শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্বল ব্যাংক ‘সবল’ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি

  • অবস্হার উন্নতিতে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে সময়, করা হচ্ছে চুক্তি, নিয়মিত হবে বৈঠক
  • অনিয়মের ব্যবস্হা না নিলে সুফল মিলবে না :সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন
আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২২, ০৫:৩০

আর্থিক সূচকে দুর্বল ১০ ব্যাংককে ‘সবল’ করতে বিশেষ তদারকি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা উত্তরণে তাদের কাছ থেকে রোডম্যাপ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ধাপ বাস্তবায়নের সময় বেঁধে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক; এমনকি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তিও করা হচ্ছে। ঐ চুক্তি পরিপালন ও অগ্রগতি নিয়ে তিন মাস পর পর ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করা হবে। ইতিমধ্যে তিনটি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর হওয়ার পরেই এই ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তদারকির আওতায় আনার উদ্যোগ নেন।

পর্যাপ্ত জামানত না রাখা, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, মূলধনের অপর্যাপ্ততা, ঋণ-আমানত অনুপাত এবং প্রভিশনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এসব ব্যাংককে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, দুর্বল বলেই বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের চিহ্নিত করেছে। যেসব ব্যাংকে সুশাসন ও জবাবদিহি নেই, প্রভাব বিস্তারকারী পরিচালক রয়েছে, ব্যবস্হাপনা কতৃ‌র্পক্ষ কারো দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, মূলধনের অপর্যাপ্ততা, ঋণের রি-শিডিউল ঠিকভাবে হচ্ছে না—সেসব ব্যাংক খারাপ বলে সাধারণত ধরে নেওয়া হয়। সাবেক এ গর্ভনর বলেন, বৈঠক করে কোনো লাভ হবে না। এর আগে বহুবার বহু ব্যাংকে অবজারভার বসানো হয়েছে, তাতে কোনো লাভ হয়নি। তারা ছিল সাক্ষীগোপাল। কিন্তু অপরাধের ব্যবস্হা না নিলে এসব আলোচনা বা মিটিং করে কোনো ফল আসবে না। 

এর আগেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকগুলোর এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছিল যে, বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সঙ্গে নিয়মিত বসবে। কিন্তু, ব্যাংকগুলোর কোনো উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে এটি একটি ইতিবাচক দিক যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। শুধু দুর্বল ১০ ব্যাংক নয়, অন্য ব্যাংকের বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। সব ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংয়ে রাখতে হবে। ব্যাংকখাতের এ পরিণতির কারণ হচ্ছে অনিয়মের ব্যবস্হা না নেওয়া। বেশির ভাগ অনিয়মই গোপন থাকে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকগুলোকে ভালো অবস্হায় তুলে আনতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্হাপনা পরিচালক ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে বাংলাদেশ। বৈঠকের পর এসব ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সভা করে। এর আগে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড (এনবিএল), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো কোনো ব্যাংকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন বছর মেয়াদি এমওইউ সই করছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, খুব কম সময়ের মধ্যেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে (এসএমই) ঋণ দেওয়া শুরু করতে চায় পদ্মা ব্যাংক। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে তারা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংককে পুনরায় অর্থায়ন করে না। পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ। 

জানা গেছে, পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে। ব্যাংকটির সঙ্গে আলোচনা করেই চুক্তির শর্তগুলো চূড়ান্ত করা হবে। এতে তিন বছরের মধ্যে ব্যাংকটির দৃশ্যমান উন্নতির লক্ষ্য থাকবে চুক্তিতে। ন্যাশনাল ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকটিকে নিয়ম মেনে ব্যাংকিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড (এনবিএল) ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের খেলাপি ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্হায় চলে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কিছু কিছু ব্যাংকে অনিয়মের পাহাড় জমে গেছে। নামে-বেনামে নিজেদের মধ্যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। আবার এসব ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ জামানত নেওয়ার কথা তা নেওয়া হয়নি। যে পরিমাণ জামানত নেওয়া হয়েছে তার গুণমান খুবই দুর্বল। ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে ঋণ পরিশোধ দেখানো হচ্ছে। এভাবে খেলাপি ঋণ আড়াল হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, যে ১০টি ব্যাংককে দুর্বল ব্যাংক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এর মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক রয়েছে তিনটি।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি