বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইতিহাসের জঘন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘন, প্রশ্ন ওঠেনি কেন?

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২২, ০৩:০০

আগস্ট শোকের মাস। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্হপতি, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছাড়াও সেদিনের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে তাদের পরিবারের সদস্য এবং বঙ্গবন্ধুর নিকটাত্মীয়সহ মোট ২৬ জন নিহত হন। ১০ বছরের ছোট্ট শেখ রাসেলও রেহাই পায়নি এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ থেকে। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ পাঁচ জন নিরপরাধ নারীর জীবনও কেড়ে নেয় ঘাতকরা। এটা শুধু অভূতপূর্ব ও বিয়োগান্তই নয়; ইতিহাসের জঘন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা।

কিন্তু সেদিন কোথায় ছিল মানবাধিকার? কোথায় ছিল বিশ্ব মানবতা? কোথায় ছিল বিশ্ব বিবেক? ঘাতকরা হত্যার জঘন্য উল্লাসে মেতে উঠলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কেন দেশে-বিদেশে প্রশ্ন ওঠেনি? বর্তমানে যখন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসে শক্তভাবে দাঁড়ায়, সেটি হলো—পঁচাত্তরে কেন তারা চুপ ছিলেন? বিলিয়ন ডলারের এই প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত।

অত্যন্ত সঙ্গত ও যৌক্তিক কারণেই আজও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই প্রশ্নটির উত্তর খঁুজছেন ১৫ আগস্টের হতাযঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে গত ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেসব দেশ ও সংস্হা বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাদের প্রতি পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যাকাণ্ডের পর কোথায় ছিল মানবাধিকার? সেদিন বিচার চাওয়ার অধিকারটুকু পর্যন্ত আমাদের ছিল না। বাবা-মা, ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনায় একটা মামলা করতে পারব না! আমরা কী বাংলাদেশের নাগরিক না? আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হলো, তখন তারা কোথায় ছিল? বরং যারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয় দিয়ে লালন-পালন করছে, আজ তাদের কাছ থেকেই আমাদের মানবাধিকারের ছবক শুনতে হয়। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য।’ বঙ্গবন্ধুকন্যার এসব প্রশ্নের জবাব কী, কী বলবেন মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা দেশি-বিদেশিরা?

সেদিন ঘাতকদের টার্গেট ছিল বঙ্গবন্ধুসহ তার পুরো পরিবার ও নিকটাত্মীয়রা। ঘাতকরা তাদের কাউকেই পৃথিবীতে জীবিত রাখবে না—এটাই ছিল তাদের মূল পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্হান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান। পরে তাদের বাংলাদেশে ফিরে আসার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমনকি দেশে ফিরে তাদের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ছিল বাধা। শুধু যে বঙ্গবন্ধুসহ ২৬ জনকে হত্যার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে সেটিই নয়, পরবর্তী সময়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর কন্যাদ্বয়ের স্বাভাবিক চলাচল ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। সে সময়ও সুপ্ত ছিল বিশ্ব মানবতাবোধ।

বঙ্গবন্ধু হত্যার যেন বিচার না হয়, সেজন্য জারি করা হয়েছিল ইনডেমনিটি। বিষয়টি আবারও উল্লেখ করে ১৬ আগস্ট আওয়ামী লীগের আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ইনডেমনিটি দিয়ে বিচার বন্ধ করে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়। জিয়া নিজে উদ্যোগী হয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টোকে দিয়ে লিবিয়ায় খুনিদের আশ্রয়ের ব্যবস্হা করে।’ শেখ হাসিনা সেদিন এটাও বলেছেন, ‘যেসব দেশ এখন মানবাধিকারের কথা বলে আমাদের ওপর স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) দেয়, তারাই তো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। খুনি রাশেদ যুক্তরাষ্ট্রে, খুনি নুর কানাডায় রয়েছে। যারা এসব খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদের কাছ থেকেই আমাদের মানবাধিকারের ছবক শুনতে হয়।’

১৫ আগস্ট রাজনীতির চালচিত্র পালটে গিয়েছিল। সরকার পরিবর্তন করতে গিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা বিরল। কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা আর চিলির সালভাদর আয়েন্দের কথা অনেকের জানা, এটা আকছার হচ্ছে নানা দেশে। রুশ বিপ্লবের সময় আর ইরাকে সামরিক চক্রের ক্ষমতা দখলের সময়ও অনেকটা এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। পরিবারের কাউকে আর জীবিত রাখেনি বিপ্লবীরা বা অভু্যত্থানকারীরা। তবে হত্যাকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের মতো ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির ঘটনা ঘটেনি।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার পরিবারের সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৮তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে গত ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞের সমর্থক, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মদত দিয়েছে, এখন তাদের (বিএনপি) সঙ্গে বসতে হবে! তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে? তাদের খাতির করতে হবে? তাদের ইলেকশনে আনতে হবে? এত আহ্লাদ কেন, আমি তো বুঝি না।’

ইত্তেফাক/জেডএইচডি