মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মনীষীদের স্মৃতিতে 

অবিস্মরণীয় নজরুল 

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২২, ০৫:৫০

নজরুলের একান্ত সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা নজরুলকে যেভাবে দেখেছিলেন, চিনেছিলেন—তাঁদের অনেকেই সেসব লেখেননি। ‘বেতার বাংলা’র সম্পাদক ফজল-এ-খোদার আত্মজৈবনিক রচনার বই ‘আলো ছায়ার জোয়ার-ভাটা’য় এ ব্যাপারে অবাক করা কিছু তথ্য জানা গেল। গ্রম্হটিতে লেখক জানিয়েছেন, ‘নজরুল ইসলামের মৃতু্যর পরই ‘বেতার বাংলা’ স্মরণসংখ্যা প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়।’ ৭৬-এর অক্টোবরের ১০-১২তে প্রকাশের পরই পাঠকসমাজে সংখ্যাটি বিপুলভাবে আদৃত হয়। সাহিত্যিক তাত্পর্যে আজ তা ‘ঐতিহাসিক’। কিন্তু এই সংখ্যার লেখকদের মৌখিক স্মৃতিচারণে নজরুল সম্পর্কে যেসকল তথ্য তিনি অবগত হন, সেসব লেখায় না-আসায় তিনি খুব হতাশ বোধ করেন। কিন্তু স্মৃতিকথা প্রথম পুরুষেই বিশ্বস্ত ও যৌক্তিক হয়। তাই সেসব আর লেখা হলো না। একে একে ‘নজরুল স্মরণী সংখ্যা’র লেখকদের অধিকাংশ মৃতু্যবরণ করলে ২০০২-এ নজরুল ইনস্টিটিউটের তত্কালীন পরিচালক কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের অনুরোধে তিনি তা লিপিবদ্ধ করেন। নজরুল-অধ্যয়নে তাত্পর্যপূর্ণ মণি-মুক্তোসম সেই কথাগুলো এবার আমরা নজরুল-চর্চাকারীরা স্মরণ করতে পারি।

ফজল-এ-খোদা জানিয়েছেন: ‘...লেখার জন্য যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করি, তাঁরা অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাবে নজরুল-সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। প্রথমে দেখা করি ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে। চা-নাস্তা খাওয়ার ফাঁকে নজরুল সম্পর্কে যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেসবের অনেক প্রসঙ্গই তিনি তাঁর লেখায় আনেননি। যেমন শরত্চন্দ্র নজরুল প্রসঙ্গে তাঁকে বলেছিলেন: ‘নজরুল এখন একমাত্র প্রতিভা যিনি রবীন্দ্র-প্রভাব মুক্ত। তারুণ্য ও বীরত্বসূচক বিষয় সফলভাবে বাংলা সাহিত্যে নজরুলই সংযোজন করতে পেরেছেন যা আগে কারো রচনায় পাওয়া যায়নি। নজরুলের এখন দুই হাতে লিখে যাওয়া উচিত।’

এরপর কবি বে-নজীর আহমদ সম্পর্কে লিখেছেন: ‘আমি সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ে বললাম—কই সেদিন যে কথাগুলো বলেছিলেন তার অনেক কথাই তো লেখেননি। তিনি বললেন, আমি নজরুলের উপর একটি বই লিখব ভেবে রেখেছি, যেখানে কবির একান্ত কিছু জীবনকথা থাকবে।

এরপর তিনি নজরুলের সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের যোগাযোগ সম্পর্কে একটি দেখা ঘটনা বিবৃত করেন। কবির সম্মোহনী শক্তি দেখে বে-নজীর নিশ্চিত হন যে, তিনি ছিলেন উন্নত আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী সাধক-পুরুষ। কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিকথায় (এ সংখ্যায় মুদ্রিত) নজরুলের হস্তরেখাবিদ্যায় পারদর্শিতার কথা সবিস্তারে লিখে সাক্ষ্য দিয়েছেন: নজরুল তাঁর হাত দেখে দুই শ্যালক ও নিজের সম্পর্কে যা বলেছিলেন ঠিক ঠিক ফলে গিয়েছিল।

