্ষক এ সারসংক্ষেপে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়। সোমবার (২২ আগস্ট) সারসংক্ষেপটি নিবন্ধিত ২৮টি দল, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছেও ইসির পর্যালোচনা ও মতামত পাঠানো হয়েছে।
১৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন আয়োজিত সংলাপে ২৮টি দল অংশ নেয়। ৯টি দল সংলাপ বর্জন করে। জাতীয় পার্টি-জেপি ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-এই দুইটি দলকে আগামী ৫ সেপ্টেম্বরে সংলাপে অংশ নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। দুইটি দলের সঙ্গে সংলাপ শেষ হওয়ার আগেই সংলাপের সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করে ফেলেছে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন।
সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে দলগুলোয় আপত্তি ও সমর্থন রয়েছে। সার্বিক বিষয়ে এখনো স্থির কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ইসি। রাজনৈতিক দল ছাড়াও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার বিশ্লেষণ করে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে ইসি ভিন্নভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের ইস্যুটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় মনে করে ইসি। নির্বাচনকালীন সরকারে জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে ইসির অধীনে ন্যস্ত করতে সংবিধানের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সংবিধান ও আইনে দেওয়া ক্ষমতা, সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করার বিষয়ে আশ্বস্ত করে নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত সুপারিশের ক্ষেত্রে কমিশন সিদ্ধান্ত হলো—দেশি এবং বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ভোট পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। ক্ষমতাসীন দলের বাধা, মিথ্যা মামলার বিষয়ে কমিশন মনে করে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এমন একটি ধারণা বা বিশ্বাস প্রবল। কমিশন দৃঢ়ভাবে আরো বিশ্বাস করতে চায় সরকারি দল এ ধরনের নির্বাচন আচরণবিধি ভাঙার মতো কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং রাজনৈতিক কারণে কোনো মামলা করে সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার পথ বন্ধ করবে না। এক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সময়ে সব অংশীজনের কার্যকলাপ কমিশন গভীর পর্যবেক্ষণে রাখবে।
সংখ্যানুপাতিক সংসদীয় ব্যবস্থার সুপারিশের বিষয়ে সিইসি জানান, কমিশন পরামর্শটি গুরুত্ব সহকারে শ্রবণ ও বিবেচনা করেছে। তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব গঠন করা, সংসদ সদস্যের সংখ্যা বর্ধিত করা এবং নারী আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাবনাটি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার এবং জাতীয় সংসদের এখতিয়ারাধীন বলে কমিশন মনে করে।
এতে আরো বলা হয়, মতামতগুলো কমিশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেছে। রাজনীতিতে গণতন্ত্রের সুস্থ চর্চা প্রয়োজন...নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে অভিন্ন প্রত্যাশা পোষণ করে। এসবের বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন, সরকার, জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী এবং রাজনৈতিক দলসহ সবার ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন।