বে-নজীর আহমদ আরো বলেছিলেন, নজরুল ছিলেন বহুভাষাবিদ। তিনি নজরুলকে জবরদস্ত উদু‌র্তে অনর্গল কথা বলতে দেখেছেন। কোরআন-হাদিসের প্রকৃত অর্থ তিনি এক মাওলানাকে এমনভাবে বুঝিয়ে দেন যে, মাওলানা সাহেব নজরুলকে ওস্তাদ স্বীকার করে নেন। এইচএমভি গ্রামোফোন কোম্পানির এক ইংরেজ কর্ণধারের সঙ্গে পাশ্চাত্য গানের বিষয়ে ইংরেজিতে দীর্ঘক্ষণ বাহাস করতে দেখেছেন। কাল মার্কসের ‘দি ক্যাপিটাল’ নজরুল এক সপ্তাহের মধ্যে পড়ে ফেরত দিয়েছিলেন। পড়েছেন কি না জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন বিশ্বাস না-হলে জিজ্ঞেস করো কোন পৃষ্ঠায় কী আছে?

মোহাম্মদ মোদাব্বের জানান মুকুল ফৌজের এক অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে এসে নজরুল শিশু-কিশোরদের শরীরচর্চা ও কাঠি নাচ দেখে উত্সাহে বলেছিলেন: ‘এদেরকে মিলিটারি ট্রেনিং দিতে হবে। ইতিহাসের কোথাও নেই, স্বাধীনতা কেউ কাউকে দয়া করে দিয়ে দেয়। রীতিমতো যুদ্ধ করে, লড়াই করে তা অর্জন করতে হয়। স্বাধীনতার জন্য অনেক রক্ত লাগে, অনেক প্রাণ লাগে।’

‘যুগস্রষ্টা নজরুল’-এর লেখক কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন একটি কথা বলেছিলেন: ‘নজরুল জন্মগ্রহণ না-করলে বাংলার মুসলমানরা কোনোদিন স্বীকৃত কবি হতে পারত না, শিল্পীও না। নজরুলের জন্যই আজকে আমাদের মতো চুনোপঁুটিরাও নামিদামি কবি। মীর মশাররফ হোসেনও তাঁর সময়ে ‘লেখক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হননি।’ কবি নজরুলের মেজাজ-মর্জি ও আচরণের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘নজরুলের মেজাজ ছিল রাজা-বাদশার মতো।’ কথাগুলোর মধ্যে আমরা অতিকথন খুঁজে পাই না।

‘বেতার বাংলা’র ‘নজরুল স্মরণী সংখ্যা’র লেখা সংগ্রহকালে নজরুল-সুহূদদের কথা সম্পাদকের অনুভবকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। প্রমাণ সম্পাদকীয়তে। ‘... তিনি (নজরুল) নির্লিপ্ত ঘুমন্ত বাঙালি জাতির জাগরণ ঘটিয়ে একটি বীর্যবন্ত জাতিতে পরিণত করার প্রেরণা যোগান। সে দিক থেকে বাঙালির যোদ্ধৃরূপের তিনি একক স্রষ্টা। তাঁর পূর্বে কিংবা পরে বাঙালীর বীরত্বের মহিমাকে জাগ্রত করার এমন কুণ্ঠাহীন নিরলস প্রচেষ্টা আর কেউ করেননি, করতে পারেননি। বলাবাহুল্য—এই শক্তিতে না জাগলে বাঙালি, বাংলাদেশীদের পক্ষে স্বাধীনতা অর্জন কিছুতেই সম্ভব হতো না। সুতরাং বলা যায়—স্বাধীনতার অন্য নাম নজরুল ইসলাম।’

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন